‘আর কত দূর, মিখাইল?’ ভয় পাওয়ানো চিন্তা থেকে মন সরাবার জন্য মুহুরিকে জিজ্ঞেস করলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা।
‘শুনেছি এই গ্রামটা থেকে সাত ভার্স্ট।’
গ্রামের রাস্তা দিয়ে গিয়ে গাড়ি উঠল একটা সাঁকোয়। সাঁকো দিয়ে উচ্চ কণ্ঠে ফুর্তিতে কথা বলতে বলতে আসছিল একদল হাসি-খুশি মেয়ে, কাঁধে আঁটি বাঁধার খড়ের দড়ি। সাঁকোর ওপর থেমে গিয়ে তারা উৎসুক হয়ে দেখতে লাগল গাড়িতে কে আছে। দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার দিকে যে মুখগুলি উত্তোলিত তা সবই সুস্থসবল, আমুদে, জীবনের আনন্দে তাঁকে খেপাচ্ছে বলে মনে হল তাঁর। মেয়েদের পেরিয়ে, একটা ঢিবিতে উঠে ঘোড়া আবার দুলকি চালে ছুটতে থাকল, পুরানো গাড়িটার নরম স্প্রিঙের ওপর প্রীতিপ্রদ দোলানিতে দুলতে দুলতে ডল্লির মনে হতে লাগল, ‘সবাই বেঁচে-বর্তে আছে, সবাই জীবন উপভোগ করছে। আর জ্বালা-যন্ত্রণায় মেরে-ফেলা এক দুনিয়া থেকে, এক জেলখানা থেকে ছাড়া পাওয়ায় আমার এখন চৈতন্য হল কেবল মুহূর্তের জন্যে। সবাই বেঁচে আছে: এই মেয়েরা, নাটালি বোন, ভারেঙ্কা, যার কাছে যাচ্ছি সেই আন্নাও, শুধু আমি নই।
‘অথচ লোকে আন্নাকে আক্রমণ করছে। কিসের জন্যে? আমি কি ওর চেয়ে ভালো? আমার অন্তত স্বামী আছে যাকে আমি ভালোবাসি। যেভাবে ভালোবাসতে আমার ইচ্ছে হয় সেভাবে না হলেও ভালোবাসি, আর আন্না তার স্বামীকে ভালোবাসত না। ওর দোষ কি? সে বেঁচে থাকতে চায়। সৃষ্টিকর্তা আমাদের প্রাণে এই বাসনাটা দিয়ে রেখেছেন। খুবই সম্ভব যে আমিও একই কাজ করতাম। ভয়ংকর সেই সময়টায় আন্না যখন মস্কোয় আসে তখন তাঁর কথা শুনে ভালো করেছিলাম কিনা তা জানি না আজও। তখন স্বামীকে ত্যাগ করে নতুন জীবন শুরু করা উচিত ছিল আমার। সত্যি করে ভালোবাসতে আর ভালোবাসা পেতে পারতাম আমি। এখন কি কিছু ভালো হয়েছে? ওকে আমি শ্রদ্ধা করি না। ওকে আমার দরকার’, স্বামী সম্পর্কে ভাবলেন তিনি, ‘তাই সহ্য করে যাই। এটা কি ভালো হয়েছে? তখনো লোকের চোখে ধরে যেতে পারতাম আমি, তখনো রূপ ছিল আমার’, ভেবে চললেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা। তাঁর ইচ্ছে হচ্ছিল আয়নায় নিজে চেহারাটা দেখেন। ব্যাগে তাঁর ভ্রমণোপযোগী আয়না ছিল, ইচ্ছে হচ্ছিল সেটা বের করবেন; কিন্তু কোচোয়ান আর মুহুরির দোদুল্যমান পিঠ দেখে তিনি টের পেলেন ওদের কেউ যদি তাকিয়ে দেখেন তাঁর দিকে, তাহলে তিনি লজ্জা পাবেন, তাই বের করলেন না আয়না।
কিন্তু আয়নায় মুখ না দেখেও তাঁর মনে হল এখনো তত দেরি হয়ে যায়নি। কজ্নিশেভকে মনে পড়ল তাঁর, যিনি তাঁর প্রতি বিশেষ সৌজন্য দেখিয়েছেন আর স্তিভার বন্ধু তুরোভ্ৎসিন, স্কার্লেট জ্বরের প্রকোপটার সময় যিনি তাঁর ছেলেমেয়েদের সেবা-যত্ন করেছেন, প্রেমে পড়েছিলেন ডল্লির। আরো ছিল অতি তরুণ একটি ছেলে, সমস্ত বোনদের মধ্যে ডল্লিই সবচেয়ে সুন্দর, রসিকতা করে স্বামী এই যে কথাটা বলেছিলেন, সেও মনে করত তাই। দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল অতি উদ্দাম এবং অসম্ভব সব ভালোবাসার ছবি। ‘চমৎকার কাজ করেছে আন্না, আমি তাকে ছি-ছি করতে যাব না। সে সুখী, অন্য একজনকে সুখ দিচ্ছে। আমার মত বিধ্বস্ত নয়, আর আমি নিঃসন্দেহ যে বরাবরের মত তেমনি সে তাজা, বুদ্ধিমতী, সকলের কাছে খোলামেলা’, ভাবলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা, এবং একটা শয়তানি হাসিতে তাঁর ঠোঁট কুঞ্চিত হয়ে উঠল। সেটা এজন্য যে আন্নার প্রণয়লীলার কথা ভাবতে গিয়ে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা তারই সমান্তরালে নিজেকে দেখছিলেন সমষ্টিভূত এক কল্পিত পুরুষের সাথে প্রায় একই রকম এক প্রেমে যে ভালোবাসছে তাঁকে। আন্নার মত তিনিও স্বামীকে সব কিছু খুলে বলেছেন। আর তাঁর মুখে অবলোনস্কির বিস্ময় ও হতবুদ্ধিতাই হাসি ফুটিয়েছিল।
এ রকম স্বপ্ন দেখতে দেখতে বড় সড়ক থেকে তিনি বাঁক নিলেন অন্য একটা রাস্তায় যা ভজ্দ্ভিজেনস্কয়েতে গেছে।
সতেরো
তার ঘোড়ার গাড়ি থামিয়ে কোচোয়ান ডানে তাকিয়ে দেখল রাই ক্ষেতের দিকে যেখানে একটা গাড়ির কাছে বসে ছিল চাষীরা। মুহুরি লাফিয়ে নামতে যাচ্ছিল, কিন্তু মত বদলিয়ে কর্তৃত্বের সুরে চেঁচিয়ে হাতছানি দিয়ে চাষীকে নিজের কাছে ডাকল। গাড়ি চলার সময় যে বাতাস বইছিল, গাড়ি থামতে তা মরে এল। ঝাঁক বেঁধে ডাঁশ মাছিগুলো ছেঁকে ধরল ঘর্মাক্ত ঘোড়াদের, যারা রেগে তাড়াবার চেষ্টা করছিল তাদের। কাস্তেয় শান দেবার যে ধাতব শব্দ আসছিল গাড়িটার কাছ থেকে, তা থেমে গেল। একজন চাষী উঠে দাঁড়িয়ে এদিকে আসতে থাকল।
‘ইস, ভেঙে পড়েছ দেখছি’, স্বল্পব্যবহৃত রাস্তার বিশুষ্ক চাঙড়গুলোর ওপর ধীরে ধীরে নগ্ন পা ফেলে আসছিল চাষীটা। ক্রুদ্ধ কণ্ঠে তার উদ্দেশে চেঁচাল মুহুরি, ‘পা চালিয়ে!’
বুড়োর কোঁকড়া চুল বার্চ ছালের ফালি দিয়ে বাঁধা। ঘামে কালো হয়ে উঠেছে কুঁজো পিঠ। গতি বাড়িয়ে সে এল গাড়ির কাছে, রোদে পোড়া হাতে মাডগার্ড ধরল।
‘ভজ্ভিজেনস্কয়ে মহালবাড়িতে? কাউন্টের কাছে?’ বলল সে। ‘সোজা এগিয়ে যাও, বাঁয়ে মোড় দিয়ে গলি ধরে গেলেই পেয়ে যাবে। কার কাছে তোমাদের আসা হল? ওনার কাছেই?’
‘ওঁরা বাড়িতে আছেন নাকি, বাবাজি?’ অনির্দিষ্টভাবে জিজ্ঞেস করলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা। ভেবে পাচ্ছিলেন না চাষীটার কাছেও আন্নার কথা বলবেন কিভাবে।
