‘আন্না আর ভ্রন্স্কিকে—এবার আমি ওঁকে আরো ভালো করে জানালাম—ভালো করে জানলেই বোঝা যাবে কি মর্মস্পর্শী মধুর মানুষ তাঁরা—এখন সত্যিই অকপটে বললেন, ওখানে যে একটা অনির্দিষ্ট অপ্রসন্নতা আর অস্বস্তি বোধ করেছিলেন, সেটা ভুলে গেলেন তিনি।
আন্না কারেনিনা – ৬.২৫
পঁচিশ
সেই একই অবস্থায় ভ্রন্স্কি আর আন্না। বিবাহবিচ্ছেদের কোন ব্যবস্থা না নিয়ে একইরকমে গ্রামে কাটালেন গোটা গ্রীষ্ম আর হেমন্তের একাংশ। তাঁরা ঠিক করেছিলেন কোথাও যাবেন না; কিন্তু যত বেশি তাঁরা একা একা থাকতে লাগলেন। বিশেষ করে শরতে, অতিথি যখন নেই, ততই তাঁরা অনুভব করলেন যে এ জীবনে টিকে থাকা যাবে না, বদলাতে হবে তাকে।
মনে হতে পারত এ জীবনের চেয়ে আরো ভালো কিছু কামনার থাকতে পারে না। ছিল পরিপূর্ণ প্রাচুর্য, স্বাস্থ্য, শিশু, আর কাজ ছিল দুজনেরই। অতিথি না থাকলেও আন্না নিজের রূপের দিকে মন দিচ্ছিলেন একই রকম। বই পড়ছিলেন অনেক, উপন্যাস আর গুরুত্বপূর্ণ যে সব বইয়ের তখন বেশ চল। ওঁরা যে সব বিদেশী পত্র-পত্রিকা নিতেন, তাতে যে সমস্ত বইয়ের সপ্রশংস উল্লেখ থাকত। তার বরাত দিতেন আন্না, আর পড়তেন সেই মনোযোগে যা সম্ভব কেবল একাকিত্বে। তাছাড়া যেসব বিষয় নিয়ে ভ্রন্স্কি ব্যস্ত ছিলেন সেগুলি নিয়েও তিনি পড়াশুনা করেন বই আর বিশেষ পত্রিকা থেকে। ভ্রন্স্কি সরাসরি তাঁর কাছে আসতেন কৃষি, বাস্তুকর্ম, এমন কি ঘোড়া ও ক্রীড়ার প্রশ্ন নিয়েও। তাঁর জ্ঞান আর স্মৃতিশক্তিতে অবাক হতেন তিনি। প্রথম দিকে তাঁর সন্দেহ হত, প্রমাণ চাইতেন, আর যা নিয়ে তাঁর প্রশ্ন, বইয়ে সেই জায়গাটা বার করে আন্না তাঁকে দেখিয়ে দিতেন।
আন্না হাসপাতাল নিয়েও ব্যস্ত ছিলেন। তিনি শুধু সাহায্যই করেননি, অনেক কিছুর ব্যবস্থা করেছেন, ভেবে বার করেছেন নিজেই। তাহলেও তাঁর প্রধান ব্যস্ততা ছিল নিজেকে নিয়ে, নিজে—কেননা তাঁকে থাকতে হবে ভ্রন্স্কির প্রিয়তমা। তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এই যে কামনাটা, তাঁকে ভ্রন্স্কির ভালো লাগুক শুধু নয়, ভ্রন্স্কির দাসত্ব করারই এই আকাঙ্ক্ষাটার মূল্য দিতেন ভ্রন্স্কি। কিন্তু সেই সাথে আন্না যেসব প্রেমাজালে তাঁকে জড়াতে চাইতেন, ক্লেশ বোধ করতেন তিনি। যত দিন যাচ্ছিল, যত ঘন ঘন তিনি নিজেকে দেখতে পাচ্ছিলেন এসব জালে আবদ্ধ, ততই তা থেকে বেরিয়ে আসতে নয়, ইচ্ছা হত পরখ করে দেখবেন তাঁর স্বাধীনতায় তা বাধা দিচ্ছে কিনা স্বাধীন হবার এই ক্রমবর্ধমান ইচ্ছাটা না থাকলে, অধিবেশন বা ঘোড়দৌড়ের জন্য প্রতিবার শহরে যাবার সময় রাগারাগির ঘটনাগুলো না ঘটলে নিজের জীবনে সম্পূর্ণ তুষ্ট থাকতে পারতেন ভ্রন্স্কি। যে ভূমিকাটা তিনি বেছে নিয়েছিলেন, রুশ অভিজাত সমাজের কোষকেন্দ্র যাদের হওয়ার কথা, ধনী ভূস্বামীর সেই ভূমিকাটা শুধু তাঁর মনে ধরেছিল তাই নয়, এভাবে ছয় মাস কাটাবার পর এখন তাতে ক্রমেই তৃপ্তি পাচ্ছিলেন বেশি। তাঁর বিষয়কর্মেও তিনি ক্রমেই বেশি করে ব্যস্ত ও লিপ্ত থাকছিলেন আর তা চলছিলও চমৎকার। হাসপাতালের জন্য যে বিপুল পরিমাণ টাকা লেগেছিল, তাছাড়াও যন্ত্রপাতি, সুইজারল্যান্ড থেকে আনানো গরু এবং আরো অনেককিছুর জন্য যে খরচ সেটা অপব্যয় নয় বলে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ভাবতেন নিজের সম্পত্তি তিনি বাড়িয়ে তুলছেন। যেখানে ব্যাপারটা আয় নিয়ে, কাঠ, শস্য, ভেড়ার লোম বেচা, জমি বিলি নিয়ে, ভ্রন্স্কি সেখানে হতেন পাথরের মত শক্ত, দামে ছাড় দিতেন না। এই এবং অন্যান্য সম্পত্তিতে বিষয়কর্মের বড় বড় ব্যাপারে তিনি অতি সাধারণ পদ্ধতি অবলম্বন করতেন, যাতে কোন ঝুঁকি থাকবে না। ছোটখাট ব্যাপারে হতেন অতি মনোযোগী ও হিসেবী। ভ্রন্স্কি ধরা দেননি জার্মানটার চালাকি আর কায়দায়, যে তাঁকে কেনাকাটায় টানছিল আর যত রকম হিসেব দিচ্ছিল তাতে প্রথমে টাকা লাগত অনেক বেশি, কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে ওই একই ব্যাপার করা যেত অনেক সস্তায় এবং তখনই লাভ পাওয়া যেত তা থেকে। ভ্রন্স্কি গোমস্তার কথা শুনতেন, প্রশ্ন করতেন এবং তার প্রস্তাবে তখনই রাজি হতেন যখন যে জিনিসটার বরাত দেওয়া বা যা নিৰ্মাণ করা হচ্ছে, তা হত খুবই নতুন, রাশিয়ায় যা অজ্ঞাত, চমক দিতে পারবে। তাছাড়া বড় একটা খরচায় তিনি তখনই মত দিতেন, যখন বাড়তি টাকা থাকত হাতে। আর তা খরচা করার সমস্ত খুঁটিনাটি খতিয়ে দেখতেন আর নিজের টাকার সেরা ফায়দা আদায় করতেন। তাই যেভাবে তিনি সম্পত্তি দেখছিলেন তা থেকে পরিষ্কার বোঝা যেত যে তিনি টাকার অপব্যয় করছেন না, সম্পত্তি বাড়িয়ে তুলছেন।
অক্টোবর মাসে কাশিন গুবের্নিয়ায় অভিজাত নির্বাচন হওয়ার কথা। ভ্রন্স্কি, সি্ভ্য়াজ্স্কি কজ্নিশেভ, অব্লোন্স্কির মহাল ছিল সেখানে এবং লেভিনেরও সামান্য অংশ।
নানা কারণবশত এবং তাতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের জন্য নির্বাচনগুলি জনসমাজের মনোযোগ আকর্ষণ করে। নানা আলোচনা হয় তা নিয়ে, তোড়জোড় চলতে থাকে। মস্কো, পিটার্সবুর্গের লোকেরা এবং যে প্রবাসী রুশীরা কোন দিন নির্বাচনে আসত না, তারাও আসে এই নির্বাচনগুলোয়
অনেকদিন আগেই ভ্রন্স্কি সি্ভ্য়াজ্স্কিকে কথা দিয়েছিলেন যে নির্বাচনে তিনি যাবেন।
