আন্না কিন্তু ওঁর প্রশ্নে কান দিলেন না।
‘না-না, আমার অবস্থা সম্পর্কে কি ভাবো তুমি, কি মনে করো? কি?’ জিজ্ঞেস করলেন আন্না।
‘আমি মনে করি…’ শুরু করতে যাচ্ছিলেন ডল্লি। কিন্তু এ সময় কর্ ঘোড়াটাকে ডান পা বাড়িয়ে কদমে ছোটার তালিম দিয়ে ভাসেকা ভেস্লোভস্কি মেয়েলী সোয়েদ জিনের ওপর তাঁর খাটো জ্যাকেট পরা ভারী দেহ থপথপিয়ে ছুটে গেলেন। চেঁচালেন, ‘হচ্ছে, আন্না আর্কাদিয়েভনা!’
আন্না তাঁর দিকে তাকালেন না পর্যন্ত; কিন্তু আবার দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার মনে হল গাড়িতে এই দীর্ঘ কথোপকথনটা শুরু করায় সুবিধা হবে না। তাই নিজের ভাবনাটা তিনি সংক্ষিপ্ত করে নিলেন। বললেন, ‘কিছুই আমি মনে করি না, কিন্তু সব সময়ই ভালোবেসেছি তোমাকে। আর ভালোবাসতে হলে লোকটা যেমন তার সবটাই ভালোবাসতে হয়, আমি যেমন চাই শুধু সেটুকু নয়।
আন্না বান্ধবীর মুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে, চোখ কুঁচকে (এটা একটা নতুন অভ্যাস, ডল্লি আগে তা দেখেননি কথাগুলোর অর্থ পুরোপুরি হৃদয়ঙ্গম করে তাকালেন ডল্লির দিকে। বললেন, ‘তোমার যদি কোন পাপ থাকে, তোমার আসা আর এই কথাগুলোর জন্যে তা সব খণ্ডন হয়ে যাবে।’
ডল্লি দেখতে পেলেন চোখ তাঁর ভরে উঠছে পানিতে। নীরবে আন্নার হাতে চাপ দিলেন তিনি।
‘তা এই বাড়িগুলো কিসের? অনেকগুলো যে!’ মিনিট খানেক চুপ করে থেকে ডল্লি পুনর্বার প্রশ্নটা করলেন।
‘এগুলো আমাদের শ্রমিক-কর্মচারীদের বাড়ি, কর্মশালা, আস্তাবল’, আন্না বললেন, ‘আর এখান থেকে পার্ক শুরু হচ্ছে। এ সবই চুলায় যাচ্ছিল, কিন্তু আলেক্সেই সব উদ্ধার করেছে। এই সম্পত্তিটা সে খুবই ভালোবাসে আর আমি যা মোটেই আশা করিনি, সাংঘাতিক ওর মন বসেছে বিষয়-আশয়ে। তবে স্বভাবে ও ভারি বিত্তবান! যে কাজই হাতে নেবে, সেটা সম্পূর্ণ করবে চমৎকার করে। এখানে ওর শুধু যে মন কেমন করছে না। তাই নয়, প্রাণ দিয়ে কাজে লেগেছে। আমি যতটা জানি, ও হয়ে উঠছে হিসেবী, চমৎকার মালিকা। এমন কি বিষয়-কর্মের ব্যাপারে কৃপণই, কিন্তু শুধু বিষয়-আশয়ের ব্যাপারে। অথচ যেখানে ব্যাপারটা হাজার হাজর টাকা নিয়ে, ও কেয়ার করে না’, আন্না বললেন খুশির সেই সেয়ানা হাসি নিয়ে। যেভাবে শুধু তারই কাছে উদ্ঘাটিত প্রিয়তমের গুণের কথা প্রায়ই বলে থাকে নারীরা; ‘দেখছ, ওই বড় দালানটা? এটা নতুন হাসপাতাল। আমার মনে হয় এতে লাখ খানেক যাবে। এটাই এখন ওর সাম্প্রতিক খেয়াল, নেশা। আর জানো কি থেকে এর শুরু? চাষীরা মনে হয় সস্তায় ঘেসো জমি দিতে, ছাড় দিতে বলেছিল ওকে। ও তা অগ্রাহ্য করে, ওর কিপটেমির জন্যে ওকে বকুনি দিই আমি। বলা বাহুল্য, শুধু এই কারণেই নয়, সব কিছু মিলিয়ে—ও এই হাসপাতালটা বানাতে শুরু কর এটা দেখাবার জন্যে যে মোটেই ও কৃপণ নয়, বুঝেছ তো। বলতে পারো এটা তুচ্ছ ব্যাপার; কিন্তু এর জন্যে ওকে ভালোবাসি আরও বেশি। আর এখনই দেখতে পাব বাড়ি। এটা ওর দাদার বাড়ি, কিন্তু বাইরেটা তার কিছুই বদলায়নি ও।’
‘কি সুন্দর!’ বাগানের বুড়ো গাছগুলোর বিচিত্র শ্যামলিমার মধ্যে স্তম্ভশ্রেণী শোভিত সুদৃশ্য বাড়িটা দেখে স্বতঃই চমৎকৃত হয়ে বলে উঠলেন ডল্লি।
‘সত্যিই সুন্দর, তাই না? আর বাড়ির ওপরতলা থেকে চারপাশের যে দৃশ্য, সেটা অপূৰ্ব।’
নুড়ি ছড়ানো পথ দিয়ে ফুলে ভরা একটা আঙিনায় ঢুকলেন তাঁরা। ফুল বাগানের আলগা করে দেওয়া মাটিতে সেখানে আকাঁড়া ঝামা পাথর বসাচ্ছিল দুজন মালী। গাড়ি থামল আচ্ছাদিত গাড়ি-বারান্দায়।
‘আ, ওরা এসে গেছে দেখছি!’ সওয়ারীদের যে ঘোড়াগুলোকে অলিন্দের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তা দেখে আন্না বললেন, ‘সত্যি, সুন্দর নয় ঘোড়াটা? এটা কর্, আমার পেয়ারের ঘোড়া। নিয়ে এসো এখানে, আর চিনি দাও আমাকে। কাউন্ট কোথায়?’ বাহারী চাপরাশ পরা যে দুজন ভৃত্য ছুটে এসেছিল তাদের জিজ্ঞেস করলেন তিনি। তারপর ভেস্লোভস্কি সমভিব্যাহারে ভ্রনস্কিকে বেরোতে দেখে বললেন : ‘ও, এই যে!
‘তুমি কোথায় থাকতে দেবে প্রিন্সেস দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনাকে’, ফরাসিতে আন্নাকে জিজ্ঞেস করলেন ভ্রন্স্কি, এবং উত্তরের অপেক্ষা না করে, দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার সাথে আরেকবার সম্ভাষণ বিনিময়ান্তে এবার করচুম্বন করে বললেন, ‘আমার মনে হয়, ঝুল-বারান্দা দেওয়া বড় ঘরটায় নয় কি?’
‘আরে না, বরং কোণের ঘরটায়। আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হতে পারবে বেশি। নাও চলো’, ভৃত্য যে চিনি এনে দিয়েছিল, নিজের পেয়ারের ঘোড়াকে তা খাইয়ে বললেন আন্না।
‘আপনি আপনার দায়িত্ব ভুলছেন’, ভেস্লোভস্কিও এসে দাঁড়িয়েছিলেন অলিন্দে, তাঁকে ফরাসি ভাষায় বললেন আন্না।
‘মাফ করবেন, ওতে আমার পকেট ভরা’, হেসে ফরাসি ভাষায় উত্তর দিয়ে ওয়েস্ট-কোটের পকেটে আঙুল ঢোকালেন ভেস্লোভস্কি।
কিন্তু আপনি দর্শন দেন বড় দেরি করে’, চিনি খাওয়াবার সময় তাঁর যে হাতটা ঘোড়া লালায় ভিজিয়েছিল সেটা রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে আন্না ফরাসি ভাষায় বললেন। ডল্লিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এলে কতদিনের জন্যে? একদিনের জন্যে কি? সে হতে পারে না!’
‘তাই বলে এসেছি, তাছাড়া ছেলেমেয়েরা…’ গাড়ি থেকে ব্যাগটা নেওয়া হয়নি আর তিনি বুঝতে পারছিলেন যে তাঁর মুখ অতি ধূলিধূসর। এই দু’কারণেই অস্থিরতা বোধ করে বললেন ডল্লি।
