‘ঘরের মাঝখানে এসে দুই হাতে বুক চেপে তিনি দাঁড়ালেন ডল্লির সামনে। সাদা ড্রেসিং-গাউনে তাঁর মূর্তিটা মনে হল বড় বেশি লম্বা-চওড়া। মাথা নিচু করে তিনি তাঁর চকচকে সজর চোখে মাঝে মাঝে চাইছিলেন ছোটখাট, রোগা, তালি-মারা গাউন আর নৈশ টুপিতে করুণ ডল্লির দিকে, যিনি ব্যাকুলতায় কাঁপছিলেন।
‘শুধু এই দুটো প্রাণীকেই আমি ভালোবাসি আর একটায় নাকচ হয় অন্যটা। ওদের আমি মেলাতে পারছি না, আর শুধু এটাই আমার চাই। এটা যদি না হয়, তাহলে আর সবে বয়েই গেল। সব, সব কিছুতে। যে করেই হোক এর একটা শেষ হবে, তাই এ সম্পর্কে আমি বলতে পারি না, বলতে ভালোবাসি না। তাই আমাকে ধিক্কার দিও না, কোন দোষ ধ’রো না আমার। আমার যে কত জ্বালা, তোমার পবিত্রতায় তার সবটা তুমি বুঝতে পারবে না।’
কাছে এসে তিনি বসলেন ডল্লির পাশে, দোষী-দোষী মুখে তাঁর দিকে তাকিয়ে তাঁর হাতটা টেনে নিলেন।
‘কি তুমি ভাবছ? কি তুমি ভাবছ আমার সম্পর্কে? ঘৃণা করো না আমাকে। ঘৃণার আমি যোগ্য নই, একান্তই হতভাগ্য আমি। হতভাগ্য কেউ থাকলে সে আমি’, এই বলে ডল্লির দিকে থেকে মুখ ফিরিয়ে তিনি কেঁদে ফেললেন।
ডল্লি যখন একা হলেন, প্রার্থনা সেরে বিছানায় শুলেন। আন্নার সাথে যখন তিনি কথা বলছিলেন, তখন তাঁর জন্য সত্যিই বড় কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। কিন্তু এখন তাঁর কথা তিনি চেষ্টা করেও ভাবতে পারলেন না। বাড়ি আর ছেলেমেয়েদের স্মৃতি তাঁর কল্পনায় ভেসে উঠল বিশেষ একটা নতুন মাধুর্যে, কেমন একটা নতুন ঔজ্জ্বল্যে। তাঁর এই জগৎটা তাঁর কাছে মনে হল এত আপন আর মধুর যে এর বাইরে কিছুতেই একটা দিনও কাটাতে রাজি নন তিনি, স্থির করলেন অবশ্য-অবশ্যই চলে যাবেন পরের দিনই।
আন্না ওদিকে নিজের ঘরে গিয়ে একটা পানপাত্রে কয়েক ফোঁটা ওষুধ ঢাললেন। যার বেশির ভাগই মর্ফিয়া। সেটা খেয়ে নিশ্চল হয়ে কয়েক মিনিট বসে থেকে শান্ত সজীব প্রাণে গেলেন শোবার ঘরে।
আন্না শোবার ঘরে ঢুকতে ভ্রন্স্কি মন দিয়ে তাকালেন তাঁর দিকে। ডল্লির ঘরে এতক্ষণ যে কাটালেন, তাতে অবশ্যই যে কথাবার্তা হবার কথা। তার ফলে কি দাঁড়াল সেটা ধরতে চাইছিলেন তিনি। কিন্তু আন্নার সংযত-উত্তেজিত যে মুখভাব কি যেন লুকিয়ে রাখছিল, তাতে ভ্রন্স্কি তাঁর সৌন্দর্য, এ সৌন্দর্য সম্পর্কে তাঁর চেতনা। আর সেটা ভ্রনস্কির ওপর কাজ করুক এমন একটা ইচ্ছা, যাতে তিনি অভ্যস্ত হলেও এখনো তার মোহে ধরা দেন—এছাড়া আর কিছু পেলেন না। কি কথাবার্তা হয়েছে সে বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে চাইলেন না তিনি, আশা করলেন আন্না নিজেই কিছু- একটা বলবেন। কিন্তু আন্না বললেন শুধু : ‘ডল্লিকে তোমার ভালো লেগেছে বলে আমি খুশি। ভালো লেগেছে তো, তাই না?’
‘ওকে আমি অনেকদিন থেকে জানি। ভারি ভালোমানুষ, মনে হয় তবে বড় বেশি গদ্যজাতীয়। তাহলেও ও আসায় আমি খুব খুশি।’
আন্নার হাতটা নিয়ে উনি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইলেন আন্নার চোখের দিকে।
দৃষ্টিটার অন্য মানে করে আন্না হাসলেন তাঁর উদ্দেশে।
পরের দিন সকালে গৃহের কর্তা-কর্ত্রীর অনুরোধ সত্ত্বেও দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা তৈরি হলেন যাবার জন্য। নিজের পুরানো কাফতান আর ডাক-হরকরী টুপি পরে লেভিনের কোচোয়ান তার বহুরূপী ঘোড়াগুলো আর তাপ্পি-মারা গাড়িটা আচ্ছাদিত বালি-ঢালা গাড়ি-বারান্দায় চালিয়ে নিয়ে এল দৃঢ়সংকল্প গোমড়া মুখে।
প্রিন্সেস ভারভারা আর অন্যান্য ভদ্রলোকদের কাছে বিদায় জ্ঞাপনের পালাটা ডল্লির কাছে সহজ হয়নি। একদিন কাটিয়েই ডল্লি এবং গৃহস্বামীরা স্পষ্টত টের পেয়েছিলেন যে তাঁর পরস্পরের যোগ্য নন, দহরম-মহরম না করাই ভালো। শুধু মন খারাপ হয়েছিল আন্নার। তিনি জানাতে যে তাঁর প্রাণের মধ্যে এই সাক্ষাৎটায় যেসব ভাবাবেগ উথলে উঠেছিল ডল্লি চলে যাওয়ায় এখন তা আর কেউ সচকিত করে তুলবে না। এসব অনুভূতির উদ্বেগ তাঁর কাছে ছিল কষ্টকর। তাহলেও তিনি জানাতেন যে সেগুলোই ছিল তাঁর প্রাণের সেরা দিক আর যে জীবন তিনি যাপন করছেন তাতে দ্রুত সে দিকটা আগাছায় ছেয়ে গেছে।
খোলা মাঠে এসে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার মন ভরে উঠল স্বাচ্ছন্দ্যের একটা প্রীতিকর অনুভূতিতে। ইচ্ছে হচ্ছিল চাকর-বাকরদের জিজ্ঞেস করবেন, কেমন লাগল ভ্রন্স্কির ওখানে। হঠাৎ কোচোয়ান ফিলিপ নিজেই বলে উঠল : ‘বড় লোক বটে, আচ্ছা বড় লোক, আর ওট দিলে মাত্র তিন মাপ। মোরগ ডাকা ভোরের আগেই সব শেষ। তিন মাপে কি হয়? শুধু নাস্তা। গেরস্তরা এ বছর ওট বেচছে পঁয়তাল্লিশ কোপেক করে। আমাদের ওখানে যত ঘোড়া আসে, যত তারা খেতে পারে তত ওট দেওয়া হয়।’
‘কৃপণ জমিদার’, সমর্থন করল মুহুরি।
‘কিন্তু ওদের ঘোড়াগুলো কেমন লাগল তোমার?’ জিজ্ঞেস করলেন ডল্লি।
‘ঘোড়া সে অন্য কথা। খাবার-দাবারও ভালো। তবে আমার কেমন যেন বেজার লাগছিল দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা, আপনার কেমন লেগেছে জানি না’, সুন্দর ভালোমানুষি মুখটা ফিরিয়ে সে বলল।
‘আমারও খারাপ লেগেছে। তা সন্ধ্যা নাগাদ পৌঁছব তো?’
‘পৌঁছতে হবে গো।’
বাড়ি ফিরে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা দেখলেন সবাই নিরাপদে আছে। সবাইকেই আরো বেশি ভালো লাগল তাঁর এবং অতি উৎসাহে বলতে লাগলেন তাঁর যাত্রার কথা, কি চমৎকার অভ্যর্থনা করা হয়েছে তাঁকে; ভ্রন্স্কিদের কেমন বিলাসবহুল জীবন আর সুরুচি, কি রকম তাদের আমোদ-প্রমোদ—এসবের কথা বলে ভ্রন্স্কিদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে দিলেন না কাউকে।
