‘এটা প্রসূতি সদন নয়, হাসপাতাল। সংক্রামক ছাড়া অন্য সমস্ত রোগ নিয়ে তার কাজ’, বললেন তিনি, আর এটা দেখুন…’ যারা সেরে উঠবে তাদের জন্য সদ্য আমদানি করা একটা চলন্ত চেয়ার তিনি টেনে নিয়ে গেলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার কাছে; ‘এই দেখুন’, চেয়ারটায় বসে তিনি তা চালাতে লাগলেন; ‘রোগী হাঁটতে পারছে না, এখনো দুর্বল, অথবা পা রুগ্ণ, কিন্তু তার তাজা হওয়া দরকার, এতে বসে দিব্যি তা চালিয়ে যাবে…’
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার সব কিছুতেই আগ্রহ ছিল, সব কিছুই ভালো লাগল তাঁর কিন্তু সবচেয়ে ভালো লাগল ভ্রন্স্কিকে। এসব ব্যাপারে নেশা যাঁর অকৃত্রিম, সহজ-সরল। ‘হ্যাঁ, ভারি সুন্দর মিষ্টি মানুষ’, মাঝে মাঝে ভ্রন্স্কির কথায় কান না দিয়ে তাঁর দিকে চেয়ে। তাঁর মুখভাব বোঝার চেষ্টা করে, নিজেকে আন্নার জায়গায় বসিয়ে মনে মনে ভাবছিলেন তিনি। তাঁর উৎসাহে এখন ভ্রন্স্কিকে তাঁর এত ভালো লাগল যে বুঝতে পারলেন কেন তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন আন্না।
একুশ
আস্তাবলে যাবার প্রস্তাব দিলেন আন্না, সেখানে নতুন একটা মর্দা ঘোড়াকে দেখতে চাইছিলেন য়িাঙ্কি। কিন্তু আন্নাকে ভ্রন্স্কি বললেন, ‘না, আমার মনে হয় প্রিন্সেস ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তাছাড়া ঘোড়ায় তাঁর উৎসাহ থাকার কথা নয়। তোমরা যাও, আমি প্রিন্সেসকে বাড়ি পৌঁছে দেব আর কিছু কথাবার্তা বলব’, ডল্লির দিকে ফিরে তিনি বললেন, ‘যদি আপনার সেটা খারাপ না লাগে।’
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা খানিকটা অবাক হয়ে বললেন, ‘ঘোড়ার ব্যাপারে আমি কিছু বুঝি না। আপনার কথায় আমি খুব রাজি।’
ভ্রন্স্কির মুখ দেখে তিনি বুঝতে পারছিলেন যে তাঁর কাছ থেকে ওঁর কিছু চাইবার আছে। ভুল হয়নি তাঁর। ফটক পেরিয়ে আবার বাগানে ঢুকতেই আন্না যেদিকে যাচ্ছিলেন সেদিকে তাকিয়ে দেখে এবং আন্না যে তাঁদের দেখতে বা কথা শুনতে পাবে না। সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে ভ্রন্স্কি শুরু করলেন, ‘আপনি ধরতে পেরেছিলেন যে আপনার সাথে আমার কথা আছে?’ হাসি-হাসি চোখে ডল্লির দিকে তাকিয়ে ভ্রন্স্কি বললেন, ‘আমি ভুল করব না যদি ধরি আপনি আন্নার বন্ধু’, টুপি খুলে রুমাল বার করে তা দিয়ে মাথায় টাক পড়তে শুরু করা জায়গাটা মুছলেন।
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা কোন উত্তর দিলেন না, শুধু ভীত দৃষ্টিতে তাকালেন তাঁর দিকে। ভ্রন্স্কির সাথে একা হয়ে হঠাৎ ভারি আতংক হল তাঁর। হাসি-হাসি চোখ আর কঠোর মুখভাব তাঁকে ভয় পাওয়াচ্ছিল।
ভ্রন্স্কি তাঁর সাথে কথা বলতে চাইছেন কি বিষয়ে, তা নিয়ে নানান অনুমান মাথায় খেলে গেল তাঁর : উনি আমার ছেলেমেয়েদের নিয়ে এখানে এসে থাকতে বলবেন আর আমাকে তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে; অথবা মস্কোয় আন্নার জন্যে যাতে একটা বন্ধমহল গড়ে দিই, তাই নিয়ে…কিংবা ভাসেকা ভেস্লোভস্কি আর আন্নার সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে নয়ত? হয়ত বা কিটি সম্পর্কে, বলবেন যে নিজেকে তিনি দোষী মনে করছেন?’ শুধু যা খারাপ, তেমন সব কিছু ভেবে দেখলেন তিনি, কেবল অনুমান করতে পারেননি কি নিয়ে ভ্রন্স্কি কথা বলতে চাইছেন তাঁর সাথে।
ভ্রন্স্কি বললেন, ‘আন্নার ওপর আপনার প্রভাব অনেক। আপনাকে সে খুবই ভালোবাসে। আমাকে সাহায্য করুন।
ভীত সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা চাইলেন তাঁর তেজস্বী মুখের দিকে, যার ওপর কখনো সবটাতেই, কখনো জায়গায় জায়গায় রোদ এসে পড়ছিল লিণ্ডেন গাছের ছায়া ভেদ করে, কখনো আবার তা বিমর্ষ হয়ে উঠছিল ছায়ায়। তিনি প্রতীক্ষা করছিলেন যে ভ্রন্স্কি আরো কিছু বলবেন, কিন্তু উনি নীরবে নুড়ির ওপর ছড়ি ঠুকতে ঠুকতে চললেন তাঁর পাশে পাশে।
‘আপনি যখন আমাদের এখানে এসেছেন, আন্নার পুরানো বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র আপনি—প্রিন্সেস ভারভারাকে আমি হিসেবে ধরি না—তখন আমি ধরে নিচ্ছি আপনি এসেছেন আমাদের অবস্থাটা স্বাভাবিক ভেবে নয়। এসেছেন এই কারণে যে অবস্থাটার দুঃসহতা আপনি বোঝেন এবং সব সত্ত্বেও আন্নাকে ভালোবাসেন বলে তাকে সাহায্য করতে চান। আমি আপনাকে ভালোবাসেন বলে তাকে সাহায্য করতে চান। আমি আপনাকে ঠিক বুঝেছি কি?’ তাঁর দিকে তাকিয়ে ভ্রন্স্কি জিজ্ঞেস করলেন।
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা ছাতা বন্ধ করে বললেন, ‘সে তো বটেই। কিন্তু…’
‘না’, এই বলে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে ভ্রন্স্কি অচেতন একটা ঝোঁকে দাঁড়িয়ে পড়লেন, ভুলে গেলেন যে এতে করে তাঁর সঙ্গিনীকে তিনি একটা অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলছেন, তাঁকেও দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে; ‘আমার চেয়ে বেশি করে, তীব্রভাবে আর কেউ অনুভব করে না আন্নার অবস্থার দুর্বিষহতা। আপনি যদি আমাকে হৃদয়বান পুরুষ বলে গণ্য করার সম্মান দেন, তাহলে আপনি সেটা বুঝবেন। এ অবস্থাটার জন্যে দায়ী আমি, তাই সেটা প্রাণ থেকে অনুভব করি।’
‘বুঝতে পারছি’, যে আন্তরিকতায় এবং দৃঢ়তায় ভ্রন্স্কি কথাটা বললেন, তাতে অজান্তে মুগ্ধ হয়ে বললেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা; ‘কিন্তু আপনি নিজেকে দায়ী মনে করছেন বলেই আমার ভয় হচ্ছে যে আপনি বাড়িয়ে দেখছেন।’
‘সমাজটা নরক’, বিমর্ষ মুখ গোঁজ করে দ্রুত বলে গেলেন ভ্রন্স্কি। পিটার্সবুর্গে দু’সপ্তাহ থাকাকালে যে নৈতিক মর্মবেদনা সে ভোগ করেছে। তার চেয়ে খারাপ কিছু কল্পনা করা যায় না… সেটা বিশ্বাস করুন, অনুরোধ করছি।’
