ভজ্দ্ভিজেনস্কয়েতে সি্ভ্য়াজ্স্কি আসতেন প্রায়ই, নির্বাচনের আগে ভ্রন্স্কির কাছে গেলেন তিনি
এর আগের দিনটায় প্রস্তাবিত যাত্রা দিয়ে ভ্রন্স্কি আর আন্নার মধ্যে প্রায় কলহ বাধার উপক্রম হয়েছিল। গ্রামাঞ্চলের সবচেয়ে কষ্টকর একঘেয়ে হেমন্তকাল তখন। তাই সংগ্রামের জন্য তৈরি হয়ে, আন্নার সাথে আগে যেভাবে কথা বলেননি কখনো, তেমন একটা নিরুত্তাপ মুখভাব নিয়ে ভ্রন্স্কি তাঁর যাত্রার কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তিনি অবাক হয়ে দেখলেন যে আন্না খবরটা নিলেন অতি শান্তভাবে, শুধু জিজ্ঞেস করলেন কবে তিনি ফিরবেন। তাঁর এই শান্ত ভাবের কারণ বুঝতে না পেরে ভ্রন্স্কি গভীর মনোযোগে তাকালেন তাঁর দিকে। তাঁর দৃষ্টি দেখে আন্না হাসলেন। নিজের মধ্যে গুটিয়ে যাবার এই ক্ষমতাটা ভ্রন্স্কির কাছে অজ্ঞাত নয়। তিনি এও জানতেন যে, আন্না এভাবে গুটিয়ে যান শুধু তখনই যখন নিজের পরিকল্পনাটা না জানিয়ে নিজের সম্পর্কে একটা স্থির সিদ্ধান্ত নেন। এটাই ভয় পাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু রাগারাগি এড়াতে খুবই চাইছিলেন বলে যা তিনি বিশ্বাস করতে চাইছিলেন, ভাব করলেন যেন তা বিশ্বাস করেছেন এবং অংশত সত্যিই বিশ্বাস করলেন যথা— আন্নার কাণ্ডজ্ঞান আছে।
‘আশা করি, তোমার একঘেয়ে লাগবে না?’
‘আশা করি। কাল গতিয়ে’র কাছ থেকে এক বাক্স বই পেয়েছি। না, একঘেয়ে লাগবে না।’
‘এই ভাবটাও দেখাতে চাইছে, তা বরং ভালো’, ভাবলেন ভ্রন্স্কি, ‘নইলে সেই একই ব্যাপার দাঁড়াবে।’
আন্না তাঁর মনের কথাটা খোলাখুলি প্রকাশ করুন, এ জেদ না ধরে ভ্রন্স্কি ওভাবেই চলে গেলেন নির্বাচনে। সবটা বোঝাবুঝি না করে আন্নাকে তিনি ছেড়ে গেলেন তাঁদের মিলিত জীবনে এই প্রথম। একদিক থেকে, এতে তাঁর দুশ্চিন্তা হচ্ছিল, অন্যদিকে তাঁর মনে হল এটাই ভালো। ‘প্রথমটা এখনকার মত আবছা, লুকানো কিছু-একটা থাকবে, তারপর অভ্যস্ত হয়ে যাবে। অন্তত আমি ওকে সবই দিতে পারি, কিন্তু আমার পুরুষোচিত স্বাধীনতাটা নয়’, ভাবলেন তিনি।
ছাব্বিশ
সেপ্টেম্বর মাসে কিটির প্রসবের জন্য মস্কো আসেন লেভিন। বিনা কাজে মস্কোয় এক মাস যখন কাটল, কজ্নিশেভ তখন নির্বাচনে যাবার উদ্যোগ করছিলেন। কশিন গুবের্নিয়ায় তাঁর মহাল আছে, এবং আসন্ন নির্বাচনের ব্যাপারে বড় একটা ভূমিকা নিচ্ছিলেন তিনি। লেভিনকে তিনি সাথে ডাকলেন, সেলেনেস্কি উয়েদ্ বাবদ একটা ভোট ছিল লেভিনের। তাছাড়া বিদেশবাসী বোনের জন্য কাশিনে খুব জরুরী একটা কাজও তাঁর ছিল—অছি আর ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়া নিয়ে।
মনঃস্থির করে উঠতে পারছিলেন না লেভিন। কিন্তু মস্কোতে ওঁর একঘেয়ে লাগছে দেখে কিটি পরামর্শ দিল যেতে আর লেভিনকে না জানিয়ে আশি রুব্ল দামের অভিজাত উর্দির বরাত দিল। উর্দির জন্য ব্যয় করা এই আশি রুলই প্রধান কারণ যা তাঁকে যেতে প্রবৃত্ত করল। তিনি কাশিনে চলে গেলেন।
আজ ছয় দিন কাশিনে আছেন লেভিন। রোজ সভায় যান, তদবির তদারক করেন বোনের কাজটা নিয়ে। কিন্তু কোন সুরাহা হচ্ছিল না তার। অভিজাতপ্রমুখের সবাই নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত, তাই অছি সংক্রান্ত নিতান্ত সাধারণ কাজটাও করা যাচ্ছিল না। দ্বিতীয় কাজ—টাকা পাওয়া, তাতেও বিঘ্ন ঘটছিল। ব্যাপারটা নিয়ে দীর্ঘ ছোটাছুটির পর টাকাটা পাবার মত আবস্থা হল। কিন্তু অতি পরার্থপর নোটারি চেক দিতে পারলেন না। কেননা সভাপতির সই চাই, আর কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে সভাপতি চলে গেছেন অধিবেশনে। এসব ঝামেলা, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় হাঁটাহাঁটি, অতি সহৃদয় সজ্জন যেসব ভদ্রলোকেরা পুরোপুরি বোঝেন যে আবেদনকারী খুবই অনুচিত একটা অবস্থায় পড়েছেন। কিন্তু তাঁকে সাহায্য করতে অক্ষম—তাঁদের সাথে কথা বলা নিষ্ফল এসব প্রসাস লেভিনের মধ্যে শক্তিহীনতার যন্ত্রণাকর একটা অনুভূতি জাগাচ্ছিল। যেমনটা হয় স্বপ্নে, দৈহিক শক্তি প্রয়োগ করতে গিয়ে অথচ না পেরে। এই অনুভূতিটা লেভিনের প্রায়ই হচ্ছিল তাঁর সহৃদয় এজেন্টের সাথে কথা বলতে গিয়ে। মুশকিল থেকে লেভিনকে উদ্ধার করার জন্য তিনি যেন সম্ভবপর সব কিছু করছেন। কাজে লাগাচ্ছেন নিজের সমস্ত মানাসিক শক্তি। ‘এটা করে দেখুন’, বহুবার বলেছেন তিনি, ওখানে যান— সেখানে যান’, এবং সর্বনাশা যে নিমিত্তটা সব কিছুতে ঝগড়া দিচ্ছিল, তাকে এড়িয়ে যাবার জন্য পুরো একটা পরিকল্পনাও ছকে ফেললেন। কিন্তু তখনই যোগ দিলেন, ‘তাহলেও আটকে রাখবে, তবু চেষ্টা করে দেখুন।’ লেভিনও চেষ্টা করে দেখলেন, হাঁটাহাঁটি করলেন, গেলেন। সবাই অতি ভালোমানুষ এবং অমায়িক, কিন্তু দেখা গেল অতিক্রান্ত বাধাটা আবার মাথাচাড়া দিয়েছে শেষের দিকে এবং পথ আটকে রাখছে। লেভিনের বিশেষ রকমের বিশ্রী লাগছিল যে কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না কার সঙ্গে তিনি লড়ছেন, তাঁর ব্যাপারটার ফয়সালা না হওয়ায় লাভ হচ্ছে কার। মনে হল কেউ সেটা জানে না; জানে না তাঁর এজেন্টও। কিউয়ে না দাঁড়িয়ে টিকিট কেনার জানালায় যাওয়া যায় না—এটা লেভিন যেমন বোঝেন, ব্যাপারটা তেমনি করে বুঝতে পারলে লেভিনেরও দুঃখ হত না; কিন্তু কাজটায় যেসব প্রতিবন্ধক দেখা দিচ্ছে, কি তার কারণ, কেন তারা আছে, কেউ বোঝাতে পারল না তাঁকে। কিন্তু বিয়ের পর থেকে অনেক বদলে গেছেন লেভিন। সহিষ্ণু হয়েছেন তিনি। যদি ধরতে না পারতেন ব্যাপারটা এমন কেন, তাহলে নিজেকে বোঝাতেন যে সব কিছু না জেনে তিনি মত দিতে পারেন না, সম্ভবত ওটাই দরকার, চেষ্টা করতেন বিক্ষুব্ধ না হবার।
