ডল্লিকে সস্নেহেই নিলেন প্রিন্সেস ভারভারা এবং খানিকটা মুরুব্বিয়ানার ঢঙে। আর তৎক্ষণাৎ তাঁকে বোঝাতে লাগলেন যে তিনি আন্নার এখানে উঠেছেন। কেননা সব সময় তিনি আন্নাকে ভালোবেসেছেন তাঁর চেয়ে বেশি, এবং এখন সবাই যখন আন্নাকে ত্যাগ করেছে, তখন সবচেয়ে দুঃসহ এই অন্তর্বর্তী কালটায় আন্নাকে সাহায্য করা তাঁর কর্তব্য বলে মনে করেছেন তিনি।
‘স্বামী ওকে বিবাহবিচ্ছেদের অনুমতি দিলেই আমি আবার আমার একাকিত্বে ফিরে যাব, কিন্তু এখন আমি কাজে লাগতে পারি আর অন্যদের মত নয়, আমার পক্ষে যত কঠিনই হোক, নিজের কর্তব্য আমি করে যাব। এসে বড্ডো ভালো করেছ, লক্ষ্মী তুমি। এরা আছে একেবারে সেরা দম্পতির মত; সৃষ্টিকর্তা ওদের বিচার করবেন, আমরা নই। কিন্তু বিরিউজোভস্কি আর আভেনিয়েভাও কি… আর স্বয়ং নিকান্দ্রভ, ভাসিলিয়েভ আর মামোনোভা, আর লিজা নেপতুনোভা?… কেউ তো কিছু বলল না। পরিণামে সবাই তাদের ঘরে ডেকেছে। তারপর, এখানকার অবস্থাটা ভারি মিষ্টি আর পরিপাটী। সবই ইংরেজি কায়দায়। প্রাতরাশের সময় সবাই জোটে, তারপর যে যার মত ছড়িয়ে পড়ে। ডিনারের আগে পর্যন্ত যার যা খুশি করে। ডিনার সাতটায়। স্তিভা তোমাকে এখানে পাঠিয়ে খুব ভালো করেছে। এদের সাথে লেগে থাকা ওর দরকার। জান তো, ও তার মা আর ভাইয়ের মারফত সব কিছু করাতে পারে। তাছাড়া অনেক উপকার করে তারা। নিজের হাসপাতালটার কথা বলেনি তোমাকে? এটা হবে সুন্দর, সবই প্যারিস থেকে।’
কথাবার্তা থেমে গেল বারান্দায় পুরুষদলসহ আন্নার প্রত্যাবর্তনে। তাঁদের তিনি পেয়েছিলেন বিলিয়ার্ড ঘরে। ডিনারের সময় হতে তখনো অনেক বাকি, আবহাওয়া চমৎকার, তাই এই বাকি দু’ঘণ্টা কিভাবে কাটানো যায় তার নানা প্রস্তাব এল। আর ভজ্দ্ভিজেনস্কয়েতে সময় কাটাবার উপায় ছিল প্রচুর, পক্রোভ্স্কয়েতে যেসব উপায়ের আশ্রয় নেওয়া হত, মোটেই তেমন নয়।
‘এক দফা টেনিস’, নিজের সেই সুন্দর হাসি হেসে ফরাসি ভাষায় প্রস্তাব দিলেন ভেস্লোভস্কি, ‘আবার আপনি হবেন আমার পার্টনার, আন্না আর্কাদিয়েভনা।’
‘না, বড় গরম। বরং বাগানে খানিক বেরিয়ে তারপর নৌবিহার, দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনাকে তীরভূমি দেখানো যাবে’, বললেন ভ্রন্স্কি।
‘আমি সব কিছুতেই রাজি’, সি্ভ্য়াজ্স্কি বললেন।
‘আমার মনে হয় ডল্লির সবচেয়ে ভালো লাগবে হেঁটে বেড়াতে, তাই না? তারপর নৌকো’, বললেন আন্না। তাই স্থির হল। ভেস্লোভস্কি আর তুশকেভিচ গেলেন গোসলের ঘাটে, সেখানে নৌকো ঠিক করে সবাইয়ের প্রতীক্ষায় থাকবেন বলে কথা দিলেন।
পথ দিয়ে ওঁরা হাঁটছিলেন জোড়ায় জোড়ায়—–ভিয়াস্কির সাথে আন্না, ভ্রন্স্কির সাথে ডল্লি। আন্নার আচরণকে তিনি বিমূর্তভাবে, তত্ত্বগত দিক থেকে মেনে নিয়েছিলেন শুধু তাই নয়, সমর্থনই করেছিলেন। সাধ্বী জীবনের একঘেয়েমিতে ক্লান্ত হয়ে পড়া নিষ্কলুষ সাধ্বী নারীদের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে যা প্রায়ই ঘটে থাকে, পাতকী প্রেমকে তিনি শুধু মার্জনাই করেননি। এমন কি তার জন্য ঈর্ষাই বোধ করেছিলেন। তাছাড়া সত্যিই তিনি ভালোবাসতেন আন্নাকে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে, তাঁর কাছে অনাত্মীয় এই সমস্ত লোকদের মধ্যে আন্নাকে দেখে, শীলতা সম্পর্কে যাঁদের মতামত দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার কাছে নতুন, তাতে তাঁর অস্বস্তি হচ্ছিল। বিশেষ করে তাঁর খারাপ লাগছিল প্রিন্সেস ভারভারাকে দেখে, যিনি সব কিছু ক্ষমা করে দিচ্ছেন যেসব সুবিধা ভোগ করছেন তার জন্য।
আন্নার আচরণ ডল্লি অনুমোদন করেছিলেন সাধারণভাবে, বিমূর্তিতে, কিন্তু যে লোকটির জন্য এরূপ আচরণ করা হল, তাঁকে দেখতে পারছিলেন না ডল্লি। তাছাড়া ভ্রন্স্কিকে তাঁর ভালো লাগেনি কখনো। তিনি তাঁকে ভাবতেন অহংকারী, আর ঐশ্বর্য ছাড়া অহংকার করার মত কিছুই দেখেননি তাঁর মধ্যে। কিন্তু এখানে, নিজের বাড়িতে তিনি ডল্লির ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তাঁকে অভিভূত করছিলেন আগের চেয়ে আরো বেশি, তাঁর সামনে নিঃসংকোচ হতে পারছিলেন ডল্লি। নিজের নাইট-গাউনের জন্য পরিচারিকার সামনে তাঁর যেরকম লেগেছিল, অনেকটা সেইরকম লাগছিল তাঁর। তালিগুলোর জন্য পরিচারিকার সামনে তাঁর যেমন লজ্জা নয়, অস্বস্তি হয়েছিল, ভ্রন্স্কির সামনেও তেমনি তাঁর নিজের জন্য লজ্জা নয়, অস্বস্তি লাগছিল।
বিব্রত বোধ হওয়ায় কথোপকথনের একটা প্রসঙ্গ খুঁজছিলেন ডল্লি। ভ্রন্স্কি যা অহংকারী তাতে তাঁর বাগান ও বাড়ির প্রশংসায় তাঁর মন উঠবে না বলে ভাবলেও কথাবার্তার অন্য প্রসঙ্গ না পেয়ে ডল্লি তাঁকে শেষ পর্যন্ত বলেই ফেললেন যে তাঁর বাড়িটা তাঁর খুব ভালো লেগেছে।
ভ্রন্স্কি বললেন, ‘হ্যাঁ, ভালো সাবেকী রীতিতে এটা ভারি সুন্দর একটা কুঠি ‘
‘গাড়ি-বারান্দার সামনের আঙিনাটা খুব ভালো লেগেছে আমার। এটা কি আগেও অমনি ছিল?’
‘আরে না!’ পরিতৃপ্তিতে জ্বলজ্বলে মুখে বললেন তিনি। ‘এবারের বসন্তে আঙিনাটা দেখলে পারতেন!’
এবং প্রথমটা সন্তর্পণে, তারপর ক্রমেই মেতে উঠে ডল্লির মনোযোগ আকর্ষণ করতে লাগলেন বাড়ি আর বাগানের নানা দিককার শোভায়। বোঝা যাচ্ছিল যে নিজের সম্পত্তিটার উন্নয়ন ও শোভাবর্ধনের জন্য অনেক খাটায় ভ্রন্স্কি নতুন লোকের কাছে বড়াই করার তাগিদ বোধ করছিলেন, অন্তর থেকেই তিনি খুশি হলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার প্ৰশংসায়।
