ডিনারের পর বারান্দায় বসলেন সবাই। তারপর শুরু হল লন টেনিস খেলা। খেলোয়াড়রা দুই দলে ভাগ হয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন সমতল ও রোল করা ক্রকেটগ্রাউন্ডে, সোনালি খুঁটিতে টাঙানো নেটের দুই পাশে। দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা খেলে দেখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অনেকক্ষণ খেলাটার মাথামুণ্ডু কিছু বুঝছিলেন না। আর যখন বুঝলেন তখন এত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে প্রিন্সেস ভারভারার কাছে গিয়ে বসে শুধু দেখতে লাগলেন খেলোয়াড়দের। তাঁর পার্টনার তুশকেভিচও খেলা ছেড়ে দিলেন; কিন্তু অন্যান্যেরা খেলা চালিয়ে গেলেন অনেকক্ষণ। সি্ভ্য়াজ্স্কি আর ভ্রন্স্কি দুজনেই খেলছিলেন চমৎকার এবং গুরুত্ব দিয়ে। তাঁদের দিকে পাঠানো বলের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন তাঁরা, দেরি বা তাড়াহুড়া না করে দ্রুত ছুটে যাচ্ছিলেন তার দিকে। বলটার লাফিয়ে ওঠার অপেক্ষা করছিলেন, তারপর র্যাকেটের নিখুঁত ও অব্যর্থ ঘায়ে সেটাকে ফেরত পাঠাচ্ছিলেন নেটের ওপর দিয়ে। সবচেয়ে খারাপ খেলছিলেন ভেস্লোভস্কি। বড় বেশি উত্তেজিত হয়ে উঠছিলেন তিনি। তবে নিজের ফুর্তিতে মাতিয়ে রাখছিলেন খেলোয়াড়দের। থামছিল না তাঁর হাসি আর চিৎকার। মহিলাদের অনুমতি নিয়ে অন্যান্য পুরুষদের মত তিনি তাঁর ফ্রক-কোট খুললেন। সাদা শার্ট পরে, ঘর্মাক্ত রক্তিম মুখে, সুন্দর বিশাল দেহে দম্কা মেরে দৌড়াদৌড়ি করে বেশ একটা ছাপ ফেলেছিলেন মনে।
সে রাতে ঘুমাবার জন্য বিছানায় শুয়ে চোখ মুদতেই দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা ক্রকেটগ্রাউন্ডে ছুটোছুটি করতে দেখছিলেন ভাসেনকা ভেস্লোভস্কিকে।
খেলার সময়টায় কিন্তু দারিয়া আলেক্সান্দ্রনার মন খারাপ ছিল। ভাসেকা ভেস্লোভস্কি আর আন্নার মধ্যে যে একটা চটুলতা চলছিল, আর শিশু সন্তান ছাড়া বয়স্করা বাচ্চাদের খেলা খেললে যে রকম অস্বাভাবিক মনে হয়, তেমন একটা সাধারণ অস্বাভাবিকতা-এর কোনটাই তাঁর ভালো লাগেনি। কিন্তু অন্যদের মনঃক্ষুণ্ণ না করা আর কোনক্রমে সময়টা কাটিয়ে দেবার জন্য তিনি বিশ্রাম নেওয়ার পর আবার খেলায় যোগ দিলেন এবং ভান করলেন যেন ফুর্তি পাচ্ছেন তিনি। সেদিন সারা সময়টা তাঁর কেবলি মনে হচ্ছিল যে তাঁর চেয়ে ভালো অভিনেতাদের সাথে তিনি থিয়েটারে নেমেছেন আর তাঁর খারাপ অভিনয়ে নাটকটাই মাটি হয়ে যাচ্ছে।
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা এই ভেবে এসেছিলেন যে ভালো লাগলে দু’দিন থাকবেন। কিন্তু সন্ধ্যায়, খেলার সময় তিনি স্থির করলেন চলে যাবেন পরের দিনই। মায়ের যে যন্ত্রণাকর ঝামেলাগুলোকে তিনি এখনে আসার সময় রাস্তায় এমন ঘৃণা করেছিলেন। একটা দিন তা ছাড়াই কাটার পর এখন তারা দেখা দিল অন্য আলোয়, সেই ঝামেলাগুলোই টানছিল তাঁকে।
সান্ধ্য চা আর নৈশ নৌকাবিহারের পর দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা যখন একা ঢুকলেন তাঁর ঘরে, পোশাক ছেড়ে রাতের জন্য পাতলা হয়ে আসা চুল আঁচড়াতে লাগলেন, মনটা অনেক হাল্কা লাগল তাঁর।
তাঁর কাছে এখন আন্না আসবেন—এটা ভেবে তাঁর এমন কি খারাপই লাগছিল। নিজের ভাবনা-চিন্তা নিয়ে তিনি একা থাকতে চাইছিলেন।
তেইশ
যখন ডল্লি শুতে যাচ্ছিলেন তখন তাঁর কাছে রাতের পোশাকে আন্না এলেন।
আন্না গোটা দিনটা বার কয়েক তাঁর প্রাণের কথা বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দু’চারটা কথা বলেই থেমে যাচ্ছিলেন, বলছিলেন : ‘সে পরে হবে, তুমি আমি একলা হলে বলব। তোমাকে আমার কত কথা বলার আছে।’
ওঁরা এখন একলা, কিন্তু আন্না ভেবে পাচ্ছিলেন না–কি বলবেন। জানালার কাছে বসে তিনি ডল্লির দিকে তাকিয়ে রইলেন, প্রাণ থেকে কথাবার্তার যে ভাণ্ডার অফুরন্ত লেগেছিল, মনে মনে তা হাতড়াতে লাগলেন কিন্তু কিছুই খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এই মুহূর্তে তাঁর মনে হচ্ছিল যে বলা হয়ে গেছে সবই।
‘তা কিটি কেমন আছে?’ গভীর শ্বাস ফেলে দোষী-দোষী ভাব নিয়ে ডল্লির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, ‘আমাকে সত্যি করে বলো তো ডল্লি, আমার ওপর সে রাগ করে আছে কি?’
‘রাগ? মোটেই না’, হেসে বললেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা।
‘কিন্তু আমাকে দেখতে পারে না, ঘৃণা করে?’
‘না, না! তবে জানো তো এটা ক্ষমা করে না কেউ।’
‘হ্যাঁ, তা ঠিক’, মুখ ফিরিয়ে, খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে আন্না বললেন, ‘কিন্তু আমার দোষ ছিল না। আর কেই-বা দোষী? দোষী কি জিনিস? হতে পারত কি অন্যরকম? কি মনে করো তুমি? তুমি স্তিভার স্ত্রী নও, এ কি হতে পারত?’
‘সত্যি জানি না। তবে তুমি আমাকে বল…’
‘হ্যাঁ, বলব, কিন্তু কিটির প্রসঙ্গটা আমরা শেষ করিনি এখনো। ও কি সুখী? লোকে বলে, লেভিন চমৎকার লোক।’
‘শুধু চমৎকার বললে কম বলা হয়। ওঁর চেয়ে ভালো লোক আমি আর দেখিনি।’
‘আহ্, কি যে আনন্দ হচ্ছে! ভারি আনন্দ হচ্ছে! শুধু চমৎকার বললে কম বলা হয়’, পুনরুক্তি করলেন আন্না।
ডল্লি হাসলেন।
‘কিন্তু নিজের কথা তুমি বল আমাকে। তোমার সাথে লম্বা কথাবার্তা আছে। বাগানে আমরা…’ কিন্তু ভ্রন্স্কিকে কি নামে উল্লেখ করবেন ভেবে পেলেন না ডল্লি। কাউন্ট বা আলেক্সেই কিরিলোভিচ—দুটো নামেই তাঁর কাছে মনে হচ্ছিল অস্বস্তিকর।
‘এমন হঠাৎ করে বলি কিভাবে? সত্যি আমি জানি না।’
‘না, তাহলেও বল… তুমি আমার জীবন দেখতে পাচ্ছ। কিন্তু ভুলো না যে এটা দেখছ গ্রীষ্মে, তুমি যখন এলে আমরা একা ছিলাম না… কিন্তু আমরা এসেছিলাম বসন্তের একেবারে গোড়ায়, ছিলাম নিতান্ত একা-একা, থাকবও আবার একা, এর চেয়ে ভালো কিছু আমি কামনা করি না। কিন্তু কল্পনা করে দ্যাখো, আমি থাকছি একা, ওকে ছাড়া, একা, আর সেটা ঘটবে… সব কিছু থেকে দেখতে পাচ্ছি যে এটা ঘটবে ঘন ঘন, ওর অর্ধেকটা সময় কাটবে বাড়ির বাইরে’, উঠে দাঁড়িয়ে বললেন তিনি, সরে এসে বসলেন ডল্লির কাছে।
