‘তুমি বলছ, এটা খারাপ? কিন্তু ভালো করে ভেবে দেখা দরকার’, বলে চললেন আন্না, ‘তুমি ভুলে যাচ্ছ আমার অবস্থাটা। সন্তান আমি চাইতে পারি কেমন করে? প্রসবকষ্টের কথা বলছি না, ওতে আমার ভয় নেই। ভেবে দ্যাখো, কি হবে আমার শিশু? অপরের উপাধিধারী অভাগা। জন্মের মুহূর্তে থেকেই তাদের পড়তে হবে মা, বাপ, নিজের জন্মের জন্যেই লজ্জা পাবার আবশ্যিকতায়।’
‘এজন্যেই তো দরকার বিবাহবিচ্ছেদ।’
কিন্তু আন্না তাঁর কথায় কান দিলেন না। যেসব যুক্তি দিয়ে নিজেকে তিনি বহুবার বুঝিয়েছেন, তা সবটা বলার ইচ্ছে হচ্ছিল তাঁর।
‘দুনিয়ায় অভাগাদের জন্ম না দেবার জন্যে যদি তা ব্যবহার না করি, তাহলে কেনই-বা বিচার-বুদ্ধি দেওয়া হয়েছে আমাকে?’
ডল্লির দিকে তাকালেন তিনি, কিন্তু উত্তর না পেয়ে বলে গেলেন : ‘এসব অভাগা শিশুদের কাছে আমি সব সময় নিজেকে অপরাধী জ্ঞান করতাম। ওরা যদি না থাকে, তাহলে অন্ততপক্ষে ওরা অভাগা নয়, আর যদি অভাগা হয়, তাহলে একা আমিই দোষী।’
এগুলো ঠিক সেই যুক্তি যা দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা নিজেই নিজের কাছে উত্থাপন করেছিলেন; কিন্তু এখন সেগুলো শুনে তিনি বূঝতে পারছিলেন না কিছু। ভাবলেন, ‘যে জীবেরা নেই, তাদের কাছে দোষী হওয়া যায় কেমন করে?’ হঠাৎ তাঁর মনে এল, এমন কোন ক্ষেত্র সম্ভব কি যাতে তাঁর আদরের দুলাল গ্রিশার পক্ষে আদৌ না জন্মানো ভালো হত? ব্যাপারটা তাঁর কাছে বিদঘুটে, এত অদ্ভূত লাগল যে ঝাঁক বেঁধে আসা এই উন্মাদ ভাবনাগুলোর তালগোলটাকে তাড়াবার জন্য মাথা ঝাঁকালেন তিনি।
‘না, আমি জানি না, এটা ভালো নয়’, মুখে বিতৃষ্ণার ভাব নিয়ে শুধু এটুকু বললেন তিনি
‘হ্যাঁ, কিন্তু তুমি ভুলো না কে তুমি, কে আমি… তাছাড়া’, নিজের যুক্তির বিভব আর ডল্লির দৈন্য সত্ত্বেও এটা যে ভালো নয় সেটা যেন স্বীকার করে তিনি যোগ দিলেন, ‘প্রধান কথাটা তুমি ভুলো না যে আমি এখন তোমার অবস্থায় নেই। তোমার কাছে প্রশ্ন হল, চাও কি যে ছেলে আর না হোক, আমার কাছে প্রশ্ন, চাই কি ছেলে হোক? দুয়ের মধ্যে অনেক তফাৎ। বুঝতে পারছ, আমার অবস্থায় এটা আমি চাইতে পারি না।’
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা আপত্তি করলেন না। হঠাৎ তিনি অনুভব করলেন যে, আন্নার কাছ থেকে তিনি এত দূরে সরে গেছেন যে তাঁদের মধ্যে কতকগুলো প্রশ্নে তাঁরা কখনোই একমত হবেন না, তার কথা না তোলাই ভালো।
চব্বিশ
ডল্লি বললেন, ‘সে জন্যই তো যদি সম্ভব হয়, তোমার অবস্থাটা ঠিকঠাক করে নেওয়া আরো বেশি দরকার।’
‘হ্যাঁ, যদি সম্ভব হয়’, হঠাৎ আন্না বললেন একেবারে অন্যরকম একটা কণ্ঠস্বরে, মৃদু, বিষণ্ণ।
‘বিবাহবিচ্ছেদ কি সম্ভব নয়? আমি শুনেছি যে তোমার স্বামী রাজি।’
‘ডল্লি! এ নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে না আমার।’
‘বেশ, বলব না’, আন্নার মুখে যন্ত্রণা ফুটে উঠতে দেখে তাড়াতাড়ি করে বললেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা; ‘আমি শুধু দেখতে পাচ্ছি যে, তুমি সব কিছু দেখছ বেশি বিষাদের দৃষ্টিতে।’
‘আমি? একেবারে নয়। আমি খুব ফুর্তিতে, সুখে-স্বাচ্ছন্দে আছি। তুমি দেখেছ, আমার সাফল্য আছে। ভেস্লোভস্কি … ‘
‘হ্যাঁ, সত্যি বলতে কি, ভেস্লোভস্কির হালচাল আমার ভালো লাগেনি’, কথার মোড় ফেরাবার জন্য বললেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা।
‘আরে না! এতে আলেক্সেইকে একটু সুড়সুড়ি দেওয়া হয়, তার বেশি কিছু না; একেবারে খোকা, পুরোপুরি আমার হাতে; আমার যেমন খুশি তেমনি ওকে চালাই, বুঝেছ! ও ঠিক তোমার গ্রিশার মত… ডল্লি!’ হঠাৎ প্রসঙ্গ পালটালেন তিনি, ‘তুমি বলছ আমি সব কিছু দেখছি বিষাদের দৃষ্টিতে। তুমি বুঝতে পারবে না। এটা বড় বেশি ভয়ংকর। আদৌ কিছু না দেখার চেষ্টা করি আমি।’
‘কিন্তু আমার মনে হয় দেখা দরকার। যা সম্ভব, দরকার তেমন সব কিছু করা।’
‘কিন্তু কি সম্ভব? কিছুই না। বলছ যে আলেকসেইকে বিয়ে করা দরকার আর সে কথা ভাবছি না। আমি তা ভাবছি না!’ পুনরুক্তি করলেন তিনি, ‘লাল হয়ে উঠল তাঁর মুখ। উঠে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস নিতে নিতে তিনি তাঁর লঘূ চলনে পায়চারি করতে লাগলেন ঘরময়, থামছিলেন মাঝে মাঝে। ‘আমি ভাবছি না? এমন একটা দিন, একটা ঘণ্টাও যায় না, যখন আমি ভাবিনি আর ভেবেছি বলে আক্ষেপ করিনি… কেননা ও নিয়ে ভাবনা আমাকে পাগল করে দিতে পারে। পাগল করে দেয়’, পুনরাবৃত্তি করলেন তিনি। ‘যখন এ নিয়ে ভাবি, মর্ফিয়া ছাড়া ঘুমতে পারি না। বেশ, শান্তভাবে কথা বলা যাক। আমাকে বলা হচ্ছে– বিবাহবিচ্ছেদ। প্রথমত, আমাকে উনি সেটা দেবেন না। উনি এখন কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার কবলস্থ।’
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা সহানুভূতিতে কাতর মুখে চেয়ারে সোজা হয়ে বসে পাদচারণরত আন্নাকে দেখছিলেন মাথা ফিরিয়ে ফিরিয়ে। মৃদুস্বরে বললেন, ‘তাহলেও চেষ্টা করা দরকার।’
‘ধরে নিচ্ছি চেষ্টা করা গেল’, হাজারবার ভেবে দেখা প্রায় ঠোঁটস্থ একটা চিন্তা প্রকাশ করে বললেন তিনি; ‘এর অর্থ, যে আমি ওঁকে মহানুভব বলে মনে করলেও ঘৃণা করি, তবে তাঁর কাছে দোষী বলে মেনে নিই—সেই আমাকে হীন হতে হবে ওঁকে চিঠি লেখার জন্যে… বেশ, ধরা যাক আমি নিজের ওপর জোর খাটিয়ে এটা করলাম। হয় পাব অপমানকর জবাব, নয় সম্মতি। বেশ, নয় সম্মতিই পেলাম…’ আন্না এই সময় ঘরের দূর কোণটায় থেমে ব্যস্ত হলেন জানালার পর্দা নিয়ে, ‘সম্মতি আমি পেলাম, কিন্তু ছে… ছেলে? ছেলেকে তো ওরা দেবে না আমাকে। আমাকে ঘৃণা করে ও বড় হবে বাপের কাছে, যাকে আমি ত্যাগ করেছি। তুমি বুঝে দ্যাখো, দুটো প্রাণী, সেরিওজা আর আলেক্সেই—দুজনকেই আমি সমান ভালোবাসি, নিজের চেয়েও বেশি।’
