সি্ভ্য়াজ্স্কির কাছে যাবার সময় লেভিন যে ধনী চাষী গেরস্তের বাড়িতে থেমেছিলেন সেখানে চা খেয়ে, মেয়েদের সাথে ছেলেপুলেদের গল্প করে আর বৃদ্ধের সাথে কাউন্ট ভ্রন্স্কিকে নিয়ে আলাপ করে (যাঁর খুবই প্রশংসা করল বৃদ্ধ), বেলা দশটার সময় দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার গাড়ি আবার এগিয়ে চলল। ছেলেমেয়েদের নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বাড়িতে তাঁর ভাবনা-চিন্তার সময় হত না। কিন্তু যে ভাবনাগুলো আগে তিনি ঠেকিয়ে রেখেছিলেন হঠাৎ তা সব এল ভিড় করে। নিজের গোটা জীবনটা নিয়ে তিনি ভাবলেন এবং নানা দিক থেকে, যা তিনি আগে কখনো ভাবেননি। তাঁর নিজের কাছেই অদ্ভুত ঠেকছিল চিন্তাগুলো। প্রথমে ভাবনা হয়েছিল ছেলেমেয়েদের জন্য, যদিও মা এবং প্রধান কথা কিটি (তার ওপরেই ওঁর বেশি ভরসা) কথা দিয়েছিলেন যে ওদের দেখাশোনা করবেন, তাহলেও দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। ‘মাশা আবার দুষ্টুমি শুরু না করে, গ্রিশাকে চাঁট না মারে ঘোড়া, লিলির পেট যেন আর বেশি খারাপ না হয়।’ কিন্তু পরে বর্তমানের স্থান নিতে লাগল ভবিষ্যৎ প্রশ্ন। তিনি ভাবতে শুরু করলেন এই শীতকালের জন্য মস্কোতে নতুন বাসা ভাড়া নেওয়া যায় কিভাবে। ড্রয়িং-রুমের আসবাবপত্র বদলাতে হবে, বড় মেয়ের জন্য বানাতে হবে নতুন ফার-কোট। পরে আরো দূর-ভবিষ্যতের প্রশ্ন উঠতে লাগল তাঁর মনে : ছেলেমেয়েদের কিভাবে তিনি মানুষ করে তুলবেন। মেয়েদের জন্যে নয় তেমন ভাববার কিছু নেই, কিন্তু ছেলেদের?
‘বেশ, গ্রিশাকে আমি এখন শিক্ষা দিচ্ছি। কিন্তু সে তো কেবল এজন্য যে আমি নিজেই এখন ফাঁকা, ছেলেমেয়ে বিয়োচ্ছি না। বলাই বাহুল্য যে, স্তিভার ওপর কোন ভরসা করা যায় না। সজ্জন লোকদের সাহায্যে আমিই মানুষ করে তুলব ওদের। কিন্তু যদি আবার সন্তান হয়…’ তাঁর মাথায় এই চিন্তাটা এল যে যন্ত্রণায় সন্তানের জন্ম দিতে হবে মেয়েদের, লোকে বলে সেটা নাকি অভিশাপ, এটা বড় ভুল। ‘জন্ম দেওয়াটা কিছু নয়, কিন্তু গর্ভধারণ করা—এটাই হল যন্ত্রণার ব্যাপার’, নিজের শেষ গর্ভাবস্থা আর এই শেষ সন্তানটির মৃত্যুর ঘটনাটা কল্পনা করে ভাবলেন তিনি। তাঁর মনে পড়ল সরাইখানায় যুবতী মেয়েটার সাথে তাঁর আলাপের কথা। তার ছেলেমেয়ে আছে কিনা জিজ্ঞেস করায় সুন্দরী যুবতীটি ফুর্তির সুরে বলেছিল, ‘খুকি ছিল একটি, সৃষ্টিকর্তা নিয়ে নিলেন। লেন্ট পরবের সময় গোর দিয়েছি!
‘খুব কষ্ট হয় না?’ জিজ্ঞেস করেছিলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা।
‘কষ্ট হবে কেন? এমনিতেই বুড়োর নাতিপুতি অনেক, শুধু ঝামেলা বাড়ে। কাজ নেই, কর্ম নেই, হাত বাঁধা।’ যুবতীটির মন-খোলা মিষ্টত্ব সত্ত্বেও দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার কাছে জঘন্য লেগেছিল জবাবটা; কিন্তু এখন আপনা থেকেই মনে পড়ল কথাগুলো। ধৃষ্ট এই উক্তিটায় সত্যের একটা ভাগও আছে যেন।
পনের বছরের গোটা এই বিবাহিত জীবনটায় দৃষ্টিপাত করে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা ভাবলেন, ‘সত্যি, সাধারণভাবেই তাই। গর্ভধারণ, বিবমিষা, ভোঁতা বুদ্ধি, সব কিছুতে ঔদাসীন্য, আর সবচেয়ে বড় কথা কদাকার চেহারা। কিটি, রূপসী তরুণী কিটি—তারও রূপ গেছে, আর আমি গর্ভবতী হলে যে কদর্য হয়ে উঠি তা আমি জানি। প্রসব যন্ত্রণা, বিকট যন্ত্রণা, শেষ ঐ মুহূর্তটা… তারপর মাই দেওয়া, রাত জাগা, ভয়াবহ ঐ যন্ত্রণা…’
প্রায় প্রতিটি প্রসবেই তাঁর স্তনবৃন্ত যে ফেটে গিয়েছে, সেই যন্ত্রণার কথাটা শুধু মনে পড়তেই শিউরে উঠলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা। ‘তারপর ছেলেমেয়েদের অসুখ-বিসুখ, অবিরাম একটা আতংক; তারপর লালন-পালন, বিছিরি প্রবৃত্তি (র্যাম্পবেরি ভুঁইয়ে ছোট্ট মাশার অপরাধটার কথা মনে পড়ল তাঁর), তারপর পড়ানো, লাতিন—এ সবই অতি দুর্বোধ্য, কষ্টকর। তার ওপর আবার এসব সন্তানের মৃত্যু’। আবার তাঁর মনে জেগে উঠল তাঁর মাতৃহৃদয়কে নিরন্তর মথিত করা শেষ সন্তানটির মৃত্যুর নির্মম স্মৃতি, কোলের ছেলে ছিল সে, মারা যায় ঘুংরি কাশিতে, মনে পড়ল তার অন্ত্যেষ্টি, ছোট্ট গোলাপী কফিনে বন্ধ করা হচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে তার বিবর্ণ ললাট, রগের কাছে চুলের কুণ্ডলী, কফিন থেকে হাঁ-করে থাকা ছোট্ট যে মুখখানা দেখা গিয়েছিল তাতে শুধু তাঁরই বুক-ফাটা নিঃসঙ্গ যন্ত্রণা।
‘অথচ কেন এসব? কি হবে এসব থেকে? শুধু এই যে ক্ষণেকের শান্তি না পেয়ে কখনো গর্ভবতী, কখনো স্তন্যদাত্রী হয়ে সব সময় খিটখিটে গজগজে আমি, স্বামীর চক্ষুশূল, নিজে জ্বলেপুড়ে, অন্যদের জ্বালিয়ে নিজের জীবনটা কাটিয়ে দেব আর সংসারে নিয়ে আসব হতভাগ্য, কুশিক্ষিত কপর্দকহীন কয়েকটি সন্তান। আর এখন গ্রীষ্মটা লেভিনদের ওখানে না থাকলে কি করে দিন কাটত জানি না। বলাই বাহুল্য, কিটি আর কস্তিয়া এতই মার্জিত যে আমাদের সেটা মনে করতে দেয় না; কিন্তু এভাবে তো আর চলতে পারে না। ওদেরও ছেলেমেয়ে হবে, আমাদের সাহায্য করার জো থাকবে না; এমন কি এখনই টানাটানি চলছে ওদের। তাহলে সাহায্য করবেন কি বাবা, যিনি নিজের বলতে কিছু বাকি রাখেননি? নিজে আমি ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে পারব না, হলে হবে অন্যদের সাহায্যে, হীনা সয়ে। সবচেয়ে সৌভাগ্যের কথাটাই যদি ধরি, ছেলেমেয়েরা আর মরছে না, আমি কোনরকম করে তাদের মানুষ করে তুলছি, তাহলে বড় জোর তারা দুরাত্মা হয়ে উঠবে না। শুধু এইটুকুই কামনা করতে পারি আমি। শুধু এর জন্যেই কত কষ্টস্বীকার, কত মেহনত… গোটা জীবনটাই নষ্ট হল!’ আবার তাঁর মনে পড়ল যুবতীটির কথা এবং আবার সেটা স্মরণ করতে বিছ্ছিরি লাগল তাঁর। কিন্তু তিনি না মেনে পারলেন না যে কথাগুলোয় খানিকটা রূঢ় সত্য আছে।
