‘হ্যাঁ, কিন্তু এখানে, যতদিন আন্নার… বা আপনার প্রয়োজন থাকছে না সমাজের…’
‘সাজ!’ ঘৃণাভরে বললেন ভ্রন্স্কি, ‘সমাজে কি দরকার থাকতে পারে আমার…’
‘ততদিন পর্যন্ত, আর এটা হতে পারে বরাবরের জন্যে—আপনারা সুখী, নিশ্চিন্ত। আন্নাকে দেখে আমি বুঝতে পারছি সে সুখী, পুরোপুরি সুখী, নিশ্চিন্ত। আমাকে এটা সে বলেছেও’, দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা বললেন হেসে; কিন্তু বলতে গিয়ে আপনা থেকেই তাঁর সন্দেহ হল, সত্যিই কি আন্না সুখী?
কিন্তু মনে হল ভ্রন্স্কির কোন সন্দেহ নেই তাতে। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, আমি জানি তার মর্মযন্ত্রণাগুলোর পর সেরে উঠেছে সে; সে সুখী। বর্তমানে সে সুখী। কিন্তু আমি?… আমাদের কপালে যে কি আছে ভেবে ভয় হয়… মাপ করবেন, হাঁটতে চান?’
‘না, মানে আমার কিছু এসে যায় না।’
‘তাহলে বসা যাক এখানে।’
তরুবীথির কোণে বাগানের বেঞ্চিতে বসলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা, ভ্রন্স্কি দাঁড়ালেন তাঁর সামনে।
‘আমি দেখতে পাচ্ছি সে সুখী’, পুনরাবৃত্তি করলেন তিনি আর আন্না যে সুখী নন এ সন্দেহ আরো বেশি পেয়ে বসল দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনাকে। ‘কিন্তু এভাবে কি চলতে পারে? আমরা ভালো করেছি নাকি খারাপ, সেটা অন্য প্রশ্ন। কিন্তু দান পড়ে গেছে’, বললেন ভ্রন্স্কি রুশ থেকে সরে গিয়ে ফরাসি ভাষায়, ‘সারা জীবনের জন্যে আমরা বাঁধা। আমাদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র যে বন্ধন সেই প্রেমে আমরা বাঁধা। আমাদের একটি মেয়ে আছে, আরো ছেলেপেলে হতে পারে আমাদের। কিন্তু আইন এবং আমাদের সমস্ত পরিস্থিতি থেকে যে হাজার হাজার জটিলতা দেখা দিচ্ছে। সমস্ত দুঃখ-কষ্টের পর এখন বিশ্রাম পেয়ে আন্না সেগুলো গ্রাহ্য না করে পারি না। আমার মেয়ে আইন অনুসারে আমার নয়, কারেনিনের। এই প্রবঞ্চনা আমি চাই না!’ আপত্তির একটা সতেজ ভঙ্গি করে বললেন তিনি। দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার দিকে তাকালেন একটা বিমর্ষ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে।
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা কিছু বললেন না, শুধু তাকিয়ে রইলেন ভ্রন্স্কির দিকে। উনি বলে চললেন : ‘আর কাল আমার যদি ছেলে হয়, আমার ছেলে, আইন অনুসারে তার উপাধি হবে কারেনিন। আমার উপাধি বা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী সে হবে না, এবং আমাদের পরিবার যত সুখীই হোক, যত ছেলেপেলেই হোক না আমাদের, ওদের সাথে কোন সম্পর্ক থাকবে না আমার। সবাই ওরা কারেনিনের। আপনি বুঝে দেখুন এরকম অবস্থার কষ্ট আর ভয়াবহতা! এ নিয়ে আন্নার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছি। তাতে বিরক্ত হয় সে। সে বোঝে না, অথচ সব ব্যাপারটা আমি বলতে পারি না ওকে। এবার অন্য দিকে থেকে দেখুন। আমি ওর প্রেমে সুখী, কিন্তু আমাকে তো একটা কাজ নিয়ে থাকতে হবে। সে কাজ আমি পেয়েছি, তার জন্যে আমি গর্বিত এবং মনে করি যে দরবারে বা ফৌজে আমার ভূতপূর্ব বন্ধুদের কাজের চেয়ে এটা মহনীয়। এখন কোন সন্দেহই নেই যে, আমার এ কাজটা বদলে ওদের কাজে আর যাব না। আমি এখানে, আমার ভিটায় থেকে খাটছি, এতে আমি সুখী সন্তুষ্ট, সুখের জন্যে আমাদের দরকার নেই আর কিছুর। এ কাজটা আমি ভালোবাসি। আর সেটা এজন্য নয় যে, এর চেয়ে ভালো কিছু নেই। ঠিক উল্টো … ‘
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা লক্ষ করেছিলেন যে, বক্তব্যের এই জায়গায় এসে উনি গুলিয়ে ফেলছেন। কিন্তু এই প্রসঙ্গচ্যুতিটা তিনি ভালো বুঝতে পারছিলেন না। তবে টের পাচ্ছিলেন যে, আন্নার কাছে প্রাণের যে কথাগুলো বলতে পারেন না। তা যখন বলতে শুরু করেছেন, তখন সবটাই বলবেন এবং গ্রামাঞ্চলে তাঁর কাজের প্রশ্নটাও আন্নার সাথে সম্পর্ক নিয়ে তাঁর প্রাণের কথাগুলোর সাথে একই কোঠায় পড়ে।
ভ্রন্স্কি একটু সচেতন হয়ে বললেন, ‘তাহলে আমি বলে যাই। প্রধান কথাটা এই যে কাজ করতে গিয়ে আমার এমন নিশ্চিতি-থাকা দরকার যে কাজটা আমার সাথে সাথে ফুরিয়ে যাবে না, আমার উত্তরাধিকারী থাকবে, কিন্তু সেটা আমার নেই। কল্পনা করুন এমন এক পুরুষের অবস্থা, যার আগে থেকে জানা আছে যে তার এবং তার প্রিয়তমা নারীর ছেলেমেয়েরা তার হবে না, হবে কে জানে কার, যে এই ছেলেমেয়েদের দেখতে পারে না, কোন সম্পর্ক রাখতে চায় না তাদের সাথে। এ যে সাংঘাতিক ব্যাপার!’
তিনি চুপ করে গেলেন স্পষ্টতই ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে।
‘তা ঠিক, আমি এটা বুঝতে পারছি। কিন্তু আন্না কি করতে পারে?’ জিজ্ঞেস করলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা।
‘হ্যাঁ, এতে আমি আমাদের কথাবার্তার উদ্দেশ্যে আসছি’, অতি কষ্টে সুস্থির হয়ে তিনি বললেন; ‘আন্না পারে, এটা নির্ভর করছে তার ওপর… আমি যদি সন্তানকে পোষ্য নেবার জন্যে জারের কাছে আবেদন করি, তাহলেও দরকার বিবাহবিচ্ছেদ। আর এটা নির্ভর করছে আন্নার ওপর। ওর স্বামী বিবাহবিচ্ছেদে রাজি—আপনার স্বামী এক সময় ওকে রাজি করিয়েছিলেন, আমি জানি, এখনো সে আপত্তি করবে না। শুধু ওকে লিখে জানাতে হবে। সে তখন সোজাসুজি বলেছিলে, আন্না যদি ইচ্ছা প্রকাশ করে সে আপত্তি করবে না। বলাই বাহুল্য’, বিমর্ষ মুখে বললেন তিনি, ‘এটা একটা ভণ্ডের নিষ্ঠুরতা, যা হৃদয়হীন এসব লোকদের পক্ষেই সম্ভব। ও জানে যে ওর সম্পর্কে কোন কথা মনে পড়লে কি কষ্ট হয় আন্নার আর আন্নাকে জানে বলেই তার চিঠি দাবি করছে। আমি বুঝি আন্নার পক্ষে সেটা যন্ত্রণাকর, কিন্তু কারণগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ যে দরকার ভাবপ্রবণতার এসব সূক্ষ্মতা পেরিয়ে যাওয়া। ব্যাপারটা আন্না আর তার সন্তানদের সুখ এবং ভাগ্য নিয়ে। আমি নিজের কথা কিছু বলছি না, যদিও আমার পক্ষে এটা দুঃসহ, খুবই দুঃসহ’, তাঁর কাছে দুঃসহ হচ্ছে বলে কার প্রতি যেন একটা শাসানির ভাব নিয়ে তিনি বললেন। ‘তাই প্রিন্সেস, নির্লজ্জের মত আমি আপনাকে আমার ভরসাস্থল বলে ধরছি। ওকে চিঠি লিখে বিবহবিচ্ছেদ দাবি করার জন্যে ওকে বুঝিয়ে সাহায্য করুন আমাকে!’
