কিন্তু পুরানো দল নিজেদের পরাজিত বলে মানছিল না। লেভিন শুনলেন যে স্নেকোভকে ভোটে দাঁড়াতে অনুরোধ করা হচ্ছে, দেখলেন অভিজাতদের একটা দল ঘিড়ে দাঁড়িয়েছে গুবের্নিয়ার প্রমুখকে, কি যেন তিনি বলছিলেন তাদের। লেভিন কাছিয়ে গেলেন। অভিজাতদের উত্তরদান প্রসঙ্গে তিনি বলছিলেন তার ওপর আস্থা, তার প্রতি অনুরাগের কথা, যার অযোগ্য তিনি। কেননা তার যা কিছু কাজ সবই অভিজাত সম্প্রদায়ের সেবায়। তাদের জন্য তিনি তার লোককর্মের বারো বছর ব্যয় করেছেন। বারকয়েক তিনি পুনরুক্তি করলেন, ‘যথাশক্তি কাজ করেছি বিশ্বাস আর সততা নিয়ে, আস্থায় মূল্য দিচ্ছি, কৃতজ্ঞ বোধ করছি।’ হঠাৎ অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে থেমে গিয়ে তিনি হল ছেড়ে চলে গেলেন। চোখের পানিটা তার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে বলে, নাকি অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রতি তার অনুরাগের জন্য, অথবা চাপের দরুন—সে যাই হোক ব্যাকুলতা সঞ্চারিত হল অন্যান্যদের মধ্যে, বেশির ভাগ অভিজাতই আলোড়িত হল, স্নেৎকোভের প্রতি একটা কোমলতা বোধ করলেন লেভিন।
দরজার কাছে গুবেনির্য়ার প্রমুখ ধাক্কা খেলেন লেভিনের সাথে।
‘মাপ করবেন, মাপ করবেন দয়া করে’, তিনি বললেন এমনভাবে যেন বলছেন অপরিচিত কাউকে, কিন্তু লেভিনকে চিনতে পেরে ভীরুভীরু হাসলেন। লেভিনের মনে হল তিনি কিছু-একটা যেন বলতে চাইছিলেন, কিন্তু পারছিলেন না তার অস্থিরতায়। তার মুখভাব, ক্রস-আঁটা তার গোটা উর্দি আর বুনট করা সাদা পেন্টালুন পরা মুতি, যে শশব্যস্তায় তিনি চলে যাচ্ছিলেন, সব কিছু থেকে লেভিনের মনে হচ্ছিল তিনি যেন একটা তাড়িত পশু যে বুঝতে পারছে যে তার অবস্থা সঙ্গিন। তার এই মুখের ভাবটাই লেবিনের কাছে বিশেষ মর্মস্পশী ঠেকেছিল। কেননা আগের দিনই তার অছিগিরি ব্যাপার নিয়ে লেভিন দেখা করতে গিয়ে ছিল তার বাড়িতে। দেখেছিলেন তাকে সদাশয় সাংসারিক লোকের সমস্ত মহিমায়। মস্ত একটা বাড়ি, তাতে সাবেকি বংশগত সব আসবাবপত্র; চাল-না-মারা, নোংরা গোছের পুরানো চাকর-বাকর, তবে প্রভুর প্রতি সশ্রদ্ধ, বোঝা যায় তারা আগেকার ভূমিদাস, মনিবকে ছেড়ে যায়নি 1 মোটাসোটা ভালোমানুষ স্ত্রী, লেস দেওয়া টুপি মাথায়, তুর্কি শাল জড়িয়ে মেয়ের সুন্দরী কন্যা, নাতনিকে যিনি আদর করেছিলেন। জিমনাসিয়ামের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র ছোকরা গোছের ছেলে, যে জিমনাসিয়াম থেকে এসে পিতাকে অভিনন্দন জানিয়ে চুমু খেল তার প্রকাণ্ড হাতে। গৃহকর্তার ভারিক্কি সস্নেহে কথাবার্তা আর ভাবভঙ্গি—এসবই গতকাল লেভিনের মধ্যে একটা অগোচরে শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির উদ্রেক করেছিল। এখন এই বৃদ্ধকে তার মর্মস্পশী ও করুণ মনে হল, ভাবলেন ওকে দুটো ভালো কথা বলবেন। বললেন, ‘আপনি তাহলে আবার আমাদের অভিজাতপ্রমুখ হচ্ছেন?’
‘বড় একটা নয়’, সভয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললেন অভিজাতপ্রমূখ, ‘আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, বয়স তো হল। আমার চেয়ে কমবয়সী যোগ্য ব্যক্তি আছেন, কাজের ভার নিন তাঁরা।’
এবং পাশের দরজা দিয়ে অন্তর্ধান করলেন অভিজাতপ্রমূখ।
দেখা দিল সবচেয়ে গুরুগম্ভীর মুহূর্ত। তখন ভোট দেওয়ার কথা। উভয় দলের পাণ্ডারা আঙুল দিয়ে গুণছিল সাদা কালো বল।
ফ্লেরভকে নিয়ে বির্তকে নতুন দল শুধু একটা ভোটেই লাভবান হল না, সময়ও পেল, যাতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে যে তিনজন অভিজাতকে পুরানো দল চালাকি করে বঞ্চিত করেছিল, তাদের নিয়ে আসা যায়। দুজন অভিজাতের দুর্বলতা ছিল মদে, স্নেৎকোভের লোকেরা তাদের মাতাল করে দেয়, আর তৃতীয়জনের উর্দি কেড়ে নেয় তারা।
এসব জানতে পেরে ফ্লেরভকে নিয়ে বির্তকের সময় নতুন দল ছ্যাকড়া গাড়িতে নিজেদের লোক পাঠাতে পারে অভিজাত ব্যক্তিটিকে উর্দি পরাতে এবং মাতাল দুজনের মধ্যে একজনকে সভায় নিয়ে আসতে।
‘এনেছি একজনকে, পানি ঢেলেছি’, তাকে আনতে গিয়েছিল যে জমিদার, সিভয়াজস্কির কাছে গিয়ে সে বলল, ‘ভাবনা নেই, চলে যাবে।’
‘বড় বেশি মাতাল নয় তো? টলে পড়বে না?’ মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করলেন সিভয়াজস্কি।
‘না, চালু ছোকরা। শুধু এখানে ওকে মদ না খাওয়াতে পারলেই হয়… আমি ব্যুফের লোককে বলেছি কোনক্রমে যেন এক ফোঁটাও না দেয়।’
ঊনত্রিশ
যে সংকীর্ণ হলটায় লোকজন ধূমপান আর জলযোগ করছিল, তা অভিজাতে ভরা। ক্রমেই বেড়ে উঠছিল উত্তেজনা, চোখে পড়ছিল সমস্ত মুখেই অস্থিরতা। বিশেষ প্রবল রকমে উত্তেজিত হয়েছিল নেতারা, সমস্ত খুটিনাটি ও ভোটের হিসাব যাদের জানা ছিল। এরা হলেন আসন্ন সংঘষের ব্যবস্থাপক। বাকিরা সাধারণ সৈন্যের মত লড়াইয়ের জন্য তৈরি হলেও আপাতত চিত্তবিনোদনের সন্ধানে ছিলেন। কিউ টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অথবা বসে নাস্তা সারছিলেন; অন্যেরা সিগারেট টানতে টানতে লম্বা ঘরখানার এ-মাথা ও-মাথা পায়চারি করছিলেন আর আলাপ করছিলেন বহুদিন না-দেখা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে
খাবার ইচ্ছে হচ্ছিল না লেভিনের, ধূমপান তিনি করেন না। নিজেদের লোকদের অর্থাৎ কজ্নিশেভ, অব্লোন্স্কি সি্ভ্য়াজস্কি এবং অন্যান্যদের কাছে যেতে চাইছিলেন না। কারণ তাদের সঙ্গে টগবগে আলাপে যোগ দিয়েছিলেন অশ্বপালের উর্দি পরিহিত ভ্রন্স্কি। আগের দিনই লেভিন তাকে দেখেছিলেন নির্বাচনে এবং সাক্ষাৎ হোক এটা না চেয়ে প্রাণপণে তাকে এড়িয়ে যান। জানালার কাছে গিয়ে লেভিন বসলেন এবং চারপাশের গ্রুপগুলোর দিকে তাকিয়ে শুনতে লাগলেন কি আলোচনা চলছে। মন-মরা হয়ে ছিলেন তিনি, বিশেষ করে এজন্য যে উনি দেখতে পাচ্ছেন সবাই চাঙ্গা, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, ব্যস্ত, আর তিনিই এবং নৌবাহিনীর উর্দি পরা দন্তহীন জনৈক বৃদ্ধেরই কেবল কোন আগ্রহ নেই, কোন কাজ নেই। লেভিনের পাশে বসে বৃদ্ধ আপনমনে বিড়বিড় করে যাচ্ছিলেন।
