ডল্লি আপত্তি করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তাঁকে থামিয়ে দিয়ে আন্না বললেন, ‘বলাই বাহুল্য, ওকে আমি আটকে রাখব না জোর করে, এখনো আটকে রাখছি না। ঘোড়দৌড় হচ্ছে, ওর ঘোড়া দৌড়াবে, ও চলল। তাতে আমি খুবই খুশি। কিন্তু তুমি আমার কথাটা ভাবো, কল্পনা কর আমার অবস্থাটা… যাক গে, ওসব বলে কি হবে!’ হাসলেন আন্না; ‘তা সে কি বলল তোমাকে?’
‘সে যা বলল, সেটা আমিও তোমাকে বলতে চাই। ওর ওকালতি করা আমার পক্ষে সহজ : আমি বলতে চাই, উপায় কি নেই, এ কি হয় না…’, থতমত খেলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা, ‘তোমার অবস্থাটা শোধরানো, ভালো করার উপায় কি নেই?… তুমি জানো কিভাবে আমি দেখছি… তবুও যদি উপায় থাকে, তোমার বিয়ে করা উচিত…’
‘তার মানে বিবাহবিচ্ছেদ?’ আন্না বললেন; ‘জানো, পিটার্সবুর্গে একমাত্র যে নারী আমার কাছে এসেছে সে বেত্সি ভেস্কায়া। তুমি চেনো তাকে? মূলত এটি এক ব্যভিচারিণী নারী। অতি জঘন্য উপায়ে স্বামীকে প্রতারণা করে সে সম্পর্ক পেতেছিল তুশকেভিচের সাথে। আর সেই কিনা আমাকে বলল যে, আমার অবস্থাটা যতক্ষণ বিশৃঙ্খল থাকছে, ততক্ষণ আমার সাথে সে কোন সম্পর্ক রাখতে চায় না। ভেবো না যে আমি ওর সাথে তুলনা করলাম… আমি তোমাকে তো জানি, বোন। ওটা আপনা থেকে কেমন মনে পড়ে গেল… তা ও কি বলল তোমাকে?’ পুনরাবৃত্তি করলেন তিনি
‘বললেন যে তোমার জন্যে, নিজের জন্যে কষ্ট পাচ্ছেন তিনি। তুমি হয়ত বলবে এটা স্বার্থপরতা, কিন্তু অতি সঙ্গত এবং উদার স্বার্থপরতা! উনি চান প্রথমত নিজের মেয়েকে বৈধ করতে আর তোমার স্বামী হতে, তোমার ওপর অধিকার পেতে।’
‘আমার অবস্থায় কোন স্ত্রী, কোন ক্রীতদাসীর পক্ষে সম্ভব আমার মত ক্রীতদাসী হওয়া?’ বিমর্ষ কণ্ঠে বাধা দিলেন তিনি ‘প্রধান যে জিনিসটা উনি চাইছেন… উনি চাইছেন, তুমি যেন কষ্ট না পাও।’
‘সেটা অসম্ভব! তারপর?’
‘তারপর অতি ন্যায়সঙ্গত একটা জিনিস—উনি চান তোমাদের ছেলেমেয়েদের যেন বৈধ নাম থাকে।’
‘কিসের আবার ছেলেমেয়ে?’ ডল্লির দিকে না তাকিয়ে চোখ কুঁচকে বললেন আন্না।
‘আনি আর ভবিষ্যতে যারা আসবে…’
‘ও নিশ্চিন্ত থাকতে পারে, আমার আর ছেলেমেয়ে হবে না।’
‘হবে না বলছ কেমন করে?…’
হবে না কারণ আমি তা চাই না।’
এবং নিজের সমস্ত অস্থিরতা সত্ত্বেও ডল্লির মুখে একটা সরল কৌতূহল, বিস্ময় আর আতংক দেখে হাসলেন তিনি।
‘আমার অসুখের পর ডাক্তার আমাকে বলেছে …’
‘হতে পারে না!’ বিস্ফারিত চোখে ডল্লি বললেন। তাঁর কাছে এটা এমন একটা উদ্ঘাটন যার পরিণাম আর খতিয়ান এতই বৃহৎ যে প্রথম মুহূর্তগুলোতে টের পেতে হয় যে সবটা বুঝে উঠতে পারা অসম্ভব, তার জন্য অনেক, অনেক ভেবে দেখতে হবে।
পরিবারে কেন মাত্র একটি বা দুটো শিশু থাকে এই যে রহস্যটা আগে তাঁর কাছে ছিল দুর্বোধ্য এই উদ্ঘাটন তা পরিষ্কার করে দিয়ে এত ভাবনা, চিন্তা আর পরস্পরবিরোধী ভাবাবেগের উপলক্ষ হযে উঠল যে ডল্লি কিছুই বলতে পারলেন না। শুধু অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন আন্নার দিকে। আজ রাস্তায় আসতে আসতে তিনি যার স্বপ্ন দেখছিলেন, ব্যাপারটা তাই-ই, কিন্তু সেটা যে সম্ভব তা এখন জেনে আতংক হল তাঁর। মনে হল বড় বেশি জটিল প্রশ্নের এ এক সহজ উত্তর।
‘এটা কি নীতি-বিগর্হিত নয়?’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ফরাসি ভাষায় শুধু এটুকুই বলতে পারলেন তিনি।
‘কেন? ভেবে দ্যাখো, দুয়ের একটা আমাকে বেছে নিতে হবে : হয় গর্ভবতী হওয়া, তার মানে অসুস্থতা, নয় স্বামীর বন্ধু, সখি হওয়া, যতই হোক স্বামীই তো’, ইচ্ছাকৃত একটা অগভীর লঘু সুরে আন্না বললেন।
‘তা বটে, তা বটে’, যে যুক্তিগুলো দিয়ে আগে নিজেকে বুঝিয়েছিলেন তা শুনে বললেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা। তবে এখন আর তাতে আগের প্রত্যয় ছিল না।
‘তোমার, অন্যদেরও’, ডল্লির ভাবনাটা অনুমান করেই যেন বললেন আন্না, ‘এতে এখনো সন্দেহ থাকতে পারে; কিন্তু আমার পক্ষে… তুমি বুঝে দ্যাখো, আমি স্ত্রী নই; ও আমাকে ভালোবাসছে, ভালোবাসবে যতদিন ভালোবাসা আছে। তাহলে, কি দিয়ে আমি ওর ভালোবাসা ধরে রাখব? এটা দিয়ে।’
সাদা হাত দু’খানা তিনি বাড়িয়ে ধরলেন উদরের সামনে।
উত্তেজনার মুহূর্তগুলোয় যেমন হয়, অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় ভাবনা আর স্মৃতি ভিড় করে এল দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার মনে। তিনি ভাবলেন, ‘আমি স্তিভাবে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে পারিনি; সে চলে যায় অন্যদের কাছে। প্রথম যেটির জন্যে সে আমার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে, সেটি সব সময় সুন্দরী হাসি-খুশি থেকেও তাকে ধরে রাখতে পারেনি। সে তাকে ত্যাগ করে যায় অন্যের কাছে। আন্না সত্যিই কি ভাবে সে এই দিয়ে কাউন্ট ভ্রন্স্কিকে আকৃষ্ট করবে, ধরে রাখবে? উনি যদি এটাই চান, তাহলে আরো প্রাণোচ্ছল আর মনোহর প্রসাধন আর ঠাক-ঠমক তিনি খুঁজে পাবেন। আন্নার নগ্ন বাহু যত ধবধবে, যত অপরূপই হোক, যত সুন্দরই হোক তাঁর সুডৌল দেহবল্লরী, কালো চুলের মধ্যে থেকে তাঁর এই আতপ্ত আনন, আরো বেশি সুন্দরীকে ভ্রন্স্কি পাবেন, যেমন খুঁজে পায় আমার জঘন্য, করুণ, প্রিয়তম স্বামী।’
কোন কথা না বলে ডল্লি শুধু দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন। আপত্তিজ্ঞাপক এই দীর্ঘশ্বাসটা লক্ষ করে আন্না তাঁর কথা চালিয়ে গেলেন। আরো যুক্তি ছিল তাঁর হাতে আর তা এতই জোরালো যে খণ্ডন করা সম্ভব নয়।
