‘না’, ভ্রনস্কিকে বললেন অবলোনস্কি, কিটি প্রসঙ্গে লেভিনের সংকল্পের কথা জানাবার ভারি ইচ্ছে হচ্ছিল তাঁর না, তুমি আমার লেভিনকে সম্ভবত ঠিক বোঝনি। অতি উত্তেজনাপ্রবণ লোক সে, অপ্রীতিকর হয়েও ওঠে তা সত্যি, কিন্তু মাঝে মাঝে সে হয়ে ওঠে ভারি ভালো। অতি সৎ ন্যায়নিষ্ঠ লোক, মনটাও সোনার। কিন্তু কাল ছিল একটা বিশেষ কারণ’, অর্থপূর্ণ হাসি হেসে বলে চললেন অবলোকি, একেবারেই ভুলে গেলেন বন্ধুর প্রতি তার অকৃত্রিম দরদ যা তিনি কাল অনুভব করেছিলেন, এবং এখন ঠিক সেইরকম দরদই অনুভব করছেন শুধু ভ্রনস্কির প্রতি, হ্যাঁ, কারণ ছিল যাতে তার পক্ষে বিশেষ সুখী অথবা বিশেষ অসুখী হওয়া সম্ভব।’
ভ্রনস্কি থেকে গিয়ে সোজাসুজি প্রশ্ন করলেন ও তার মানে? নাকি সে কাল তোমার শ্যালিকার কাছে প্রস্তাব দিয়েছে?
অবলোনস্কি বললেন, হয়ত। কাল আমার এমনি কিছু-একটা মনে হয়েছিল। হ্যাঁ, ও যখন আগেই চলে গেছে, আর মন-মেজাজও ভালো ছিল না, তখন এটা তাই… অনেকদিন থেকে ও প্রেমে পড়েছে, ওর জন্য ভারি কষ্ট হয় আমার।’
‘বটে!… তবে আমি মনে করি কিটি ওর চেয়ে ভালো পাত্রের ভরসা করতে পারে।’ এই বলে ভ্রনস্কি বুক টান করে আবার হাঁটা শুরু করলেন, ‘তবে আমি তো ওকে চিনি না’, যোগ করলেন তিনি, হ্যাঁ, এ এক বিছছিরি অবস্থা! এজন্যই বেশির ভাগ লোক পছন্দ করে ক্লারাদের সাহচর্য। সেখানে অসাফল্যে প্রমাণ হয় যে টাকা ততটা নেই। আর এখানে-মর্যাদাটাই বিপন্ন। যাক গে, ট্রেন এসে গেছে।’
সত্যিই দূরে হুইসিল দিল ইঞ্জিন। কয়েক মিনিট বাদে কেঁপে-কেঁপে উঠল প্ল্যাটফর্ম, ফেস-ফোঁস করে ভাপ ছেড়ে ঢুকল ইঞ্জিন, হিমে সে ভাপ নুয়ে পড়ছিল নিচের দিকে, ধীরে ধীরে, মাপ তালে মাঝের চাকার সাথে লাগানো পিস্টন রড বেঁকে যাচ্ছে আর টান হচ্ছে, আঁটসাঁট পোশাকে হিমানীতে আচ্ছন্ন ড্রাইভার মুখ বাড়িয়ে আছে, টেন্ডারের পেছনে ক্রমেই ধীরে আর প্ল্যাটফর্মকে বেশি করে কাঁপিয়ে এল মালপত্রের ওয়াগন, তাতে ঘেউ-ঘেউ করছে একটা কুকুর, শেষে প্যাসেঞ্জার ওয়াগনগুলো কেঁপে-কেঁপে এসে থামল।
চটপটে কন্ডাক্টর হুইসিল দিতে দিতে লাফিয়ে নামল ট্রেন থেকে। তার পেছনে একের পর এক অধীর যাত্রী ও নিজেকে টানটান করে চারদিকে কড়া চোখে তাকাতে থাকল এক গার্ড অফিসার; খুশির হাসি হেসে থলি হাতে নামল এক শশব্যস্ত বেনিয়া; কাঁধে বস্তা ঝুলিয়ে কৃষক।
অবলোনস্কির পাশে দাঁড়িয়ে ভ্রনস্কি দেখছিলেন ওয়াগনগুলো আর তা থেকে নামা যাত্রীদের। তিনি তখন মায়ের কথা একেবারে ভুলেই গিয়েছিলেন। কিটি সম্পর্কে এখন তিনি যা জানলেন সেটা উদ্বুদ্ধ আর উল্লসিত করেছিল তাকে। আপনা থেকেই বুক তার টান হয়ে উঠেছিল, জ্বলজ্বল করে উঠেছিল চোখ। নিজেকে তিনি বিজয়ী বলে ভাবছিলেন।
‘কাউন্টেস ভ্ৰনস্কায়া এই কম্পার্টমেন্টে’, ভ্রনস্কির কাছে এসে জানাল চটপটে সেই কন্ডাক্টর।
কন্ডাক্টরের কথায় চৈতন্য ফিরল তার, মা আর তার সাথে আসন্ন সাক্ষাতের কথা ভাবতে হল। আসলে মায়ের প্রতি তার কোন শ্রদ্ধা ছিল না এবং সে সম্পর্কে সচেতন না থেকেই ভালোবাসতেন না তাকে, যদিও যে মহলে তাঁর জীবনযাত্রা সেখানেকার বোধ, নিজের শিক্ষাদীক্ষা অনুসারে অতিমাত্রায় বাধ্যতা আর শ্রদ্ধা ছাড়া মায়ের সাথে অন্য কোন সম্পর্ক তিনি কল্পনা করতে পারতেন না আর বাইরে যতই তিনি হতেন বাধ্য ও সশ্রদ্ধ, মনে মনে ততই তিনি তাঁকে কম শ্রদ্ধা করতেন, কম ভালোবাসতেন।
আঠারো
ভ্রনস্কি কন্ডাক্টরের পেছন পেছন ওয়াগনটায় উঠলেন। একজন মহিলা বেরিয়ে আসছিলেন, তাঁকে পথ দেবার জন্য থামলেন কম্পার্টমেন্টে ঢোকার মুখে। উঁচু সমাজের লোকদের অভ্যস্ত মাত্রাবোধে ভ্রনস্কি মহিলার চেহারার দিকে একবার তাকিয়েই বুঝলেন, ইনি উঁচু সমাজের লোক। ক্ষমা চেয়ে তিনি ভেতরে যাবার উপক্রম করছিলেন, কিন্তু মহিলাটির প্রতি আরেকবার তাকিয়ে দেখার তাগিদ বোধ করলেন তিনি–সেটা এই জন্য নয় যে মহিলা অতীব সুন্দরী, তাঁর সমস্ত দেহলতা থেকে সুচারুতা আর সংযত ভঙ্গিমালাবণ্য দেখা গিয়েছিল বলে নয়, এই জন্য যে ভ্রনস্কির পাশ দিয়ে উনি যখন যাচ্ছিলেন তখন তার মিষ্টি মুখখানায় ভারি কমনীয়, স্নেহময় একটা ভাব দেখা গিয়েছিল। ভ্রনস্কি যখন মুখ ফেরালেন, তিনিও মুখ ফিরিয়েছিলেন। ঘন আঁখিপল্লবে তার উজ্জ্বল ধূসর যে চোখ দুটো কালো বলে মনে হয় তা বন্ধুর মত নিবদ্ধ হল ভ্রনস্কির মুখে, যেন তাকে চিনতে পেরেছেন, পরমুহূর্তেই কাকে যেন খুঁজতে চলে গেলেন এগিয়ে আসা ভিড়ের মধ্যে। এই সংক্ষিপ্ত দৃষ্টিপাতেই ভ্রনস্কির চোখে পড়ল তার মুখের সংযত সজীবতা, উজ্জ্বল চোখ আর বঙ্কিম রক্তিম ঠোঁটে ঈষৎ হাসির মাঝখানে তার ঝিলিমিলি। যেন তাঁর সত্তা পূর্ণ হয়ে হয়ে তার উদ্বুত্তটা তার ইচ্ছার অপেক্ষা না করেই আত্মপ্রকাশ করছে কখনো চোখের ছটায়, কখনো হাসিতে। ইচ্ছে করেই তিনি তাঁর চোখের ছটা চাপা দিতে চেয়েছেন, কিন্তু তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তা দেখা দিয়েছে তার প্রায় অলক্ষ্য হাসিতে।
ভ্রনস্কি ভেতরে গেলেন। মা তার রোগাটে বৃদ্ধা, কালো চোখ, কুণ্ডলী করা চুল। ছেলেকে দেখে চোখ কুঁচকে তিনি পাতলা ঠোঁটে সামান্য হাসলেন। সোফা থেকে উঠে দাসীকে থলে দিয়ে তিনি ছোট্ট শুকনো হাত বাড়িয়ে দিলেন ছেলের দিকে, তারপর তার মাথা তুলে চুম্বন করলেন মুখে।
