‘টেলিগ্রাম পেয়েছিলি? ভালো তো?
সৃষ্টিকর্তার কৃপা।’
‘ভালোয় ভালোয় এসেছ তো?’ মায়ের পাশে বসে জিজ্ঞেস করলেন পুত্র, অজান্তে তার কান ছিল দরজার ওপাশে একটা নারীকন্ঠের দিকে। উনি জানতেন যে ঢোকার মুখে যে মহিলাকে দেখেছিলেন, এটি তারই গলা।
কণ্ঠস্বর বলছিল, তাহলেও আমি আপনার সাথে একমত নই।’
‘ওটা পিটার্সবুর্গী দৃষ্টিভঙ্গি মান্যবরা।
‘পিটার্সবুর্গী নয়, নিতান্ত নারীসুলভ’, উত্তর দিলেন তিনি।
‘তা আপনার হস্তচুম্বন করতে দিন।
‘আসুন, আবার দেখা হবে ইভান পেত্রভিচ। তাঁ, দেখুন তো, আমার ভাই এখানে আছে কিনা, আমার কাছে। পাঠিয়ে দিন’, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মহিলা বললেন এবং আবার ঢুকলেন কম্পার্টমেন্টে।
ভ্ৰনস্কায়া তাঁকে বললেন, ‘কি, ভাইকে পেলেন?
এবার ভ্রনস্কির স্মরণ হল, ইনিই কারেনিনা।
উঠে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘আপনার ভাই এখানেই। মাপ করবেন, আমি আপনাকে চিনতে পারিনি, তাছাড়া আমাদের পরিচয় এত সামান্য, ভ্রনস্কি মাথা নোয়ালেন, ‘আমার কথা নিশ্চয় আপনার মনে নেই।’
উনি বললেন, ‘আরে না, আমি আপনাকে চিনতে পারতাম, কেননা সারা পথটাই বোধহয় আপনার মায়ের সাথে আমরা আপনার কথা গল্প করতে করতে এসেছি’, তার যে সজীবতা বহিঃপ্রকাশ চাইছিল, অবশেষে তাকে হাসিতে পথ ছেড়ে দিয়ে বললেন, কিন্তু আমার ভাই তো এখনো এল না।’
‘ওকে ডেকে আন আলিওশা’, বললেন বৃদ্ধা কাউন্টেস।
ভ্রনস্কি প্ল্যাটফর্মে নেমে চিৎকার করলেন : ‘অবলোনস্কি!’
কিন্তু ভাইয়ের জন্য কারেনিনা বসে রইলেন না, তাঁকে দেখা মাত্র দৃঢ় লঘু পায়ে বেরিয়ে এলেন ওয়াগন থেকে। আর ভাই কাছে আসতেই যে দৃঢ়, ললিত ভঙ্গিতে তিনি বাঁ হাতে ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরে নিজের কাছে টেনে এনে প্রগাঢ় চুম্বন করলেন, তাতে আশ্চর্য লেগেছিল ভ্রনস্কির। চোখ না সরিয়ে ভ্রনস্কি তাকিয়ে ছিলেন কারেনিনার দিকে, নিজেই জানতেন না কেন হাসছেন। কিন্তু মা তার অপেক্ষায় আছেন মনে পড়ায় আবার উঠলেন ওয়াগনে।
কারেনিনা সম্পর্কে কাউন্টেস বললেন, সত্যি, ভারি মিষ্টি, তাই না? ওঁর স্বামী ওঁকে উঠিয়ে দেন আমার কামরায়। আমি ভারি খুশি, সারা রাস্তা আমরা গল্প করেছি। কিন্তু তুই…’, এরপর ফরাসি ভাষায় বললেন, ‘এখনো তোমাকে আদর্শ প্রেম টানছে। সে ভালোই প্রিয়বর, ভালোই।’
জানি না কি বলতে চাইছেন, নিরুত্তাপ গলায় জবাব দিলেন পুত্র, মা, তাহলে যাওয়া যাক।
কাউন্টেসের কাছ থেকে বিদায় নেবার জন্য কারেনিনা আবার এলেন ওয়াগনে। ফুর্তির সুরে তিনি বললেন, তাহলে কাউন্টেস, আপনি আপনার ছেলেকে পেলেন, আমি আমার ভাইকে। আমার সব কাহিনী শেষ, এর পর আর বলার কিছু নেই।
‘আরে না, না, ওঁর হাত ধরে বললেন কাউন্টেস, আপনার সাথে আমি সারা দুনিয়া ঘুরে আসতে পারি, একটুও বিরক্তি লাগবে না। আপনি তেমনি একজন মিষ্টি মেয়ে যার সাথে কথা বলা বা চুপ করে থাকা, দুই-ই সমান আনন্দের। আর আপনার ছেলের কথা কিছু ভাববেন না : কখনো ছেড়ে থাকা যাবে না, এটা তো চলে না।
একেবারে খাড়া শরীরে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন কারেনিনা, চোখ দুটো তার হাসছিল।
ছেলেকে বুঝিয়ে বললেন কাউন্টেস, ‘আন্না আর্কাদিয়েভনার ছেলে আছে একটা, বোধ হয় আট বছর বয়স। কখনো তাকে ছেড়ে থাকেননি, এবার রেখে এসেছেন বলে কষ্ট পাচ্ছেন।
কারেনিনা বললেন, হ্যাঁ, সারাটা সময় কাউন্টেস আর আমি গল্প করেছি, আমি বলেছি আমার ছেলের কথা, উনি। ওঁর। মুখ ওঁর আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল হাসিতে, ভ্রনস্কির উদ্দেশে স্নিগ্ধ হাসি।
রঙ্গলীলার যে বলটা ছোঁড়া হয়েছিল সেটা তৎক্ষণাৎ লুফে নিয়ে কি বললেন, তাতে নিশ্চয় ভারি ক্লান্ত হয়েছেন আপনি। কিন্তু বোঝা গেল এসবের কথাবার্তা চালিয়ে যাবার ইচ্ছে ছিল না কারেনিনার, উনি বৃদ্ধা কাউন্টেসের দিকে ফিরলেন : অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। কাল কি করে যে সময় কেটে গেল খেয়ালই করিনি। আসি তাহলে, কাউন্টেস।
কাউন্টেস বললেন, ‘বিদায় ভাই, দিন আপনার সুন্দর মুখখানায় একটু চুমু দিই। বুড়িদের মত স্রেফ সোজাসুজিই বলছি, আমি আপনার প্রেমে পড়ে গেছি।
কথাটা যেভাবেই বলা হোক, বোঝা গেল কারেনিনা মনেপ্রাণে সেটা বিশ্বাস করেছেন এবং তাতে খুশি হয়ে উঠেছেন; লাল হয়ে তিনি সামান্য নত হয়ে মুখ পাতলেন কাউন্টেসের ঠোঁটের কাছে, আবার সিধে হয়ে ঠোঁট আর চোখের মাঝখানে চঞ্চল সেই হাসি নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন ভ্রনস্কির দিকে। বাড়িয়ে দেওয়া ছোট্ট হাতখানায় চাপ দিলেন তিনি আর কেমন যেন সতেজে কারেনিনা তাঁর হাতটা নিয়ে সজোরে এবং অসংকোচে ঝাঁকুনি দিলেন, তাতে খুশি লাগল তার। কারেনিনা চলে গেলেন তার রীতিমত পুরুষ্টু দেহের পক্ষে দ্রুত, আশ্চর্য অনায়াস গতিভঙ্গিমায়।
‘ভারি মিষ্টি’, বললেন বৃদ্ধা।
পুত্রও তাই ভাবছিলেন। কারেনিনার সৌষ্ঠবমণ্ডিত মূর্তি দৃষ্টির আড়াল না হওয়া পর্যন্ত ভ্ৰভ্রনস্কি তাকিয়ে ছিলেন তাঁর দিকে, মুখে তার হাসিটা লেগেই ছিল। জানলা দিয়ে তিনি দেখলেন কারেনিনা ভাইয়ের কাছে গিয়ে তাঁকে বাহুলগ্ন করে সোৎসাহে কি-একটা বলতে শুরু করলেন, অবশ্যই এমন কোন কথা যার সাথে ভ্রনস্কির কোন সম্পর্ক নেই এবং তাতে মন খারাপ হয়ে গেল তার।
