‘হ্যাঁ, সে তো বলা বাহুল্য’, চিন্তিতভাবে বললেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা, কারেনিনের সাথে শেষ সাক্ষাৎটা স্পষ্টভাবে ভেসে উঠছিল তাঁর মনে। ‘হ্যাঁ, সে তো বলা বাহুল্য’, আন্নার কথা মনে করে দৃঢ়ভবে পুনরুক্তি করলেন তিনি।
‘ওর ওপর আপনার প্রভাব খাটান, চিঠি লেখান ওকে দিয়ে। এ নিয়ে আমি ওকে কিছু বলতে চাই না, বলতে প্রায় পারিই না।’
‘বেশ, আমি কথা বলব। কিন্তু ও নিজে কেন ভেবে দেখছে না?’ বললেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা। হঠাৎ তাঁর মনে পড়েছিল আন্নার চোখ কোঁচকানোর অদ্ভুত নতুন অভ্যাসটার কথা। তাঁর এও মনে পড়ল যে, আন্না চোখ কোঁচকানো ঠিক যখন কথাটা ওঠে জীবনের অন্তরতম দিক নিয়ে। ঠিক যেন নিজের জীবনের দিকে চোখ কোঁচকাচ্ছেন যাতে তার সবটা দেখতে না হয়’, ভাবলেন ডল্লি। ‘অবশ্য অবশ্যই আমি নিজের জন্যে আর আন্নার জন্যে কথা বলব ওর সাথে’, ভ্রন্স্কির কৃতজ্ঞতা প্রকাশে জবাব দিলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা।
তাঁরা উঠে দাঁড়িয়ে বাড়ি চলে গেলেন।
বাইশ
ডল্লি এর আগেই ফিরেছেন দেখে আন্না তাঁর চোখের দিকে তাকালেন যেন এই প্রশ্ন নিয়ে ভ্রন্স্কির সাথে কি কথা হয়েছে তাঁর, কিন্তু কথায় সেটা বললেন না। বললেন, ‘মনে হচ্ছে ডিনারের সময় হয়ে গেছে। তোমাকে আমাকে একেবারেই দেখা হচ্ছে না। আশা করছি সন্ধেয় হবে। এখন আমার পোশাক বদলানোর জন্যে যাওয়া দরকার। মনে হয় তোমারও। ঘর তোলা দেখতে গিয়ে সবাই আমরা নোংরা মেখেছি।’
ডল্লি গেলেন তাঁর ঘরে, হাসি পেল তাঁর। বেশভূষা করার কিছুই তাঁর ছিল না। কারণ তাঁর সেরা গাউনটা তিনি আগেই পরে আছেন; কিন্তু ডিনারের জন্য কিছুটা সাজ করেছেন এটা দেখাবার জন্য তিনি তাঁর গাউনটা ফিটফাট করতে বললেন দাসীকে, কি আর ফিতে বদলে নিলেন, লেস স্কার্ফ দিলেন মাথায়।
‘এটুকুই আমি যা করতে পেরেছি’, হেসে তিনি বললেন আন্নাকে, আবার তৃতীয় একটি অসামান্য সাধারণ পোশাকে তিনি এসেছিলেন ডল্লির কাছে।
‘হ্যাঁ, আমার এখানে বড় খুঁতখুঁতে’, আন্না বললেন যেন নিজের সাজের ঘটায় মাপ চেয়ে, ‘তুমি এসেছ বলে আলেক্সেই এত খুশি যা সে হয় প্রায় কদাচিৎ। নিশ্চয়ই ও তোমার প্রেমে পড়েছে’, তারপর যোগ করলেন তিনি; ‘আর তুমি ক্লান্ত হও নি তো?
ডিনারের আগে কিছু নিয়ে কথা বলার সময় ছিল না। ড্রয়িং-রুমে এসে তাঁরা দেখলেন ইতিমধ্যেই সেখানে হাজির প্রিন্সেস ভারতারা আর কালো কোট পরা পুরুষেরা। স্থপতির পরনে ফ্রক-কোট। ডাক্তার আর গোমস্তার সাথে ডল্লির পরিচয় করিয়ে দিলেন ভ্রন্স্কি। স্থপতির সাথে আগেই পরিচয় হয়েছিল হাসপাতালে।
মাড় দেওয়া সাদা টাই পরা মোটাসোটা খানসামা জ্বলজ্বলে চাঁছা-ছোলা মুখে জানাল যে খাবার তৈরি। মহিলারা উঠলেন। ভ্রন্স্কি য়িাঙ্কিকে অনুরোধ করলেন আন্না আর্কাদিয়েভনাকে বাহুলগ্ন করতে, নিজে গেলেন ডল্লির কাছে। তুশকেভিচের আগেই প্রিন্সেস ভারভারার দিকে ভেস্লোভস্কি হাত বাড়িয়ে দিতে গোমস্তা আর ডাক্তারের সাথে তুশকেভিচ গেলেন একা একা।
ডিনার, ডাইনিং-রুম, বাসনপত্র, পরিচারকেরা, সুরা, খাদ্যদ্রব্য শুধু গৃহের নতুন বিলাসের অনুরূপই নয়, মনে হল সব কিছুর চেয়েও তা বেশি নতুন আর বিলাসী। তাঁর কাছে নতুন এই বিলাসটা লক্ষ করলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা আর সংসারের ভার নেওয়া গৃহকর্ত্রী হিসেবে তাঁর জীবনযাত্রার অনেক ঊর্ধ্বে এসব বিলাসের একটাও তাঁর সংসারে দেখার আশা না রাখলেও আপনা থেকেই সমস্ত খুঁটিনাটিতে মন দিলেন, ভাবলেন কে এসব করেছে, এবং কিভাবে? ভাসেকা ভেস্লোভস্কি, তাঁর নিজের স্বামী, এমন কি সি্ভ্য়াজ্স্কি এবং আরো বহু যেসব লোককে তিনি জানেন, তাঁর এ নিয়ে ভাবতেন না, সমস্ত সজ্জন গৃহস্বামীই তাঁর অতিথিদের যা ভাবতে চান, বিশ্বস করতেন তাঁর কথায়, যথা : এত চমৎকার যে আয়োজন হয়েছে, তাতে তাঁর, গৃহস্বামীর কোন প্রয়াসই ছিল না, ওটা হয়েছে আপনা থেকেই। দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা তো জানেন যে এমন কি ছেলেমেয়েদের প্রাতরাশের মণ্ডও আপনা থেকে হয় না। তাই এমন জটিল ও অপূর্ব আয়োজনের পেছনে কারো সতর্ক মনোযোগ থাকার কথা। এবং আলেক্সেই কিরিলোভিচ যেভাবে টেবিলের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন, যেভাবে মাথা নেড়ে ইঙ্গিত করলেন খানসামাকে। যেভাবে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনাকে জিজ্ঞেস করলেন মাছ-সবজির নাকি মাংসের কোন সূপটা তাঁর পছন্দ, তা থেকে তিনি বুঝলেন যে সবই করা হচ্ছে এবং চলছে স্বয়ং গৃহস্বামীর প্রয়াসে। এর জন্য ভেস্লোভস্কির কৃতিত্ব যতটা, আন্নার কৃতিত্ব তার বেশি নয়। আন্না স্প্রিয়াজুস্কি, প্রিন্সেস আর ভেস্লোভস্কি—সবাই একই রকমের অতিথি। তাঁদের জন্য যা আয়োজন করা হয়েছে, সানন্দে উপভোগ করছেন তা।
আন্না গৃহকর্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন কেবল কথাবার্তার ধারা পরিচালনায়। এবং অনতিবৃহৎ টেবিল, গোমস্তা আর স্থপতির মত একেবারে ভিন্ন জগতের লোক, যারা অনভ্যস্ত এই বিলাসে সংকুচিত না হবার জন্য চেষ্টিত। সাধারণ কথাবার্তায় বেশিক্ষণ অংশ নিতে অক্ষম, তাঁদের নিয়ে কথোপকথনের যে ধারা স্থির করা গৃহকর্ত্রীর পক্ষে খুবই কঠিন আন্না তা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁর অভ্যস্ত মাত্রাবোধে, স্বাভাবিকতায়, এমন কি আনন্দের সাথে, যা লক্ষ করেছিলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা
