তুশকেভিচ আর ভেস্লোভস্কি কিভাবে একলা নৌকো চালিয়ে গেছেন, কথাবার্তা হচ্ছেল তাই নিয়ে। পিটার্সবুর্গের ইয়াশ্ট-ক্লাবে শেষবারের প্রতিযোগিতার কথা বলতে শুরু করলেন তুশকেভিচ। তাঁর কথায় ছেদ পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে আন্না তৎক্ষণাৎ স্থপতিকে তাঁর নীরবতা থেকে বার করে আনবার জন্য ফিরলেন তাঁর দিকে
‘গতবার তিনি যখন এখানে এসেছিলেন, তারপর কত তাড়াতাড়ি দালান উঠেছে দেখে নিকোলাই ইভানিচ চমৎকৃত’, সি্ভ্য়াজ্স্কি সম্পর্কে বললেন তিনি; ‘কিন্তু আমি নিজেই রোজ যাই আর কদত তাড়াতাড়ি কাজ এগুচ্ছে, দেখে অবাক হই রোজই।’
‘হুজুরের সাথে কাজ করে আরাম আছে’, হেসে বললেন স্থপতি (নিজের কৃতিত্ব সম্পর্কে সচেতন হলেও সশ্রদ্ধ সুস্থির একটি মানুষ তিনি)। ‘সরকারী কর্তাদের সাথে কাজের মত নয়। সেখানে গাদা গাদা কাগজ সই করতে হয়, আর কাউন্টকে আমি স্রেফ মতামত জানাই, একটু আলোচনা হয়, তিন কথাতেই সিদ্ধান্ত।’
সি্ভ্য়াজ্স্কি হেসে বললেন, ‘আমেরিকান পদ্ধতি।
‘জ্বি হ্যাঁ, সেখানে দালান তোলা হয় যুক্তিযুক্ত ভিত্তিতে…’
কথাবার্তা সরে গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার অপব্যবহার প্রসঙ্গে। কিন্তু নীরবতা থেকে গোমস্তাকে বের করে আনার জন্য তখনই আন্না অন্য প্রসঙ্গ তুললেন।
‘ফসল তোলার যন্ত্রগুলো তুমি দেখোনি?’ দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনাকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি; ‘তোমার সাথে যখন সাক্ষাৎ হয়, তখন দেখতে গিয়েছিলাম আমরা। আমি নিজেই এই প্রথম দেখলাম।’
‘কিভাবে কাজ করে ওগুলো?’ জিজ্ঞেস করলেন ডল্লি।
‘একেবারে কাঁচির মত। একটা তক্তা আর ছোট ছোট বহু কাঁচি তাতে। এই রকম।
আন্না তাঁর সুন্দর অঙ্গুরীশোভিত সাদা হাতে ছুরি কাঁটা নিয়ে দেখাতে লাগলেন। উনি নিশ্চয় বুঝছিলেন যে, তাঁর ব্যাখ্যায় কোন ফল হচ্ছে না; কিন্তু তিনি সুন্দর করে কথা বলছেন, হাত দু’খানাও তাঁর সুন্দর, এটা জানা থাকায় ব্যাখ্যা চালিয়ে গেলেন তিনি।
‘কলম-কাটা ছুরির মত অনেকটা’, আন্নার ওপর থেকে চোখ না সরিয়ে কৌতুক করে বললেন ভেস্লোভস্কি।
আন্না সামান্য হাসলেন, কিন্তু কোন উত্তর দিলেন না।
‘সত্যি কাঁচির মত, তাই না কার্ল ফিওদরিচ?’ গোমস্তাকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
জবাব দিলেন জার্মান, ‘ও হ্যাঁ, এটা নিতান্ত সাধারণ জিনিস’, এবং যন্ত্রের গঠনকৌশল বোঝাতে লাগলেন তিনি।
‘এ যন্ত্র যে আঁটি বাঁধে না, এটা দুঃখের কথা’, বললেন সি্ভ্য়াজ্স্কি, ‘ভিয়েনার প্রদর্শনীতে আমি তার দিয়ে আঁটি বাঁধতে দেখেছি, ওতে বেশ লাভ হত।’
‘সব দাঁড়াচ্ছে এটায়…তারের দাম হিসেব করতে হয়’, নীরবতা থেকে ছাড়া পেয়ে জার্মান ভাষায় ভ্রন্স্কিকে বললেন, ‘এটা হিসেব করা যায়, হুজুর’, পকেটে যেখানে তিনি হিসাবপত্র টুকে রাখতেন সেই পকেটবই আর পেনসিলটা নেবার জন্য তিনি হাত বাড়াতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তিনি যে এখন ডিনার টেবিলে সেটা মনে পড়ায় এবং ভ্রন্স্কির নিরুত্তাপ দৃষ্টি লক্ষ করে ক্ষান্ত হলেন। ‘বড় বেশি জটিল, ঝামেলা হবে অনেক’, তিনি জার্মান ভাষায় মন্তব্য করলেন।
‘আয় করতে চাইলে ঝামেলাও সইতে হবে’, জার্মান ভাষায় ভাসেকা ভেস্লোভস্কি বললেন জার্মানকে ব্যঙ্গ করে; ‘জার্মান ভাষা খুব ভালোবাসি’, ফরাসি ভাষায় আবার সেই হাসি নিয়ে তিনি তাকালেন আন্নার দিকে
‘থামুন’, আন্না কপট কঠোরতায় ফরাসি ভাষায় বললেন।
‘আর আমরা ভেবেছিলাম আপনাকে মাঠে দেখতে পাব। ভাসিলি সেমিওনিচ’, রুগ্ণ ডাক্তারটিকে বললেন আন্না, ‘আপনি গিয়েছিলেন সেখানে?’
‘গিয়েছিলাম, কিন্তু হাওয়া হয়ে যাই’, বিমর্ষ রসিকতা করে জবাব দিলেন ডাক্তার।
‘তার মানে, আপনি বেশ একটু বেরিয়ে বেড়িয়েছেন।’
‘চমৎকার!’
‘আর বৃদ্ধা কেমন আছে? আশা করি, টাইফয়েড নয়?’
‘টাইফয়েড হোক না হোক, ভালোর দিকে যাচ্ছে না।’
‘কি দুঃখের কথা!’ এই বলে গার্হস্থ্য লোকদের সম্মান জানিয়ে আন্না মন দিলেন অতিথিদের দিকে
‘যাই বলুন, আপনার কথামত যন্ত্র বানানো মুশকিল, আন্না আর্কাদিয়েভনা’, রসিকতা করে বললেন সি্ভ্য়াজ্স্কি। ‘কেন, মুশকিল কিসে?’ হেসে জিজ্ঞেস করলেন আন্না, সে হাসিতে বোঝা গেল যে যন্ত্রের গঠনকৌশল নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যায় মধুর কিছু-একটা ছিল যা সি্ভ্য়াজ্স্কিরও নজরে পড়েছে অল্পবয়সী ছেনালির এই নতুন দিকটা ডল্লির ভালো লাগল না।
‘কিন্তু বাস্তুকর্ম সম্পর্কে আন্না আর্কাদিয়েভনার যা জ্ঞান সেটা আশ্চর্য’, বললেন তুশকেভিচ।
‘নয়ত কি, কাল আমি থামের ভিৎ নিয়ে কথা বলতে শুনেছিলাম আন্না আর্কাদিয়েভনাকে’, বললেন ভেস্নোভস্কি, ‘ঠিক না?’
চারপাশে যখন এতকিছু দেখা যাচ্ছে, শোনা যাচ্ছে, তখন এতে অবাক হবার কিছু নেই’, বললেন আন্না; ‘আর আপনি নিশ্চয় জানেন না কি দিয়ে বাড়ি তৈরি হয়?’
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা দেখতে পেলেন যে আন্না আর ভেস্লোভস্কির মধ্যে যে একটা লীলারঙ্গের সুর ছিল সেটা আন্নার ভালো লাগছিল না তাহলেও অনিচ্ছায় ধরা দিলেন তাতে।
এক্ষেত্রে ভ্রন্স্কি মোটেই লেভিনের মত আচরণ করলেন না। ভেস্লোভস্কির বাচালতায় তিনি স্পষ্টতই কোন গুরুত্ব দেননি, বরং উৎসাহ দিলেন রসিকতাটায়।
‘তাহলে বলুন ভেস্লোভস্কি, পাথর জোড়া লাগে কিসে?’
