‘সিমেন্টে নিশ্চয়।’
‘চমৎকার! কিন্তু সিমেন্ট কি জিনিস?’
‘একতাল কাদার মত… না, পুটিঙের মত’, ভেস্লোভস্কির উত্তরে হো-হো করে হেসে উঠলেন সবাই।
বিষণ্ণ নীরবতায় নিমগ্ন ডাক্তার, স্থপতি আর গোমস্তা ছাড়া ভোজনরতদের আলাপ থামছিল না। কখনো তা পিছলিয়ে যাচ্ছিল, কখনো মোক্ষম খোঁচা মারছিল কাউকে। একবার দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা খুবই আহত হয়েছিলেন, এত উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন যে লাল হয়ে ওঠেন। পরে মনে করার চেষ্টা করেছেন অবান্তর ও অপ্রীতিকর কিছু বলেছিলেন কিনা। য়িাঙ্কি লেভিনের কথা তোলেন। তাঁর এই অদ্ভুত মতামতের উল্লেখ করেন যে রুশী কৃষি কাজে যন্ত্র ক্ষতিকর।
‘মিঃ লেভিনকে জানার সৌভাগ্য আমার হয়নি’, হেসে বলেন ভ্রন্স্কি, ‘কিন্তু যে যন্ত্রগুলোকে তিনি ধিক্কার দিচ্ছেন, সেগুলো সম্ভবত তিনি কখনো দেখেননি, আর দেখে পরখ করে থাকলেও সেটা ওপর-ওপর, এবং রুশী যন্ত্র, বিদেশী নয়। এখানে মতামত আসতে পারে কোত্থেকে?’
‘মোটের ওপর তুর্কী মতামত’, আন্নার দিকে তাকিয়ে হেসে হেসে বললেন ভেস্লোভস্কি।
‘আমি ওঁর মতামত সমর্থন করতে যাচ্ছি না’, লাল হয়ে বলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা। ‘কিন্তু এ কথা বলতে পারি যে, উনি অতি সুশিক্ষিত লোক। এখানে থাকলে কি জবাব দিতে হবে সেটা তিনি নিজেই জানতেন, আমি জানি না।’
‘ওকে আমি ভারি ভালোবাসি। খুবই বন্ধু আমরা’, সদয় হাসি হেসে বললেন সি্ভ্য়াজ্স্কি, কিন্তু মাপ করবেন, কিছুটা উদ্ভটত্ব আছে ওর। যেমন জেমভো প্রশাসন আর সালিসী আদালতকে সে মনে করে নিষ্প্রয়োজন, তাতে যোগ দিতে চায় না।’
‘এটা আমাদের রুশী ঔদাসীন্য’, বোঁটার ওপর বসানো পাতলা একটা পাত্রে বরফ পানি ঢালতে ঢালতে বললেন ভ্রন্স্কি, ‘আমাদের অধিকার হেতু যেসব দায়িত্ব আমাদের ওপর বর্তায় তা অনুভব না করে এসব দায়িত্ব অস্বীকার করা। ‘নিজের দায়িত্ব পালনে ওঁর চেয়ে বেশি কঠোর লোক আমি দেখিনি’, ভ্রন্স্কির এই শ্রেষ্ঠত্বের সুরে তিতিবিরক্ত হয়ে বললেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা।
‘বিপরীতপক্ষে আমি’, কথাটায় কেন জানি রীতিমত খোঁচা খেয়ে ভ্রন্স্কি বলে চললেন, ‘বিচারক নির্বাচিত করায় আমি নিকোলাই ইভানিচের নিকট (য়িাঙ্কিকে দেখালেন তিনি) অতি কৃতজ্ঞ। অধিবেশনে গিয়ে ঘোড়া নিয়ে চাষীর মামলা শোনা আমি আর যা কিছু করতে পারি তার মতই সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। আমাকে যদি পরিষদ সদস্য করা হয়, তাহলে সেটা আমার সম্মান বলে জ্ঞান করব। ভূস্বামী হিসেবে যেসব সুবিধা আমি ভোগ করি তা পরিশোধ করতে পারব এই দিয়ে। দুঃখের বিষয়, রাষ্ট্রে বৃহৎ ভূস্বামীদের যে গুরুত্ব থাকা উচিত সেটা বোঝা হচ্ছে না।’
ভ্রন্স্কি নিজের বাড়িতে খাবার টেবিলে নিজের ন্যায্যতা সম্পর্কে যেভাবে নিশ্চিন্তে কথা বলে যাচ্ছিলেন, সেটা শুনতে অদ্ভুত লাগছিল দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার। তাঁর মনে পড়ল, একেবারে বিপরীত দৃষ্টিধারী লেভিনও নিজের বাড়িতে খাওয়ার টেবিলে একই রকম দৃঢ়ভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু লেভিনকে ভালো লাগে তাঁর। তাই তাঁর পক্ষই নিয়েছিলেন।
‘তাহলে পরের অধিবেশনে আপনার ওপর আমরা ভরসা রাখতে পারি তো, কাউন্ট?’ সি্ভ্য়াজ্স্কি বললেন; ‘তবে রওনা দিতে হবে আগে যাতে আটই ওখানে পৌঁছে যান। সম্ভবত আমার কাছে আসার সম্মান দেবেন কি আমাকে?’
‘তোমার beau-frere-র সাথে আমি খানিকটা একমত’, আন্না বললেন, ‘শুধু উনি যা ভাছেন সেভাবে নয়’, হেসে যোগ করলেন তিনি। ‘আমার ভয় হচ্ছে, ইদানীং আমাদের সামাজিক দায়িত্ব বেড়ে গেছে বড় বেশি। আগে যেমন রাজপুরুষেরা ছিল এত বেশি যে প্রতিটি কাজের জন্যে একজন করে বরাদ্দ হত, এখন তেমনি এসব সামাজিক কর্মকর্তা। আলেক্সেই এখানে আছে ছয় মাস, কিন্তু ইতিমধ্যেই মনে হয় ও পাঁচটা কি ছ’টা সামাজিক সংস্থার সদস্য—ট্রাস্টি, জজ, পরিষদের সদস্য, জুরি, ঘোড়া নিয়ে আরো কি-একটা ব্যাপার। এই ধরনের জীবনযাত্রার কল্যাণে সমস্ত সময় যায় এর পেছনে। এসব ব্যাপার এত বেশি যে আমার ভয় হয় যে, ওগুলো কেবল একটা বাহ্যিক কৃত্যে দাঁড়াচ্ছে। আপনি কতকগুলো সংস্থার সদস্য নিকোলাই ইভানিচ?’ সি্ভ্য়াজ্স্কিকের জিজ্ঞেস করলেন তিনি, ‘মনে হয় বিশটার বেশি! তাই না?’
আন্না কথাগুলো বলছিলেন ঠাট্টা করে, কিন্তু তাঁর সুরে ধরা যাচ্ছিল বিরক্তি। আন্না আর ভ্রন্স্কিকে মন দিয়ে লক্ষ্য করে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা তখনই টের পেয়েছিলেন সেটা। এও তিনি লক্ষ করেছিলেন যে, এই কথাবার্তার সময় ভ্রন্স্কির মুখভাব হয়ে ওঠে গুরুতর, একরোখা।
এটা লক্ষ্য করে এবং প্রিন্সেস ভারভারা যে কথার মোড় ঘুরিয়ে দেবার জন্য তাড়াতাড়ি করে পিটার্সবুর্গের কথা পাড়লেন তা দেখে, এবং বাগানে ভ্রন্স্কি অপ্রাসঙ্গিকভাবে তাঁর ক্রিয়াকলাপের বিষয় বলছিলেন তা মনে পড়ায় ডল্লি বুঝলেন যে, সামাজিক ক্রিয়াকলাপের এই প্রশ্নটার সাথে আন্না ও ভ্রন্স্কির মধ্যে কি-একটা গোপন কলহ জড়িয়ে আছে।
খাদ্য, সুরা, পরিবেশন—সবই অতি চমৎকার। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ডিনার আর বলনাচে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা যা দেখেছেন তেমনি, যাতে তিনি অনভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন, যাতে থাকত সেই একই নৈব্যক্তিকতা আর চাপের ভাব; তাই সাধারণ একটা দিনে অল্প কয়েকজনের জন্য এসব পারিপাট্য বিছ্ছিরি লাগল তাঁর।
