‘আপনি যদি হাসপাতালটা দেখতে চান এবং ক্লান্ত না হয়ে থাকেন, তাহলে চলুন যাই, বেশি দূর নয়’, ডল্লির যে সত্যিই ব্যাজার লাগছে না সে বিষয়ে নিশ্চিত হবার জন্য তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন।
তারপর আন্নার দিকে ফিরলেন, ‘তুমিও যাবে নাকি আন্না?’
‘যাব। তাই না?’ সি্ভ্য়াজ্স্কিকে বললেন আন্না। ‘কিন্তু বেচারা ভেস্লোভস্কি আর তুশকেভিচকে নৌকায় ক্লান্ত হতে বাধ্য করা উচিত নয়। ওদের বলতে পাঠানো দরকার। হ্যাঁ, এখানে একটা স্মৃতিস্তম্ভ ও গড়ছে’, ডল্লিকে তিনি বললেন সেই রকম ধূর্ত, অভিজ্ঞ হাসি নিয়ে, যেভাবে তিনি আগেও হাসপাতালের কথাটা পেড়েছিলেন।
‘আহ্, চমৎকার একটা কীর্তি বটে!’ সি্ভ্য়াজ্স্কি বললেন। কিন্তু তাঁকে যাতে ভ্রন্স্কির ধামা-ধরা বলে না দেখায়, তার জন্য যোগ করলেন সামান্য সমালোচনার একটা টিপ্পনি। ‘তবে আমার অবাক লাগে কাউন্ট’, বললেন তিনি, ‘জনগণের স্বাস্থ্যের জন্যে এতকিছু করলেও স্কুলের ব্যাপারে আপনি উদাসীন থাকতে পারেন কি করে।
‘স্কুল হয়ে দাঁড়িয়েছে বড় বেশি মামুলি ব্যাপার’, ফরাসিতে বললেন ভ্রন্স্কি, ‘আপনি বুঝতে পারছেন ও জন্যে নয়, এমনি এ কাজটায় মেতে উঠেছি। এটা হাসপাতালে যাবার পথ’, তরুবীথির ধার দিয়ে বেরোবার একটা রাস্তা দেখিয়ে দারিয়া আলেকসান্দ্রভনাকে বললেন তিনি।
মহিলারা ছাতা খুলে গেলেন পাশের পথে। কয়েকটা মোড় নিয়ে ফটক দিয়ে বেরতেই দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার চোখে পড়ল সামনে উঁচু একটা জায়গার ওপর জটিল আকারের মস্তো এক লাল দালান, নির্মাণ তার প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে এসেছে। লোহার পাতের চালে তখনো রঙ পড়েনি, উজ্জ্বল রোদে তা ঝকঝক করছিল। শেষ হয়ে আসা এই দালানটার পাশে মাথা তুলছে আরেকটা দালান, তখনো তা ভারা বাঁধা, অ্যাপ্রন পরা মজুরেরা তক্তার ওপর দাঁড়িয়ে ইঁট গাঁথছিল, চুন-সুরকির প্রলেপ দিয়ে তা সমান করছিল কর্ণিক চালিয়ে।
সি্ভ্য়াজ্স্কি বললেন, ‘আপনার কাজ চলছে কেমন চটপট! গতবার যখন এসেছিলাম তখন চালও ছিল না।’ আন্না বললেন, ‘শরৎ নাগাদ সব তৈরি হয়ে যাবে। ভেতরের কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।’
‘আর এই দালানটা কিসের?’
‘এখানে থাকবেন ডাক্তার, ঠাঁই নেবে ঔষধালয়’, বললেন ভ্রন্স্কি। তারপর খাটো, হালকা ওভারকোটে স্থপতিকে তাঁর দিকে আসতে দেখে মহিলাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে গেলেন তাঁর দিকে।
একটা গর্ত থেকে মজুরেরা চুন-সুরকি তুলছিল, সেটার পাশ দিয়ে তিনি গেলেন স্থপতির কাছে এবং উত্তেজিত হয়ে কি নিয়ে যেন আলোচনা করলেন।
কি ব্যাপার জিজ্ঞেস করায় আন্নাকে তিনি বললেন, ‘মাথাল নিচুই থেকে যাচ্ছে।’
আন্না বললেন, ‘আমি তো বলেছিলাম যে বনিয়াদটা উঁচু করা দরকার।’
স্থপতি বললেন, ‘সেটা ভালো হত বৈকি আন্না আর্কাদিয়েভনা। কিন্তু এখন আর উপায় নেই।’
বাস্তুকর্মে আন্নার জ্ঞানে বিস্ময় প্রকাশ করায় সি্ভ্য়াজ্স্কিকে তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, এ নিয়ে আমি খুবই আগ্রহী। নতুন দালানটাকে আগেরটার সাথে খাপ খাওয়ানো দরকার ছিল। অথচ ওটার কথা ভাবা হয়েছে পরে, শুরু করা হয়েছে বিনা পরিকল্পনায়।’
স্থপতির সাথে কথাবার্তা শেষ করে ভ্রন্স্কি মহিলাদের নিয়ে গেলেন হাসপাতালের ভেতরটা দেখাতে।
বাইরে তখনো কাজ হচ্ছিল কার্নিস নিয়ে, দেওয়া হচ্ছিল নিচের তলায়, তাহলেও ওপরতলায় সব কাজই প্রায় শেষ। পেটা লোহার চওড়া সিঁড়ি দিয়ে চাতালে উঠে তাঁরা ঢুকলেন প্রথম বড় ঘরখানায়। দেয়ালের পলেস্তারা শ্বেত পাথরের ধাঁচে, বড় বড় জানালায় শার্সি বসেছে এর মধ্যেই, শুধু মেঝের পার্কেট তখনো শেষ হয়নি। উঁচু হয়ে ওঠা চৌখুপিগুলোর ওপর র্যাঁদা ঘষা থামিয়ে ছুতারেরা মাথার চুল বেঁধে রাখার পটি খুলে উঠে দাঁড়াল অভ্যাগতদের অভিনন্দন জানাতে।
ভ্রন্স্কি বললেন, ‘এটা হবে রোগী গ্রহণকক্ষ। এখানে থাকবে ডেস্ক, টেবিল, আলমারি, ব্যস, আর কিছু নয়।’
‘এখানে, এখান দিয়ে যাব। জানালার কাছের যেও না’, এই বলে আন্না পরখ করে দেখলেন রঙ শুকিয়েছে কিনা, ‘আলেক্সেই, রঙ শুকিয়ে গেছে’, যোগ করলেন তিনি।
রোগী গ্রহণকক্ষ থেকে তাঁরা গেলেন করিডরে। এখানে ভ্রন্স্কি তাঁদের দেখালেন নতুন পদ্ধতিতে নির্মিত বায়ু- চলাচলের ব্যবস্থা। তারপরে দেখালেন মর্মরে বাঁধানো গোসলখানা, বিচিত্র ধরনের স্প্রিং দেওয়া শয্যা। তারপর একের পর এক ওয়ার্ড, গুদাম, বিছানার চাদরপত্র রাখার ঘর, অতঃপর নতুন ডিজাইনের ফায়ারপ্লেস, করিডর বরাবর দরকারি জিনিসপত্র জোগাবার ঠেলাগাড়ি যাতে শব্দ হবে না, এবং আরও অনেক কিছু। নতুন সমস্ত উন্নতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল লোকের মত সি্ভ্য়াজ্স্কি কদর করলেন সব কিছুর। এ যাবত যেসব জিনিস তিনি দেখেননি, তা দেখে স্রেফ থ’ হয়ে গেলেন ডল্লি এবং সব কিছু বোঝার জন্য খুঁটিয়ে প্রশ্ন করতে লাগলেন। সেটা স্পষ্টতই ভালো লাগল ভ্রন্স্কির।
সি্ভ্য়াজ্স্কি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমার মনে হয়, এটাই হবে রাশিয়ায় পুরোপুরি সুনির্মিত একমাত্র হাসপাতাল।’ কিন্তু আপনাদের এখানে প্রসূতি বিভাগ থাকবে না?’ ডল্লি জিজ্ঞেস করলেন : ‘গ্রামে যে তার ভারি দরকার। আমি প্রায়ই…’
নিজের সৌজন্যশীলতা সত্ত্বেও ভ্রন্স্কি থামিয়ে দিলেন তাঁকে।
