ওঁদের গাড়ির কাছে গিয়ে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা নিরুত্তাপ সম্ভাষণ জানালেন প্রিন্সেস ভারভারাকে। সি্ভ্য়াজ্স্কির সাথেও আগে পরিচয় ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন তরুণী ভার্যার সাথে কেমন দিন কাটছে তাঁর ক্ষেপাটে বন্ধুর। তারপর চকিত দৃষ্টিপাতে বেজোড় ঘোড়া আর মাডগার্ডে তালি-মারা লেভিনের গাড়িটা লক্ষ্য করে প্রস্তাব দিলেন যে মহিলারা যাবেন ভ্রন্স্কির গাড়িতে।
বললেন, ‘আর আমি যাব ওই মহারথে। ভ্রন্স্কির ঘোড়াটা বাধ্য, প্রিন্সেসও চমৎকার সারথি।’
‘না, যেখানে ছিলেন, সেখানেই থাকুন’, ওঁদের কাছে এসে আন্না বললেন, ‘আমরা যাব এই গাড়িতে’, আর ডল্লিকে বাহুলগ্না করে নিয়ে গেলেন তাঁকে।
এরকম মনোহর গাড়ি দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা আগে কখনো দেখেননি। চোখ তাঁর ধাঁধিয়ে দিলে গাড়িটা : চমৎকার ঘোড়াগুলো, জ্বলজ্বলে সুশ্রী এই যে মুখগুলো তাঁকে পরিবেষ্টিত করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি তাঁকে চমৎকৃত করল তাঁর পরিচিতা, প্রিয়পাত্রী আন্নার মধ্যেকার পরিবর্তনটা। অন্য কোন নারী যিনি কম মনোযোগী, আন্নাকে যিনি আগে চিনতেন না, বিশেষ করে পথে আসতে আসতে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা যেসব ভাবনা ভেবেছেন তা যিনি ভাবেননি, তিনি আন্নার মধ্যে অসাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্যের সন্ধান পেতেন না। কিন্তু শুধু প্রেমাবেগের মুহূর্তে নারীর মধ্যে যে একটা সাময়িক রূপোচ্ছ্বাস দেখা দেয়, সেটা এখন আন্নার মুখে দেখতে পেয়ে অভিভূত হলেন ডল্লি। সে মুখের সব কিছু—গালে আর থুতনিতে সুস্পষ্ট টোল, ঠোঁটের ভাঁজ, যেন তাঁর মুখ ঘিরে ভাসমান হাসি, চোখের ছটা, ভাবভঙ্গির চারুতা ও ক্ষিপ্রতা, কণ্ঠস্বরের পূর্ণতা, এমন কি ভেস্লোভস্কি যখন তাঁর কর্ ঘোড়াটাকে চেয়েছিলেন ডান পা বাড়িয়ে কদমে ছোটা শেখাবার জন্য, তখন যে সস্নেহ রাগে তিনি জবাব দিয়েছিলেন—সবই ভারি মন টানছিল; এবং মনে হল আন্না নিজেই সেটা জানেন আর তাতে খুশি।
দুজনেই যখন গাড়িতে উঠলেন, হঠাৎ কেমন অস্বস্তি লাগল দুজনেরই। ডল্লি যে মনোযোগী, জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইছিলেন তাঁর দিকে, তাতে অস্বস্তি বোধ করছিলেন আন্না; আর মহারথ নিয়ে সি্ভ্য়াজ্স্কির খোঁটাটার পরেও যে এই পুরানো, নোংরা গাড়িটাতেই আন্না বসলেন তাঁর পাশে, সে জন্য আপনা থেকেই লজ্জা হচ্ছিল ডল্লির। কোচোয়ান ফিলিপ আর মুহুরিরও সেই রকম লাগছিল। মুহুরি তার অস্বস্তি চাপা দেবার জন্য শশব্যস্ত হয়ে উঠল মহিলাদের গাড়িতে বসাতে। কিন্তু কোচোয়ান ফিলিপ মুখ ভার করে তৈরি হতে লাগল বাহ্যিক এই চমৎকারিত্বকে পাত্তা না দেবার জন্য। কালো ঘোড়াটার দিকে তাকিয়ে সে হাসল ব্যঙ্গভরে। মনে মনে স্থির করল গাড়ির কালো ঘোড়াটা লোক- দেখানোর জন্যই ভালো। কিন্তু এই গরমে এক দফায় চল্লিশ ভার্স্ট পাড়ি দিতে পারবে না।
চাষীরা সবাই উঠে দাঁড়িয়ে উৎসুক হয়ে দেখতে লাগল এই অতিথিবরণ আর ফুর্তিতে মন্তব্য করতে লাগল নিজেদের মধ্যে।
‘বড় খুশি, অনেক দিন দেখা-সাক্ষাৎ নাই যে’, বলল বার্চ ছালের ফালি বাঁধা কোঁকড়া-চুলো বুড়ো।
‘গেরাসিম চাচা, ঐ কালো ঘোড়াটাকে দিয়ে খড় বওয়ালে হত, ফুর্তিতে খাটত!’
আরে দেখ-দেখ, প্যান্ট পরা এটা কি মহিলা?’ একজন বলল ভাসেকা ভেস্লোভস্কিকে দেখিয়ে, আন্নার মেয়েলী
জিনে চেপে বসেছিলেন তিনি।
‘না-না, পুরুষ! দেখো কেমনে উঠে বসল!’
‘কি হে, ঘুম আর হবে না দেখছি?’
বুড়ো তির্যক দৃষ্টিতে সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আজ আর কিসের ঘুম! দেখছিস, বেলা দুপুর পেরিয়ে গেছে হুকগুলো নিয়ে চলে যাও!’
আঠারো
ডল্লির শীর্ণ, পীড়িত মুখ, বলিরেখাগুলোয় রাস্তার ধুলো জমেছে। তা দেখে আন্নার কি মনে হয়েছিল, তা বলতে যাচ্ছিলেন তিনি, যথা—ডল্লির দৃষ্টি সেটা তাঁকে জানিয়েছে, এটা মনে পড়ায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে আন্না নিজের কথা বলতে লাগলেন। বললেন, ‘আমাকে দেখে তুমি ভাবছ আমার অবস্থায় আমি সুখী হতে পারি কি? তা কি করা যাবে! স্বীকার করতে লজ্জা হচ্ছে, কিন্তু আমি… আমি অমার্জনীয় রকমের সুখী। কি-একটা অলৌকিক ব্যাপার ঘটেছে আমার। যেমন স্বপ্ন যখন হয়ে উঠেছে ভয়াবহ, সাংঘাতিক, তখন হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখা যায় যে ভয়টয় কিছু নেই। আমি ঘুম ভেঙে উঠেছি। যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে, ভয়ের মধ্যে দিয়ে গেছি আমি, কিন্তু এখন অনেকদিন থেকে, বিশেষ করে এখানে আমরা যত দিন থেকে আছি, আমি ভারি সুখী!’ তিনি ডল্লির দিকে তাকিয়ে প্রশ্নের একটা ভীরু হাসি নিয়ে বললেন।
‘ভীষণ আনন্দ হচ্ছে’, হেসে ডল্লি বললেন। তবে যা চেয়েছিলেন সুরটা হল তার চেয়ে নিরুত্তাপ; ‘তোমার জন্যে খুবই আনন্দ হচ্ছে আমার। কিন্তু আমাকে চিঠি লিখলে না কেন?’
‘কেন?… কারণ সাহস হয়নি। আমার অবস্থাটা কি তা তুমি ভুলে যাচ্ছ…’
‘আমার কাছে চিঠি লিখতে? সাহস হল না? যদি জানতে আমি কতটা… আমি মনে করি…’
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার ইচ্ছা হয়েছিল আজ সকালে যা ভাবছিলেন সেটা বলবেন, কিন্তু এখন কেন জানি মনে হল তা বলার সময় এটা নয়।
‘তবে ও-কথা পরে হবে। এসব ঘরবাড়িগুলো কিসের?’ প্রসঙ্গ বদলাবার জন্য অ্যাকেসিয়া আর লাইলাক ঝোপের ফাঁক দিয়ে যে লাল আর সবুজ চালগুলো চোখে পড়ছিল তা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, ‘ঠিক যেন একটা শহর।’
