বরাবরের মত নির্মলতা আর স্নিগ্ধতার একটা প্রীতিকর অনুভূতি নিয়ে–যা এসেছে অংশত সারা সন্ধ্যে তিনি ধূমপান করেননি বলে এবং সেইসাথে তাঁর প্রতি কিটির ভালোবাসায় তাঁর মন গলে যাবার একটা নতুন অনুভূতি থেকে–শ্যেরবাৎস্কিদের ওখান থেকে বেরিয়ে ভ্রনস্কি ভাবছিলেন, ‘সবচেয়ে যেটা অপূর্ব, সেটা আমরা কেউ কিছু বলিনি। কিন্তু দৃষ্টিপাত আর কথার ধ্বনিভঙ্গির এই অদৃশ্য কথোপকথনে আমরা পরস্পরকে এত বুঝতে পেরেছি যে কথাটা সে মুখ ফুটে যদি বলতও, তার চেয়েও আজ পরিষ্কার হয়ে গেছে যে আমাকে সে ভালোবাসে। আর কি মধুর, সহজ, এবং বড় কথা, আস্থায় তা ভরা! আমি নিজেই নিজেকে অনুভব করছি আরো ভালো, আরো নির্মল বলে। আমি অনুভব করছি যে আমার একটা হৃদয় আছে, অনেক ভালো কিছু আছে আমার ভেতর। কি মিষ্টি প্রেমাকুল চোখ। যখন সে বলল : খুবই…’
‘তা কি হল? কিছুই না। আমারও ভালো লাগছে। ওরও ভালো লাগছে। তারপর সন্ধেটা কোথায় শেষ করা যায় এই নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলেন তিনি। ক্লাবে? এক হাত বেজিক খেলা, ইনাতভের সাথে শ্যাম্পেন? না, যাব না। Chateau des fleurs, সেখানে থাকবে অবলোনস্কি, গান, ক্যানক্যান নাচ। উঁহু, বিরক্তি ধরে গেল। শ্যেরবাৎস্কিদের আমি এই জন্যই ভালোবাসি যে নিজেই আমি ভালো হয়ে উঠি। ঘরেই ফেরা যাক।তিনি সোজা গেলেন দ্যুসসো হোটেলে নিজের কামরায়। ঘরে নৈশাহার আনতে বললেন, তারপর ধরাচুড়া খুলে বালিশে মাথা ঠেকাতে-না-ঠেকাতেই বরাবরের মত তার গভীর শান্ত ঘুমে ঢলে পড়লেন।
সতেরো
মাকে আনার জন্য প্রস্কি গেলেন পিটার্সবুর্গ রেল স্টেশনে–পরদিন বেলা এগারোটায় আর বড় সিঁড়িতে প্রথম যাকে দেখলেন তিনি অবলোনস্কি, এসেছেন বোনের জন্য, তিনি একই ট্রেনে আসছেন।
‘আরে হুজুর যে!’ চেঁচিয়ে উঠলেন অবলোনস্কি, কাকে নিতে এসেছ?
মাকে’, অবলোনস্কির সাথে দেখা হলে সবারই মুখে হাসি ফোটে, ভ্ৰস্কিও হেসে করমর্দন করে একসাথে উঠতে লাগলেন সিঁড়ি দিয়ে, পিটার্সবুর্গ থেকে আজ ওঁর আসার কথা।’
‘ওদিকে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি রাত দুটো পর্যন্ত। শ্যেরবাৎস্কিদের ওখান থেকে গিয়েছিলে কোথায়?
‘হোটেলে’, বললেন ভ্রনস্কি, ‘স্বীকারই করছি, কাল শ্যেরবাৎস্কিদের ওখান থেকে মনটা এত ভালো লাগছিল যে কোথাও যাবার ইচ্ছে হল না।’
‘দৌড়বাজ ঘোড়াকে চেনা যায় তার গায়ে দাগা মার্কা দেখে, আর প্রেমিক যুবককে চেনা যায় তার ভাবাকুল চোখ দেখে, ঘোষণা করলেন অবলোনস্কি, ঠিক আগে যেমন করেছিলেন লেভিনের কাছে।
ভ্রনস্কি এমন ভাব করে হাসলেন যেন এতে তিনি আপত্তি করছেন না। কিন্তু তৎক্ষণাৎ আলাপের প্রসঙ্গ পালটালেন।
জিজ্ঞেস করলেন, আর তুমি কাকে নিতে এসেছ?
অবলোনস্কি বললেন, ‘আমি? আমি এসেছি একটা সুন্দরী মহিলার জন্য।
বটে!
ফরাসি ভাষায় বললেন, এটা যে খারাপভাবে বোঝে, ধিক তাকে! বোন আন্নার জন্য।
ভ্রনস্কি বললেন, ‘ও, কারেনিনা?’
‘তুমি নিশ্চয় চেনো?’
মনে হচ্ছে চিনি। কিন্তু বোধ হয় না… সত্যি ঠিক মনে নেই, অন্যমনস্কভাবে বললেন ভ্রনস্কি, কারেনিনা নামটার সাথে সাথে কি-একটা যেন কাটখোট্টা আর একঘেয়ে তার কল্পনায় আবছা ভেসে উঠেছিল।
‘কিন্তু আমার নামজাদা ভগ্নিপতি কারেনিনকে জানো নিশ্চয়। সারা দুনিয়া তাকে চেনে।
‘মানে ওই নামে চিনি, আর চোখের দেখায়। জানি তিনি বুদ্ধিমান, সুশিক্ষিত, এবং কি ধরনের যেন ধর্মপ্রাণ… তবে জানই তো এটা আমার… আমার এখতিয়ার নয়’, বললেন ভ্রনস্কি।
‘কিন্তু উনি অসাধারণ মানুষ ও একটু রক্ষণশীল, কিন্তু চমৎকার লোক’, অবলোনস্কি মন্তব্য করলেন, ‘চমৎকার লোক।
‘সে তো তাঁর পক্ষে ভালোই’, হেসে ভ্রনস্কি বললেন। আরে তুমি এখানে’, দরজার কাছে দাঁড়ানো মায়ের ঢ্যাঙা বৃদ্ধ খানসামাকে দেখে বললেন তিনি, ‘এদিকে এসো।’
সকলের কাছেই অবলোনস্কির যা আকর্ষণ তা ছাড়াও ভ্রনস্কি তাঁর প্রতি বিশেষ অনুরাগ বোধ করছিলেন আরো এই জন্য যে তিনি তাকে একত্রে ধরেছেন কিটির সাথে।
হেসে তার হাতটা নিয়ে ভ্রনস্কি বললেন, তাহলে কি, রবিবারে কিন্নরীপ্রধানার জন্য নৈশভোজ হচ্ছে?
‘অবশ্যই। আমি চাঁদা তুলছি। ও হ্যাঁ, কাল আমার বন্ধু লেভিনের সাথে পরিচয় হয়েছে? জিজ্ঞেস করলেন অবলোনস্কি।
হবে না মানে? কিন্তু কেন জানি উনি চলে গেলেন তাড়াতাড়ি।
‘ভারি ভালো লোক, বলে চললেন অবলোনস্কি, তাই না?
ভ্রনস্কি বললেন, ‘জানি না কেন সমস্ত মস্কোওয়ালাদের মধ্যে, অবশ্য যার সাথে কথা বলছি তিনি ছাড়া, রহস্য করে যোগ দিলেন তিনি, রুক্ষ কি-একটা যেন আছে। এই একেবারে উত্তেজিত, ক্রুদ্ধ, যেন সব কিছু দিয়ে টের পাওয়াতে চায় কি-একটা…’
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আছে বটে, সত্যি আছে…’, ফুর্তিতে হেসে উঠলেন অবলোনস্কি।
‘কি, শিগগিরই আসছে কি?’ রেল কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করলেন ভ্রনস্কি।
‘ট্রেন আসছে’, জবাব দিল সে।
ট্রেন যত কাছিয়ে আসে ততই তোড়জোড় শুরু হয়ে যায় স্টেশনে, ছুটোছুটি করে মুটেরা, দেখা দেয় সশস্ত্র পুলিশ আর কর্মচারী, এগিয়ে যায় যারা আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবদের জন্য এসেছিল। হিমেল ভাপের মধ্যে দিয়ে দেখা যাচ্ছিল ভেড়ার চামড়ার খাটো কোট আর ফেল্টের নরম হাই-বুট পরা মজুরেরা বাকা রেল লাইন ডিঙিয়ে যাচ্ছে। শোনা গেল দূরের লাইনে ইঞ্জিনের হুইসিল আর ভারী কি-একটা চলাচলের আওয়াজ।
