কিন্তু মাছিটা লেভিনের যে জায়গাটায় কামড়িয়েছিল, বোঝা গেল সেটা তখনো টাটাচ্ছিল। কারণ অব্লোন্স্কি যখন ব্যাপারটা বোঝাতে চাইছিলেন তখন আবার বিবর্ণ হয়ে তিনি তাঁকে ঝট করে থামিয়ে দিয়ে বললেন : ‘দোহাই তোমার, বোঝাতে এসো না! আমি অন্য কিছু করতে পারি না! তোমার এবং ওর কাছে আমি খুবই লজ্জিত। কিন্তু আমার ধারণা যে, চলে যেতে হচ্ছে বলে ওর বড় একটা কষ্ট হবে না। কিন্তু আমার এবং আমার স্ত্রীর কাছে ওর উপস্থিতি অসহ্য।’
‘কিন্তু ওকে অপমান করা হয়েছে! আর তাছাড়া এটা হাস্যকর!’
‘আমার পক্ষেও অপমানকর, যন্ত্রণাকর! আমার কোন দোষ নেই। কষ্ট সইতে হবে এমন কোন কারণ নেই আমার।’
‘আমি তোমার কাছ থেকে এটা আশা করিনি! ঈর্ষা হতে পারে, তাই বলে এই মাত্রায়, এটা ভয়ানক হাস্যকর!’ লেভিন দ্রুত ওঁর কাছ থেকে বীথির গভীরে সরে গিয়ে সামনে-পেছনে পায়চারি করে চললেন। অচিরেই তারান্তাসের ঘর্ঘর শব্দ কানে এল তাঁর। গাছের ফাঁক দিয়ে দেখলেন যে ভাসেকা তাঁর স্কচ টুপি পরে খড়ের ওপর বসে (দুঃখের বিষয় গাড়িটায় গদি-আঁটা সীট ছিল না) রাস্তায় ধাক্কা খেয়ে লাফাতে লাফাতে চলে যাচ্ছেন।
‘এ আবার কি?’ বাড়ি থেকে ছুটে বেরিয়ে একটা চাকর গাড়িটা থামাতে অবাক হলেন লেভিন। এটা সেই জার্মান মেকানিক যার কথা লেভিন একেবারে ভুলে গিয়েছিলেন। মাথা নুইয়ে ভেস্লোভস্কিকে কি-একটা যেন সে বলে; তারপর গাড়িতে উঠে দুজনে চলে গেল।
লেভিনের এই কাণ্ডটায় অব্লোন্স্কি এবং প্রিন্স-মহিষী ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। লেভিন নিজেও নিজেকে চরম মাত্রায় হাস্যাস্পদ শুধু নয়, সম্পূর্ণ দোষী ও কলংকিত বলে বোধ করছিলেন। কিন্তু তিনি এবং তাঁর স্ত্রী যে কষ্ট সয়েছেন সে কথা মনে হওয়ায় দ্বিতীয়বার এরূপ ক্ষেত্রে তিনি কি করতেন, নিজেকে এ প্রশ্ন করে জবাব একই রকম দিলেন।
এসব সত্ত্বেও প্রিন্স-মহিষী, যিনি এ আচরণের জন্য লেভিনকে ক্ষমা করতে পারেননি তিনি ছাড়া দিনের শেষে সবাই হয়ে উঠল প্রাণবন্ত, হাসি-খুশি, শাস্তি থেকে মুক্তি পাবার পর যেমন হয়ে ওঠে শিশুরা, অথবা দুঃসহ একটা সরকারি অভ্যর্থনা সমাপ্তির পর বড়রা। ফলে সন্ধ্যায়, প্রিন্স-মহিষী না থাকলে ভাসেন্কার বিতাড়ন নিয়ে কথা হচ্ছিল যেন সেটা বহু আগেরকার একটা ঘটনা। পিতার কাছ থেকে ডল্লি পেয়েছিলেন রগড় করে কথা বলার গুণ। সবে অতিথির জন্য নতুন রিবন-টিবন পরে ড্রয়িং-রুমে যেতেই হঠাৎ তিনি শুনলেন চাকার ঘর্ঘর—আর কে গাড়িতে বসে আছে খড়ের ওপর? তা স্কচ টুপি, রোমান্স, লেগিংস নিয়ে স্বয়ং ভাসেকা। নতুন নতুন হাসির ফোড়ন দিয়ে তৃতীয় কি চতুর্থ বার এই গল্প করছিলেন ডল্লি আর হেসে লুটিয়ে পড়ছিল ভারেঙ্কা।
‘ভালো একটা গাড়িতেও তো বসাতে পারতে! তা নয়, পরে শুনলাম : ‘থামাও!’ ভাবলাম দয়া হয়েছে। ওমা, দেখি মোটা জার্মানটাকে তার পাশে বসিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল… আমার রিবনগুলো একেবারে পানিতে গেল!…‘
ষোলো
তাঁর সংকল্প পূর্ণ করলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা, আন্নার কাছে গেলেন। বোনকে দুঃখ দিতে আর তার স্বামীকে উত্ত্যক্ত করতে তাঁর খুবই কষ্ট হচ্ছিল। ভ্রন্স্কির সাথে কোন সম্পর্ক রাখতে না চেয়ে লেভিন দম্পতি যে ঠিকই করেছেন সেটা তিনি বুঝছিলেন; কিন্তু আন্নার অবস্থা বদলালেও তাঁর প্রতি ডল্লির মনোভাব যে বদলায়নি সেটা তাঁর কাছে গিয়ে দেখানো তাঁর কর্তব্য বলে তিনি মনে করেছিলেন।
এই যাত্রাটার জন্য লেভিনদের মুখাপেক্ষী থাকতে না চেয়ে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা ঘোড়া ভাড়া করার জন্য গাঁয়ে লোক পাঠান। সেটা জানতে পেরে ডল্লির কাছে এসে লেভিন তিরস্কার করলেন।
‘কেন ভাবছ যে, তুমি যাচ্ছ বলে বিছ্ছিরি আমার লাগছে? যদি বিছ্ছিরি লাগতও, তাহলেও আমার ঘোড়া নিচ্ছ না বলে বিছ্ছিরি লাগছে আরো বেশি’, বললেন তিনি, ‘আমাকে তুমি একবারও বলোনি যে তুমি যাবেই। আর গাঁয়ের লোকের কাছে ঘোড়া ভাড়ার করা—সেটা প্রথমত আমার পক্ষে অপ্রীতিকর আর সবচেয়ে বড় কথা, ওরা রাজি হয়ে যাবে বটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তোমাকে পৌঁছে দেবে না। আমার ঘোড়া আছে, আমার মনে দুঃখ দিতে না চাইলে আমার ঘোড়াগুলো নাও।’
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনাকে সম্মতি দিতে হল। নির্দিষ্ট দিনে শ্যালিকার জন্য লেভিন তৈরি রাখলেন তাঁর মাল- টানা ও সওয়ার-বওয়া ঘোড়াদের মধ্যে থেকে চারটা আর একটা মজুদ, দেখতে খুবই অসুন্দর, কিন্তু দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনাকে তারা পৌঁছে দিতে পারবে এক দিনেই। প্রিন্স-মহিষীকে পৌঁছে দেওয়া আর ধাই ডেকে আনার জন্য যখন ঘোড়ার দরকার হয়, লেভিন মুশকিলে পড়েছিলেন, কিন্তু দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা তাঁর বাড়িতে থাকলেও ঘোড়ার ভাড়া করবেন অন্য কোথা থেকে, আতিথেয়তার কর্তব্যবোধে এটা তিনি হতে দিতে পারেন না। তাছাড়া ঘোড়ার জন্য তাঁর কাছে যে বিশ রুব্ল চাওয়া হয়েছিল, সেটা তাঁর কাছে একটা মোটা টাকা বলে তিনি জানতেন; দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার আর্থিক অবস্থা যে অতি খারাপ সেটা লেভিন অনুভব করতেন যেন ওটা তাঁর নিজেরই অবস্থা।
লেভিনের পরামর্শ মত দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা রওনা দেন খুব ভোরে। রাস্তাটা ভালো, গাড়িটা আয়েসী, ফুর্তি করে ছুটল ঘোড়াগুলো। আর কোচবাক্সে কোচোয়ান ছাড়াও বসে রইল তাঁর সেরেস্তার মুহুরি, চাপরাশির বদলে একে লেভিন পাঠালেন নিরাপত্তার জন্য। দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা ঢুলতে লাগলেন, জেগে উঠলেন কেবল সরাইখানায় পৌঁছে, এখানে ঘোড়া বদলাবার দরকার ছিল।
