পঞ্চম দিনে নির্বাচিত হলেন উয়েদ্ প্রমুখেরা। কয়েকটা উয়েজদে দিনটা ডিনার পার্টি দেন তিনি।
সাতাশ
ষষ্ঠ দিনে গুবের্নিয়া কর্মকর্তাদের নির্বাচন ধার্য হয়। ছোট-বড় হলঘরগুলো ভরে উঠেছিল নানান উর্দি পরা অভিজাতে। অনেকেই এসেছিলেন শুধু এই দিনটার জন্যই কেউ ক্রিমিয়া, কেউ পিটার্সবুর্গ, কেউ বিদেশ থেকে আগত যে পরিচিতদের দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি অনেক দিন, তাঁরা মিললেন হলগুলিতে। রাজ্যপালের টেবিল ঘিরে জারের প্রতিকৃতি তলে আলোচনা চলছিল।
বড় আর ছোট হলঘরে অভিজাতরা ভাগ হয়ে গিয়েছিল দুই শিবিরে। মতামতের বৈপরীত্য ও অনাস্থা, অন্য কাউকে কাছে আসতে দেখলে চুপ করে যাওয়া। কেউ কেউ ফিসফিস করে কথা বলতে বলতে যেভাবে দূর করিডরে চলে যাচ্ছিল, তা থেকে বোঝা যায় যে উভয় পক্ষেরই পরস্পরের কাছ থেকে লুকানো কোন ব্যাপার আছে। বাহ্যিক চেহারায় অভিজাতরা দুই দলে পড়ে— নবীন আর প্রাচীন। বুড়োদের পরনে বেশির ভাগ পুরানো কালের অভিজাত বোতাম-আঁটা উর্দি, মাথায় টুপি, পাশে তলোয়ার, নয় নিজেদের বিশেষ নৌবহরী, অশ্বারোহী, পদাতিক কাঁধপট্টি : স্পষ্টতই তা খাটো, কোমরের কাছে আঁটো, যেন পরিহিতরা বেড়ে উঠেছে তাদের মধ্যে থেকে। নবীনদের পরনে অভিজাত উর্দির বোতাম খোলা, নিচু কোমর, কাঁধের কাছটা চওড়া, সাদা ওয়েস্ট-কোট, নয় কালো কলারের আদালতী উর্দি, তাতে জলপাই পাতার নক্শা তোলা। দরবারী পোশাকও নবীনদের পরনেই, কোথাও কোথাও তা জনতার শোভা বর্ধন করছিল।
কিন্তু নবীন ও বৃদ্ধদের ভাগটা দলের ভাগাভাগির সাথে মেলেনি। লেভিন লক্ষ করলেন যে নবীনদের কেউ কেউ রয়েছে পুরানোদের দলে। আবার অতি বৃদ্ধদের কেউ কেউ ফিসফিসিয়ে কথা বলছিলেন সি্ভ্য়াজস্কির সাথে এবং স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল তারা নতুন দলের উৎসাহী সমর্থক।
ছোট যে হলটায় লোকে ধূমপান ও জলযোগ করছিল, সেখানে নিজেদের লোকজনদের একটা দলের কাছে দাঁড়িয়ে লেভিন শুনছিলেন কি তারা বলছে, আর যা বলছে সেটা বোঝায় জন্য বৃথাই নিজের মানসশক্তি খাটাচ্ছিলেন। কজ্নিশেভ ছিলেন মধ্যমণি, তাঁকে ঘিরে জোট বেঁধেছে অন্যেরা। তিনি সিভয়াজস্কি এবং আরেকটি উয়েদের অভিজাতপ্রমুখ, তাঁর দলভুক্ত গ্লিউস্তোভের কথা শুনছিলেন। নিজের গোটা উয়েদ নিয়ে স্নেকোভকে ব্যালট ভোটে দাঁড়াতে বলতে আপত্তি করছিলেন স্লিউস্তোভ আর য়িাজঙ্কি তাঁকে বোঝাচ্ছিলেন সেটা করার জন্য। কজ্নিশেভ অনুমোদন করলেন পরিকল্পনাটা। লেভিন বুঝতে পারছিলেন না যে অভিজাতপ্রমুখকে বিরোধী পক্ষ সরাতে চাইছে, তাঁকে ভোটে দাঁড়াতে বলা হবে কেন।
খানাপিনা শেষ করে শোভন পাড়-দেওয়া বাতিস্ত রুমালে মুখ মুছতে মুছতে কামেরহের উর্দি পরিহিত অব্লোন্স্কি এলেন দলটার কাছে।
দুই দিকের গালপাট্টা ঠিক করে তিনি বললেন, ‘রুখে দাঁড়াচ্ছি তো সের্গেই ইভানিচ?’
এবং যা নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছিল তা শুনে তিনি সমর্থন করলেন সি্ভ্য়াজস্কির মত।
একটি উয়েদেই যথেষ্ট, আর সি্ভ্য়াজঙ্কি স্পষ্টতই হবে বিরোধী পক্ষ—তিনি বললেন লেভিন ছাড়া আর সবার কাছেই বোধগম্য এক ভাষায়। ‘কি কস্তিয়া, মনে হচ্ছে তুমিও পথে এসেছ?’ লেভিনের হাত ধরে তাঁকে বললেন তিনি। পথে আসতে পারলে লেভিন খুশিই হতেন, কিন্তু ব্যাপারটা যে কি নিয়ে সেটা তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেন না। যারা কথা বলছিল তাদের কাছ থেকে কয়েক পা সরে গিয়ে অব্লোন্স্কিকে বললেন যে, তিনি বুঝতে পারছেন না কেন প্রয়োজন হল গুবের্নিয়া প্রমুখকে অনুরোধ করার।
‘অহো পবিত্র সরলতা!’ লাতিন ভাষায় কথাটা বলে ব্যাপারটা কি তা সংক্ষেপে আর পরিষ্কার করে লেভিনকে বোঝালেন অব্লোন্স্কি।
আগেকার নির্বাচনগুলোর মত সমস্ত উয়েদ যদি গুবের্নিয়া প্রমুখকে অনুরোধ করে, তাহলে সমস্ত সাদা বলের ভোটে তিনি নির্বাচিত হয়ে যাবেন। সেটা উচিত নয়। এখন আটটা উয়েজ্দ তাঁকে অনুরোধ করতে রাজি হয়েছে: দুটো উয়েদ যদি অনুরোধ করতে গররাজি হয়, তাহলে স্নেৎকোভ ব্যালট ভোটে দাঁড়াতে না চাইতে পারেন। তখন পুরানো দলটা নিজেদের মধ্যে থেকে অন্য কাউকে মনোনীত করবে। কেননা বানচাল হয়ে যাবে সমস্ত হিসাব। কিন্তু যদি শুধু একটা উয়েদ, সি্ভ্য়াজস্কির উয়েজ্দ অনুরোধ না করে, তাহলে স্নেকোভ ভোটে দাঁড়াবে। নির্বাচিত করা হবে তাঁকে, ইচ্ছা করেই বেশি ভোট দেওয়া হবে তাঁর পক্ষে, বিরোধীপক্ষের চোখে ধুলো দেওয়া হবে, তাই আমাদের প্রার্থী যখন দাঁড়াবে ওরাও ভোট দেবে তার পক্ষে
লেভিন বুঝলেন, কিন্তু পুরোটা নয়, আরো কিছু প্রশ্ন করার ইচ্ছে হয়েছিল তাঁর, কিন্তু এই সময় হঠাৎ সবাই বলতে বলতে কলরব করে এগিয়ে গেল বড় হলটায়।
‘কি ব্যাপার?’ এ্যাঁ?’ ‘কাকে?’ ‘প্রত্যয়পত্র?’ ‘কার জন্যে?’ ‘এ্যাঁ?’ ‘আপত্তি করছে?’ ‘প্রত্যয়পত্র নেই।’ ‘ফ্লেরভকে অনুমতি দিচ্ছে না।’ ‘তার নামে মামলা আছে তো কি হল?’ ‘তাহলে তো কেউই অনুমতি পাবে না।’ ‘জঘন্য ব্যাপার।’ ‘আইন!’ চারদিক থেকে লেভিন শুনতে পেলেন আর কোন-এক দিকে যাবার জন্য যারা তাড়াহুড়া করছে, ভয় পাচ্ছে কিছু-একটা বুঝি ফসকে যাবে, তাদের সবার সাথে গেলেন বড় হলে এবং অভিজাতদের ঠেলাঠেলিতে পৌঁছলেন রাজ্যপালের টেবিলের অনেকটা কাছে। সেখানে গুবের্নিয়া প্রমুখ, সিভয়াজস্কি এবং অন্যান্য পাণ্ডাদের মধ্যে উত্তপ্ত বিতর্ক চলছিল।
আটাশ
বেশ দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন লেভিন। তাঁর পাশে একজন অভিজাতদের ঘড়ঘড়ে ভারী নিঃশ্বাস এবং অন্য মারেকজনের ক্যাঁচকেঁচে জুতোর সোলে পরিষ্কার করে শুনতে পাচ্ছিলেন না কথাগুলো। দূর থেকে তাঁর কানে এল শুধু অভিজাতপ্রমুখের নরম গলা, বিষজিহগব অভিজাতটির ক্যাঁককেঁকে কণ্ঠস্বর, তারপর সিভয়াস্কির গলা। লেভিন যতটা বুঝলেন ওঁরা তর্ক করছিলেন আইনের একটা ধারা, এবং তদন্তাধীন ব্যক্তি কথাটার অর্থ নিয়ে।
