‘তোমার মেয়েটা কেমন আছে?’ জিজ্ঞেস করলেন ডল্লি।
‘আনি?’ (মেয়ে আন্নাকে তিনি ঐ নামে ডাকতেন।) ‘ভালো আছে। মোটা হয়েছে খুব। দেখবে ওকে? চল যাই, তোমাকে দেখাই। ভয়ানক ঝামেলা গেছে আয়া নিয়ে’, বলতে শুরু করলেন উনি, ‘একটি ইতালীয় মেয়ে ছিল স্তন্যদাত্রী। এমনিতে ভালো, কিন্তু একেবারে হাঁদা! ভেবেছিলাম ছাড়িয়ে দেব। কিন্তু মেয়েটা ওর বড় ন্যাওটা হয়ে পড়েছে, তাই রেখেছি এখনো।’
‘কিন্তু কি ঠিক করলে?…’ মেয়েটার উপাধি কি হবে সে বিষয়ে প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন ডল্লি; কিন্তু আন্নার মুখে ভ্রুকুটি দেখে প্রশ্নটার অর্থ পালটিয়ে দিলেন, ‘তা কি ঠিক করেছ? মাই ছাড়িয়েছ নাকি?’
কিন্তু আন্না বুঝেছিলেন।
‘তুমি তো সে কথা জিজ্ঞেস করতে চাইছিলে না? তুমি তো ওর উপাধি সম্পর্কে জানতে চাইছিলে? তাই না? আলেক্সেই-এর সেই কষ্ট। ওর কোন উপাধি নেই। মানে, ও কারেনিনা’, আন্না বললেন চোখ এতটা কুঁচকে যে দেখা যাচ্ছিল কেবল জুড়ে আসা আঁখি পদ্ম; ‘তবে’, হঠাৎ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল মুখমণ্ডল, এ নিয়ে কথা বলব পরে। চল, তোমাকে দেখাব ওকে। সে ভারী মিষ্টি! এর মধ্যেই হামাগুড়ি দিতে শিখেছে।’
যে বিলাসোপকরণ বাড়ির সর্বত্র অভিভূত করছিল দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনাকে, তা আরো অভিভূত করল শিশুকক্ষে। এখানে ছিল ইংলন্ড থেকে আনানো গাড়ি, হাঁটতে শেখাবার সাজ-সরঞ্জাম, হামাগুড়ি দেবার জন্য বিলিয়ার্ড টেবিলের মত করে ঢেলে সাজা সোফা, দোলনা, গোসলের জন্য বিশেষ ধরনের টব। জিনিসগুলো সবই বিলাতি, মজবুত আর বোঝাই যায় যে বেশ দামী। ঘরটা বড়, খুবই উঁচু আর আলো-খেলানো।
ওঁরা যখন ঘরে ঢুকলেন, শুধু একটা কামিজ পরে চেয়ার-টেবিলে বসে ক্বাথ খাচ্ছিল মেয়েটা, সে পানীয়ে বুক তার ভেসে যাচ্ছিল। ওকে খাওয়াচ্ছিল এবং বোঝা যায় সেই সাথে নিজেও খাচ্ছিল শিশুকক্ষের পরিচারিকা একটি রুশী মেয়ে। স্তন্যদাত্রী বা আয়া, কেউই ছিল না। ওরা ছিল পাশের ঘরে, সেখান থেকে ভেসে আসছিল বিচিত্র এক ফরাসি ভাষায় তাদের আলাপ–শুধু এই ভাষাতেই আদান-প্রদান চলতে পারত তাদের মধ্যে।
আন্নার গলা শুনতে পেয়ে তাড়াতাড়ি করে ঘরে ঢুকল ঢ্যাঙামত, সাজগোজ করা এক ইংরেজ মহিলা, তার অসুন্দর মুখটায় একটা কপট ছায়া, সোনালি চুলের কুণ্ডলীগুলো ঝাঁকিয়ে তখনই সে কৈফিয়ৎ দিতে শুরু করল যদিও আন্না কোন দোষ দেননি তাকে। আন্নার প্রতিটি শব্দে বারকয়েক করে সে ইংরেজিতে বলছিল, ‘জ্বি হ্যাঁ, কর্ত্রী।’
আগন্তুকের দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকালেও কালো-ভুরু, কালো-চুল, লালচে-গাল খুকিটিকে বড় ভালো লাগল দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার। তারা রাঙা দেহখানায় টান টান হয়ে আছে মুরগির চামড়ার মত চামড়া; তার সুস্থ চেহারার
জন্য এমন কি হিংসাই হল ডল্লির। খুকি যেভাবে হামাগুড়ি দিচ্ছিল, সেটাও তাঁর ভারি ভালো লাগল। তাঁর নিজের ছেলেমেয়েদের কেউই অমন হামাগুড়ি দিতে পারেনি। খুকিটির পোশাক পেছন দিকে টেনে তুলে যখন তাকে বসিয়ে দেওয়া হল গালিচার ওপর, আশ্চর্য সুন্দর লাগছিল তাকে। ছোট্ট একটা জন্তুর মত সে তার জ্বলজ্বলে কালো চোখ মেলে চাইছিল বড়দের দিকে, তাকে যে লোকে মুগ্ধ হয়ে দেখছে, এতে স্পষ্টতই আনন্দ হচ্ছিল তার। হেসে দু’পাশে দু’পা রেখে সে ঝট করে হাতে ভর দিয়ে দ্রুত পাছাটা তুলল এবং আবার হাত দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।
কিন্তু শিশুকক্ষের সাধারণ আবহাওয়া, বিশেষ করে ইংরেজ মহিলাটিকে ভালো লাগেনি দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার। লোকজন সম্বন্ধে আন্নার যথেষ্ট বুদ্ধিশুদ্ধি থাকা সত্ত্বেও তিনি যে এমন এক কুরূপা, অশ্রদ্ধেয়া ইংরেজ মহিলাকে রেখেছেন নিজের কাছে ডল্লি তার ব্যাখ্যা করে নিলেন এই ধরে নিয়ে যে আন্নার মত এমন বিশৃঙ্খল পরিবারে ভালো আয়া আসবে না। তাছাড়া তখনই কতকগুলি কথা থেকে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা বুঝলেন যে আন্না, স্তন্যাদত্রী, আয়া আর শিশুটির মধ্যে বনিবনাও নেই এবং শিশুকক্ষে মায়ের আগমন অতি অসাধারণ একটা ব্যাপার। আন্নার ইচ্ছে হয়েছিল খুকিকে খেলনা দেবেন, কিন্তু খুঁজে পেলেন না সেটা।
তবে সবচেয়ে তাজ্জব ব্যাপার এই যে, খুকির ক’টা দাঁত উঠেছে এ প্রশ্নের ভুল জবাব দিলেন আন্না, শেষ দুটো দাঁতের কথা একেবারেই জানতেন না তিনি।
‘আমি এখানে নিষ্প্রয়োজন, তা দেখে মাঝে মাঝে কষ্ট হয় আমার’, শিশুকক্ষ থেকে বেরোবার সময় দরজার কাছে পড়ে থাকা কোন খেলনা এড়িয়ে যাবার জন্য পোশাকের লুটিয়ে যাওয়া পুচ্ছাংশ তুলে ধরে আন্না বললেন, ‘আমার প্রথম সন্তানটির বেলায় এমনটা হয়নি।’
‘আরে না! জানো তো আমি ওকে, সেরিওজাকে দেখে এসেছি’, এমনভাবে চোখ কুঁচকে আন্না বললেন যেন অনেক দূরের কিছু-একটা দেখছেন, ‘তবে সে পরে হবে। জানো তুমি, আমি ঠিক সেই বুভুক্ষুর মত যার সামনে হঠাৎ পুরো একটা ভোজ রাখা হয়েছে আর সে ভেবে পাচ্ছে না কোনটা দিয়ে শুরু করবে। পুরো ভোজটা হল তুমি আর তোমার সাথে আমার যেসব কথাবার্তা হবে, যা আর কাউকে আমি বলতে পারিনি; অথচ ভেবে পাচ্ছি না শুরু করব কোনটা দিয়ে। একটুও দয়া করব না তোমাকে। সব কিছু বলতে হবে আমাকে। হ্যাঁ, যে সমাজটা আমাদের এখানে দেখতে পাবে, তার একটা নক্শা তোমার জন্যে আঁকা দরকার’, আন্না শুরু করলেন; মহিলাদের দিয়ে শুরু করা যাক। প্রিন্সেস ভারভারা। ওঁকে তো তুমি চেনো, ওঁর সম্পর্কে তোমার আর স্তিভার মতামত কি তাও আমি জানি। স্তিভা বলে যে ওঁর জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হল কাতেরিনা পাভলোভনা চাচির চেয়ে তিনি কত ভালো সেটা দেখানো। তা সত্যি, কিন্তু ওঁর মনটা ভালো; আমি ওঁর কাছে ভারি কৃতজ্ঞ। পিটার্সবুর্গে এমন একটা সময় এসেছিল যখন আমার প্রয়োজন হয় একজন সহচরী, এক্ষেত্রে তিনি সাহায্য করেন। সত্যি, ভালোমানুষ উনি। আমার অবস্থাটা তিনি হালকা করে দেন অনেক। ওখানে, পিটার্সবুর্গে… আমার অবস্থাটা যে কত দুঃসহ তা তুমি বুঝছ না-উনি অভিজাতপ্রমুখ এবং খুবই সজ্জন লোক, কিন্তু আলেক্সইে-এর কাছ থেকে কি যেন একটা চাইছেন। বুঝতে পারছ তো, গাঁয়ে বাসা পাতার পর সম্পত্তির কারণে আলেকসেই এখন মফস্বলে খুবই প্রভাবশালী লোক। তারপর তুশকেচি, তুমি দেখেছ ওঁকে, ছিলেন বেত্সির ওখানে। এখন কিন্তু বেত্সি ওঁকে ছেড়ে দিয়েছেন, উনিও চলে এলেন আমাদের কাছে। আলেক্সেই যা বলে, উনি তেমনি একজন লোক যারা নিজেদের যেভাবে দেখাতে চায়, সেভাবেই তাদের ধরা হলে খুবই প্রীতি লাভ করে। তাছাড়া, অতি ভব্য লোক। যা বলেন প্রিন্সেস ভারভারা। তারপর ভেস্লোভস্কি -ওকে তো তুমি চেনো, চমৎকার ছেলে’, শয়তানি হাসিতে কুঞ্চিত হয়ে উঠল তাঁর ঠোঁট; কিন্তু কি এই ক্ষ্যাপা কাণ্ডটা করল লেভিন? ভেস্লোভস্কি গল্প করেছে আলেক্সেই-এর কাছে, কিন্তু আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না। উনি অতি মধুর স্বভাবের লোক এবং খুবই সরল।’ আন্না বললেন আবার সেই হাসি নিয়ে। পুরুষদের চাই আমোদ-প্রমোদ আর আলেক্সেই-এর দরকার লোকজন, সেই জন্যেই এঁদের আমি কদর করি। আমাদের এখানে চলুক ফুর্তি, সব থাক হাসি-খুশি, যাতে নতুন কোন কিছুর জন্যে আলেক্সেই-এর মন কেমন না করে। তারপর আমাদের গোমস্তাকে দেখতে পাবে। জার্মান কিন্তু ভারি ভালো, নিজের কাজটা বেশ বোঝে। আলেকসেই ওর খুবই কদর করে। তারপর ডাক্তার, অল্পবয়সী, একেবারে নিহিলিস্ট বলব না, তবে খাবার খায় ছুরি দিয়ে… কিন্তু খুব ভালো ডাক্তার। তারপর স্থপতি… ছোট্ট একটা দরবার।
আন্না কারেনিনা – ৬.২০
বিশ
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার সাথে পাথর-বাঁধানো প্রকাণ্ড বারান্দাটায় ঢুকে আন্না বললেন, ‘এই আপনার ডল্লি, প্রিন্সেস। যাকে আপনি খুব দেখতে চাইছিলেন।’ প্রিন্সেস ভারভারা সেখানে ছায়ায় এম্ব্রয়ডারি ফ্রেমের সামনে বসে কাউন্ট আলেকসেই কিরিলোভিচের ইজি-চেয়ারের জন্য একটি আসন বানাচ্ছিলেন। ‘ডল্লি বলছে ডিনারের আগে কিছুই খাবে না সে, কিন্তু কিছু জলযোগ দিতে বলুন। আমি আলেক্সেইকে খুঁজতে চললাম। ওঁদের সবাইকেই নিয়ে আসব।
