এখন নির্বাচনে উপস্থিত থেকে, তাতে অংশ নিয়ে লেভিন একইভাবে চেষ্টা করছিলেন ধিক্কার না দিতে, তর্ক না করতে, সৎ ও সুন্দর যে লোকদের তিনি শ্রদ্ধা করেন তাঁর যে ব্যাপারটায় এত গুরুত্ব দিচ্ছেন, এত উৎসাহিত হচ্ছেন, সেটাও যতটা সম্ভব বুঝতে চাইছিলেন। লঘুচিত্ততাবশে আগে যা তাঁর কাছে অকিঞ্চিৎকর মনে হত, বিয়ে করার পর থেকে তার ভেতর এত নতুন নতুন গুরুত্বপূর্ণ দিক তিনি অনুমান করছিলেন, খোঁজ করছিলেন সেটার।
নির্বাচনে যে কু’দেতা ঘটবে বলে ধরা হচ্ছে তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য তাঁকে বোঝান কজ্নিশেভ। গুবের্নিয়ার যে অভিজাতপ্রমুখের হাতে অছিগিরি (যা নিয়ে লেভিন এখন ভুগছেন), অভিজাতদের কাছ থেকে পাওয়া মোটা টাকা, বালিকাদের বালকদের উচ্চ বিদ্যালয়, ফৌজী তালিম, নতুন ধারায় জনশিক্ষা এবং শেষত জেমভো প্রশাসন প্রভৃতি নানা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কর্তব্যের ভার ন্যস্ত। সেই স্নেৎকোভ পুরনো অভিজাত আমলের লোক, প্রচুর টাকা উড়িয়েছেন, ভালোমানুষ, নিজের ধরনে সৎ কিন্তু একেবারেই বোঝেন না নবকালের দাবি। সব ব্যাপারেই তিনি অভিজাতদের পক্ষ নিতেন। সরাসরি বিরোধিতা করেন শিক্ষা প্রসারের, আর যে জেমভো সংস্থাগুলোর বিপুল গুরুত্ব থাকার কথা, তাদের তিনি নিতান্ত সম্প্রদায় বিশেষের সংস্থা বলে গণ্য করতেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা উচিত একেবারে নতুন, তাজা, আধুনিক মনোভাবাপন্ন কর্মিষ্ঠ কোন লোককে। আর কাজটা এমনভাবে চালাতে হবে যাতে অভিজাত সম্প্রদায়কে আত্মশাসনের যেসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেটা অভিজাত হিসেবে নয়, জেমভোর উপাদান হিসেবে তা কাজে লাগানো যায়। সমৃদ্ধ কাশিন গুবের্নিয়া সব সময়ই সকলের চেয়ে এগিয়ে থেকেছে। এখানে এত শক্তি এখন জমেছে যে এখানে উচিতমত কাজ চালালে তা অন্যান্য গুবের্নিয়া, গোটা রাশিয়ার পক্ষে আদর্শস্থানীয় হতে পারে। তাই গোটা ব্যাপারটার গুরুত্ব প্রভূত। সুতরাং অভিজাতপ্রমুখ স্নেৎকোভের জায়গায় সি্ভ্য়াজ্স্কিকে বসাবার কথা ভাবা হচ্ছে কিংবা আরো ভালো হয় নেভেদোভস্কিকে বসালে যিনি ভূতপূর্ব অধ্যাপক, চমৎকার বুদ্ধিমান লোক, কজ্নিশেভের বড় বন্ধু।
সভার উদ্বোধন করলেন রাজ্যপাল। অভিজাতদের উদ্দেশে তিনি বললেন যে, তাঁর যেন কর্মকর্তাদের নির্বাচন করেন ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের জন্য নয়, তাঁদের কৃতিত্ব। পিতৃভূমির কল্যাণ হেতু তাঁদের কাজের জন্য, এবং এই আশা তিনি প্রকাশ করলেন যে কাশিনের মাননীয় অভিজাতকুল আগেকার নির্বাচনগুলোর মতই পবিত্রভাবে নিজেদের কর্তব্য পালন করে মহারাজের আস্থার মর্যাদা রাখবেন।
বক্তৃতা শেষে রাজ্যপাল হলঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন আর অভিজাতরা কলরব করে, স্ফুর্তিতে, কেউ কেউ এমন কি উচ্ছ্বসিত হয়েই অনুসরণ করলেন তাঁকে, উনি যখন তাঁর ওভারকোট পরতে পরতে গুবের্নিয়া প্রমুখের সাথে বন্ধুর মত কথা বলছিলেন, তখন তাঁকে ঘিরে ধরলেন তাঁরা। সব কিছু বোঝা এবং কিছুই ছেড়ে না দেবার চেষ্টায় উৎকর্ণ লেভিনও ছিলেন ভিড়ের মধ্যে, রাজ্যপালকে তিনি বলতে শুনলেন, ‘মারিয়া ইভানোভনাকে দয়া করে বলবেন যে, আমার স্ত্রী খুবই দুঃখিত। কিন্তু তাঁকে নিঃস্বনিকেতনে যেতে হচ্ছে।’ এর পর অভিজাতরা ফুর্তি করে ওভারকোট খুঁজে নিয়ে সবাই গেলেন গির্জায় 1
গির্জায় লেভিন অন্য সকলের মত হাত তুলে যাজকপ্রধানের কথাগুলো আওড়ালেন এবং সাংঘাতিক এই শপথ নিলেন যে, রাজ্যপাল যা আশা করেছেন তা পূরণ করবেন। গির্জার ক্রিয়াকর্ম সব সময়ই প্রভাব বিস্তার করে লেভিনের ওপর এবং ‘ক্রুশ চুম্বন করি’ বলে তিনি যখন নবীন প্রবীণ ভদ্রলোকদের জনতার দিকে তাকিয়ে একই কথা বলতে শুনলেন, অভিভূত হলেন তিনি।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে আলোচনা চলল অভিজাতদের তহবিল আর বালিকাদের জিমনাসিয়াম নিয়ে। কজ্নিশেভ বোঝলেন যে, প্রশ্ন দুটোর কোন গুরুত্ব নেই। তাই লেভিন আলোচনায় কান না দিয়ে নিজের কাজ নিয়ে হাঁটাহাঁটি করলেন। চতুর্থ দিনে রাজ্যপালের টেবিল ঘিরে গুবের্নিয়া তহবিলের হিসাব-পরীক্ষা হয়। নতুন ও পুরাতন দলের মধ্যে প্রথম সংঘাতটা হয় এখানেই। যে কমিশনের ওপর হিসাব-পরীক্ষার ভার দেওয়া হয়েছিল, তাঁরা সভার কাছে বিবৃতি দিলেন যে হিসাবে খুঁত নেই। গুবের্নিয়ার অভিজাতপ্রমুখ উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর ওপর আস্থার জন্য অভিজাতবর্গকে ধন্যবাদ জানালেন সজল চোখে। অভিজাতরা উচ্চ কণ্ঠে শুভসম্ভাষণ জানালেন তাঁকে, করমর্দন করলেন। কিন্তু এই সময় কজ্নিশেভের দলের জনৈক অভিজাত বললেন যে তিনি শুনেছেন, কমিশন হিসাব-পরীক্ষা করলে অভিজাত অপমান করা হবে বলে তাঁরা মনে করছেন। কমিশনের একজন সদস্য অসাবধানে সমর্থন করলেন ব্যাপারটা। তখন দেখতে ছোটখাট অতি তরুণ কিন্তু বচনে অতি বিষজিহ্ব এক ভদ্রলোক বললেন যে, গুবের্নিয়ার অভিজাতপ্রমুখের নিশ্চয় হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে আনন্দ হতে পারত, কিন্তু কমিশন সভ্যদের মাত্রাতিরিক্ত ভদ্রতা তাঁকে এই নৈতিক তুষ্টি থেকে বঞ্চিত করেছে। কমিশনের সভ্যরা তখন প্রত্যাহার করলেন তাঁদের বিবৃতি, আর কজ্নিশেভ যুক্তি বলে প্রমাণ করতে চাইলেন যে, স্বীকার করতে হবে হিসাবটা হয় পরীক্ষিত হয়েছে কিংবা হয়নি, এবং অতি খুঁটিনাটিতে বিস্তারিত করলেন এই দ্বৈধ। অপর দলের এক বাক্যবীর আপত্তি করলেন কজ্নিশেভের কথায়। তারপর বক্তৃতা দিলেন সি্ভ্য়াজ্স্কি এবং আবার বিষজিহ্ব সেই ভদ্রলোকটি। আলোচনা চলল অনেকক্ষ ধরে কিন্তু কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছল না। লেভিনের অবাক লাগল এই দেখে যে ব্যাপারটা নিয়ে বিতর্ক চলছে এতক্ষণ, বিশেষ করে কজ্নিশেভকে তিনি যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তহবিলের অপচয় হয়েছে বলে তিনি মনে করেন কিনা, তখন তিনি জবাব দিয়েছিলেন : ‘আরে না! লোকটা সৎ। কিন্তু অভিজাতদের ব্যাপার পরিচালনার এই সাবেকী পিতৃতান্ত্রিক পারিবারিক পদ্ধতিটা নড়িয়ে দেওয়া দরকার।’
