‘বাড়িতেই থাকবে বৈকি’, ধুলোয় পাঁচ আঙুল সমেত পরিষ্কার ছাপ ফেলে এ-পা ও-পায়ে চাষীটি বলল, ‘থাকবে বৈকি’, পুনরাবৃত্তি করল সে। বোঝা যাচ্ছিল তার কথা চালিয়ে যাবার ইচ্ছে হচ্ছে। ‘কাল আবার অতিথি এসেছিল।
কত যে অতিথি!… কি হল তোর?’ গাড়ি থেকে তার উদ্দেশে কি যেন চেঁচিয়ে বলছিল এক ছোকরা.। তার দিকে ফিরল সে, ‘ও হ্যাঁ, সবাই ইদিক দিয়ে গেছিল ফসল কাটা দেখতে। এতক্ষণে ঘরে ফেরার কথা। আর তোমরা কে হে বাপু?’
‘আমরা দূরের লোক’, কোচবক্সে উঠে কোচোয়ান বলল, ‘তাহলে দূর নয়?’
‘বলছি তো, এখানেই। যেই খানিক এগিয়ে যাবে…’ মাডগার্ডে হাত বুলোতে বুলোতে সে বলল।
গাঁট্টাগোঁট্টা বলিষ্ঠ চেহারার একটি ছোকরাও এগিয়ে এল। জিজ্ঞেস করল, ‘ফসল কাটার কাজ মিলবে নাকি?’
‘জানি না, বাছা।’
‘তাহলে বাঁয়ে ঘুরবে, তাহলেই পেয়ে যাবে’, বুড়ো বলল। স্পষ্টতই যারা এসেছে অনিচ্ছায় তাদের যেতে দিয়ে, তাদের সাথে কথা বলার ইচ্ছে হচ্ছিল তার।
কোচোয়ান গাড়ি ছাড়ল, কিন্তু ছাড়তে-না-ছাড়তেই চাষী চেঁচিয়ে উঠল : ‘এই থামাও! ওহে দাঁড়াও!’ চেঁচাচ্ছিল দুজন মিলেই।
কোচোয়ান গাড়ি থামাল।
‘ওনারাই আসছে’, রাস্তা দিয়ে আসা চারজন ঘোড়সওয়ার আর শকটে আরোহী দুজনকে দেখিয়ে বলল সে। এঁরা হলেন অশ্বপৃষ্ঠে ভ্রন্স্কি, তাঁর জকি, ভেস্লোভস্কি আর আন্না। গাড়ির ভেতরে ছিলেন প্রিন্সেস ভারভারা আর
সি্ভ্য়াজ্স্কি। তাঁরা বেড়াতে বেরিয়েছিলেন, সেই সাথে ফসল তোলার সদ্য কেনা যন্ত্রগুলো দেখতে।
ডল্লির গাড়ি থামতে সওয়ারিরা তাঁদের ঘোড়া চালাতে লগালেন পা-পা করে। সামনে আসছিলেন ভেস্লোভস্কির পাশাপাশি আন্না। শাস্ত কদমে আন্না আসছিলেন একটা বেঁটে পুরুষ্টু বিলাতি কর্ ঘোড়ায় চড়ে, তার কেশর ছাঁটা, লেজ খাটো। উঁচু টুপির নীচ থেকে বেরিয়ে আসা আন্নার কালো চুলে ভরা সুন্দর মাথা, সুডৌল স্কন্ধ, কালো রাইডিং-হ্যাবিটে ঘেরা ক্ষীণ কটি, এবং তাঁর সমস্ত শান্ত ললিত ঠাট বিস্মিত করল ডল্লিকে।
প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল আন্না যে ঘোড়ায় চেপে আসছেন সেটা অশালীন। ডল্লির চেতনায় মহিলাদের অশ্বারোহণ মিলে গিয়েছিল একটা তারুণ্যোচিত লঘু রঙ্গলীলার সাথে যেটা আন্নার অবস্থার সাথে খাপ খায় না; কিন্তু কাছ থেকে যখন তাঁকে ভালো করে দেখলেন, তৎক্ষণাৎ মেনে নিলেন তাঁর অশ্বারোহণ। লালিত্য ছাড়াও ভঙ্গিতে, পোশাকে, গতিবিধিতে সব কিছুই এমন সহজ, সৌম্য, মর্যাদাপূর্ণ যে তার চেয়ে স্বাভাবিক আর কিছুই হতে পারে না।
আন্নার পাশে পাশে স্কচ টুপির ফিতে উড়িয়ে ধূসর, তেজী একটা ক্যাভেলরি ঘোড়ায় মোটা পা সামনে এগিয়ে দিয়ে আসছিলেন ভেস্লোভস্কি। স্পষ্টতই নিজেকে নিয়ে তিনি মুগ্ধ। তাঁকে চিনতে পেরে মজা-পাওয়ার হাসিটা চাপতে পারলেন না দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা। তাঁদের পেছনে আসছিলেন ভ্রন্স্কি। তাঁর ঘোড়াটা মাদী, রং তার গাঢ়-পিঙ্গল, স্পষ্টতই কদমে ছোটায় সে উত্তেজিত। লাগাম টেনে ভ্রন্স্কি তাকে সংযত রাখছিলেন।
তাঁর পেছনে জকির উর্দিতে ছোটখাট একটি লোক। মস্ত এক কালো ঘোড়ায় নতুন গোছের একটা গাড়িতে সি্ভ্য়াজ্স্কি আর প্রিন্সেস ছাড়িয়ে গেলেন সওয়ারদের।
পুরানো গাড়িটার কোণে ছোট মূর্তিটা যে ডল্লির সেটা চিনতে পারা মাত্রই আন্নার মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল আনন্দের হাসিতে। চেঁচিয়ে উঠলেন আন্না, জিনের ওপর ছটফট করে উঠলেন, আবার ঘোড়া চালালেন কদমে। গাড়ির কাছে এসে কারো সাহায্য না নিয়েই লাফিয়ে নামলেন ঘোড়া থেকে। রাইডিং-হ্যাবিট খানিক উঁচু করে তুলে ধরে ছুটে গেলেন ডল্লির কাছে।
‘আমি ভাবছিলাম তুমি, আবার সাহসও হচ্ছিল না ভাবতে। কি আনন্দ! তুমি কল্পনা করতে পারবে না—কি আনন্দ হচ্ছে আমার!’ কখনো ডল্লির গালে গাল চেপে তাঁকে চুমু খেয়ে, কখনো তাঁর কাছ থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে হেসে তাঁকে লক্ষ করতে করতে বলছিলেন আন্না।
‘কি আনন্দ আলেক্সেই!’ বললেন তিনি ভ্রন্স্কির দিকে তাকিয়ে, ঘোড়া থেকে নেমে তিনি তাঁদের দিকে আসছিলেন।
ছাই রঙের উঁচু টুপি খুলে ভ্রন্স্কি এলেন ডল্লির কাছে।
‘আপনি এসেছেন বলে আমরা কি খুশি যে হয়েছি, ভাবতে পারবেন না’, প্রতিটি শব্দে বিশেষ তাৎপর্য আরোপ করে তিনি বললেন। হাসিতে দেখা গেল তাঁর ঘনসনদ্ধ সাদা দাঁত।
ভাসেকা ভেস্লোভস্কি ঘোড়া থেকে না নেমে টুপি খুলে মাথার ওপর সানন্দে রিবন দোলাতে সংবর্ধনা জানালেন অতিথিকে।
সুন্দর গাড়িখানা কাছে এলে ডল্লির চোখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে আন্না বললেন, ‘উনি প্রিন্সেস ভারভারা।’
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা বললেন, অ!’ অনিচ্ছাসত্ত্বেও মুখে তাঁর ফুটে উঠল অসন্তোষ।
প্রিন্সেস ভারভারা হলেন তাঁর স্বামীর চাচী। অনেকদিন থেকে তিনি তাঁকে জানেন কিন্তু শ্রদ্ধা করতেন না। তিনি জানতেন যে, সারা জীবন তিনি কাটিয়েছেন তাঁর ধনী আত্মীয়-স্বজনদের ঘাড়ে চেপে। কিন্তু উনি যে এখন রয়েছেন ভ্রন্স্কির ওখানে, যিনি তাঁর অনাত্মীয়, এতে ডল্লি অপমানিত বোধ করলেন উনি তাঁর স্বামীর আত্মীয় বলে। তাঁর মুখভাব লক্ষ করেছিলেন আন্না, বিব্রত বোধ করে লাল হয়ে উঠে তিনি রাইডিং-হ্যাবিটের খুঁট ছেড়ে দিলেন আর হোঁচট খেলেন তাতে।
