না, ডল্লি লক্ষ্মীটি… সে দেখা যাবে; চল, চল যাই’, আন্না ডল্লিকে নিয়ে গেলেন তাঁর ঘরে।
ভ্রন্স্কি যে জমকালো ঘরের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এটা তেমন নয়, বরং এমন যার জন্য ডল্লির কাছে মাপ চেয়ে নিলেন আন্না। কিন্তু মাপ চাইতে হল যে ঘরখানার জন্য, সেটাও এত বিলাসী যাতে ডল্লি থাকেননি কোনদিন। যা তাঁকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল বিদেশের সেরা হোটেলগুলোর কথা।
‘কি বলব ভাই, কি যে আনন্দ আমার!’ নিজের রাইডিং-হ্যাবিট পোশাকেই ডল্লির কাছে কিছুক্ষণের জন্য বসে আন্না বললেন, ‘এবার তোমার কথা বল। স্তিভাকে আমি দেখেছিলাম এক ঝলকের জন্যে। কিন্তু ছেলেমেয়েদের কথা ও কিছু বলতে পারেনি। কেমন আছে আমার আদরের তানিয়া? ডাগর হয়ে উঠেছে নিশ্চয়?’
‘হ্যাঁ, বেশ ডাগর’, সংক্ষেপে জবাব দিলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা, নিজেরই তাঁর অবাক লাগল যে নিজের ছেলেমেয়েদের কথা তিনি বলতে পারছেন এত নিরুত্তাপ গলায়। ‘লেভিনদের ওখানে আমরা বেশ ভালো আছি’, যোগ করলেন তিনি।
বললেন আন্না, ‘হ্যাঁ, যদি জানতাম যে, তুমি আমাকে ঘৃণা করছ না… তাহলে তোমরা সবাই আসতে পারতে এখানে; ‘স্তিভা তো আলেক্সেইয়ের পুরানো আর ঘনিষ্ঠ বন্ধু’, তিনি এই কথাটা যোগ করে হঠাৎ লাল হয়ে উঠলেন।
‘কিন্তু আমরা সেখানে বেশ ভালো আছি…’ অস্বস্তিভরে বললেন ডল্লি।
‘হ্যাঁ, অবশ্য আনন্দ থেকে বোকার মত এসব কথা বলছি। শুধু কি খুশি হয়েছি তোমাকে পেয়ে!’ আবার ডল্লিকে চুমু খেয়ে বললেন আন্না। ‘এখনো তুমি বলোনি আমার সম্পর্কে কি তুমি ভাবো অথচ আমি তা সবই জানতে চাই। তবে আমি যেমন, তেমনি অবস্থায় তুমি আমাকে দেখবে, এতে আমি খুশি। আমার কাছে বড় জিনিস, আমি কিছু- একটা প্রমাণ করতে চাই, এমন কথা কেউ যেন না ভাবে। কিছুই প্রমাণ করতে চাই না আমি। শুধু বাঁচতে চাই; নিজের ছাড়া আর কারো অনিষ্ট করতে চাই না। সে অধিকার আমার আছে, তাই না? তবে এটা লম্বা আলাপের ব্যাপার। তার সময় হবে। আমি এবার পোশাক বদলাতে যাই। দাসী পাঠিয়ে দিচ্ছি তোমার জন্যে! ‘
উনিশ
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা একা হয়ে গৃহকর্ত্রীর দৃষ্টিতে ঘরটা দেখতে লাগলেন। বাড়ির কাছে আসতে, তার ভেতর দিয়ে যেতে, এবং এখন নিজের ঘরটায় যা তিনি দেখলেন, সব কিছুতেই একটা প্রাচুর্য, বাবুগিরি এবং হালের সেই ইউরোপীয় বিলাসের ছাপ যার কথা তিনি পড়েছেন কেবল ইংরেজি উপন্যাসে, কিন্তু রাশিয়ায় ও গ্রামে তা দেখেননি কখনো। নতুন ফরাসি ওয়াল-পেপার থেকে শুরু করে সারা ঘর জোড়া গালিচাটা পর্যন্ত সবই নতুন। শয্যায় স্প্রিঙের গদি, বিশেষ ধরনের শিরোধার। ছোট বালিশে সিল্কের ওয়াড়। মার্বেল পাথরের ওয়াশ-স্ট্যান্ড, প্রসাধন টেবিল, সোফা, টেবিল, ফায়ার প্লেসের ওপর ব্রেঞ্জ ঘড়ি, জানালা-দরজার পর্দা—সবই দামী এবং নতুন।
সুন্দর কবরী আর ডল্লির চেয়েও ফ্যাশন-দুরস্ত পোশাকে যে দাসীটি এল পরিচর্যার জন্য। সেও ঘরের সব কিছুর মত নতুন আর দামী। বিনয়, পরিপাটীত্ব আর কাজে লাগার আগ্রহের জন্য তাকে ভালো লেগেছিল দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার, আবার অস্বস্তিও হচ্ছিল; কি পোড়া কপাল যে ভুল করে তাঁর ব্যাগে রাখা হয়েছিল তালি-মারা নাইট- গাউন, দাসীর সামনে এতে লজ্জা হচ্ছিল। যেসব তালি-মারা আর রিফু-রা জায়গাগুলোর জন্য তিনি বড়াই করতেন বাড়িতে, লজ্জা হল তার জন্যই। বাড়িতে খুবই পরিষ্কার ছিল যে, ছয়টা গাউনের জন্য দরকার পঁয়ষট্টি কোপেক দরে চব্বিশ আর্শিন ( আর্শিন : ৭১ সেন্টিমিটারের মত রুশ দৈর্ঘ্যের মাপ ) নানসুক, সেলাই আর ফুল তোলার খরচা বাদে এতে দাঁড়াত পনের রুবলের বেশি, এই পনের রুবলটা বাঁচাতে হত সংসারের খরচা থেকে। কিন্তু দাসীর সামনে এর জন্য শুধু লজ্জা নয়, কেমন যেন অস্বস্তিই বোধ হচ্ছিল।
যখন ঘরে এল তাঁর পূর্বপরিচিত আনুশ্কা, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা। বিলাসিনী দাসীটির দরকারে পড়েছিল প্রভুপত্নীর কাছে, আনুশ্কা রইল দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার সাথে।
ডল্লি আসায় আনুশ্কা স্পষ্টতই খুবই খুশি হয়েছিলেন যে গুহস্বামিনীর অবস্থা, বিশেষ করে আন্না আর্কাদিয়ে নার জন্য সে খুবই আগ্রগী। কিন্তু ও নিয়ে সে কথা শুরু করা মাত্র ডল্লি থামিয়ে দিচ্ছিলেন তাকে।
‘আমি তো আন্না আর্কাদিয়েভনার সাথে বেড়ে উঠেছি, উনি আমার বড় আপন। বিচার করার আমি কে? আর যখন মনে হচ্ছে এত ভালোবাসছেন…’.
‘সম্ভব হলে এগুলো ধুতে দাও’, ওকে থামিয়ে দিলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা।
‘ঠিক আছে। আমাদের ধোপঘরে দুটো মেয়ে বহাল করা হয়েছে বিশেষ করে এই জন্যেই। আর বিছানার চাদর- টাদর সবই ধোয়া হয় যন্ত্রে। কাউন্ট নিজেই সেটা দেখেন। কি রকম যে স্বামী… ‘
আন্না আসায় আনুশ্কার বকবকানি বন্ধ হতে খুশি হলেন ডল্লি।
আন্না অতি সাধারণ একটা বাতিস্ত ফ্রক পরে এসেছিলেন। মন দিয়ে ডল্লি লক্ষ্য করলেন এই সাধারণ পোশাকটা। তিনি জানতেন এই সহজিয়ার কি অর্থ এবং কি মূল্যে তা অর্জিত হয়।
‘আমার পূর্বপরিচিতা’, আনুশ্কা সম্পর্কে আন্না বললেন।
এখন আর তিনি বিব্রত বোধ করছিলেন না। এখন তিনি পুরোপুরি সুস্থির, সাবলীল। ডল্লি দেখতে পেলেন যে তাঁর আসায় আন্নার যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, সেটা এখন তিনি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠে এমন একটা বাহ্যিক নিরাসক্তির সুর অবলম্বন করলেন যাতে বোঝা যায় যে-প্রকোষ্ঠে তাঁর হৃদয়াবেগ ও আন্তরিক ভাবনাগুলো আছে তার দরজা বন্ধ।
