‘চল যাই, আমিও যাব’, বলে কিটি লাল হয়ে উঠল। ভাসেকাও যাবেন কিনা, সৌজন্যবশত এটা সে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল, কিন্তু করল না।
দৃঢ় পদক্ষেপে স্বামী যখন তার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, তখন দোষী-দোষী ভাব নিয়ে কিটি তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যাচ্ছ কস্তিয়া?’ এই দোষী-দোষী ভাবটায় সমর্থিত হল তাঁর সন্দেহ।
কিটির দিকে না তাকিয়ে লেভিন বললেন, ‘আমি যখন ছিলাম না, তখন মেকানিক এসে গিয়েছিল, অথচ আমার সাথে এখনো দেখা হয়নি।’
নিচে নেমে গেলেন তিনি, কিন্তু স্টাডি থেকে বেরোতেনা-বেরোতেই শুনলেন স্ত্রীর পরিচিত অসাবধান পায়ের আওয়াজ দ্রুত কাছিয়ে আসছে তাঁর দিকে।
‘কি ব্যাপার?’ তিনি শুকনো গলায় বললেন, ‘আমাদের কাজ আছে।’
জার্মান মেকানিককে কিটি বলল, ‘মাপ করবেন, স্বামীকে আমার কয়েকটা কথা বলার আছে।’
জার্মানটি চলে যাবার উপক্রম করছিল, কিন্তু লেভিন তাকে বললেন, ‘আপনি ব্যতিব্যস্ত হবেন না।’
‘ট্রেন তিনটার সময়?’ জিজ্ঞেস করল জার্মান, ‘আবার দেরি না হয়ে যায়।’
লেভিন কোন জবাব না দিয়ে স্ত্রীর সাথে বেরিয়ে গেলেন।
‘তা আপনি কি বলতে চান আমাকে?’ জিজ্ঞেস করলেন ফরাসিতে।
কিটির মুখের দিকে তিনি তাকালেন না, তার এই অবস্থায় সারা মুখ যে তার কাঁপছে, চেহারা হয়েছে করুণ, বিধ্বস্ত, সেটা দেখতে চাইছিলেন না।
‘আমি…আমি বলতে চাইছিলাম যে, এভাবে থাকা চলে না, এটা যন্ত্রণা…’ কিটি বলল।
‘বুফেতে লোক আছে’, তিনি ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘নাটক জমিয়ো না। ‘
‘তাহলে চল ওখানে যাই!’
ওঁরা দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রবেশ-কক্ষে, কিটি চাইছিল পাশের ঘরে যেতে কিন্তু সেখানে ইংরেজ গৃহশিক্ষিকা তানিয়াকে পড়াচ্ছে।
‘চল, বাগানে যাই!’
বাগানে পথ সাফ করছিল একটা মুনিষ, তার সম্মুখে পড়লেন তাঁরা। সে যে তার অশ্রুসিক্ত এবং স্বামীর অস্থির মুখ দেখতে পাচ্ছে সে কথা না ভেবে, ওঁদের চেহারা যে হয়েছে কোন-একটা দুর্ভাগ্য থেকে পলায়মান লোকের মত সে সম্পর্কে একটুও চিন্তা না করে ওঁরা দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলেন। অনুভব করছিলেন যে তাঁদের কথা বলে নিতে হবে, সন্দেহ নিরসন করতে হবে, একলা থাকতে হবে। দুজনেই যে যন্ত্রণায় ভুগছেন, তা থেকে পরিত্রাণ পেতে হবে। লিন্ডেন বীথির একটা কোণে নির্জন একটা বেঞ্চি পেয়ে কিটি বলল, ‘এভাবে বাঁচা চলে না! এ যে যন্ত্রণা! আমি কষ্ট পাচ্ছি, তুমিও কষ্ট পাচ্ছ। কিসের জন্যে?’
বুকে মুঠো চেপে যে ভঙ্গি তিনি সেদিন রাতে নিয়েছিলেন সেই ভঙ্গিতে কিটির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি শুধু আমাকে একটা কথা বল : ওর গলার সুরে অশোভন, অসাধু, অপমানকর-ভয়ংকর কিছু ছিল কি?’
কিটি কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল, ‘ছিল। কিন্তু কন্তিয়া, তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না যে আমার দোষ নেই? আমি সকাল থেকে চেয়েছিলাম এমন একটা ভাব করব, কিন্তু এসব লোক…কেন ও এল? কেমন সুখে ছিলাম আমরা!’ অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে সে বলল, ফোঁপানিটা কাঁপিয়ে দিচ্ছিল তার ভারী হয়ে ওঠা সারা শরীর।
তাঁদের যদিও কিছুই তাড়া করেনি, সুতরাং কোন কিছুর কবল থেকে পালাবার ছিল না, এবং বেঞ্চিটায় ওঁদের পক্ষে বিশেষ আনন্দের কিছু পাওয়া সম্ভব নয়। তাহলেও মালী অবাক হয়ে দেখল যে, ওঁরা তার কাছ দিয়ে প্রশান্ত জ্বলজ্বলে মুখে ঘরে ফিরছেন।
আন্না কারেনিনা – ৬.১৫
পনেরো
লেভিন স্ত্রীকে ওপরতলা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ডল্লির কাছে গেলেন। দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনারও সেদিন বড় দুঃখ। সারা ঘরে পায়চারি করে কোণে দণ্ডায়মান মেয়েটাকে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলছিলেন, ‘হ্যাঁ, সারা দিন ঐ কোণেই দাঁড়িয়ে থাকবি। খাবার খাবি একা-একা। তুই একটা পুতুলও পাবি না, নতুন ফ্রকও সেলাই করব না তোর জন্যে’, আরো কি করে শাস্তি দেওয়া যায় ভেবে না পেয়ে তিনি বলছিলেন।
তিনি লেভিনের দিকে ফিরে বললেন, ‘না, এটা একটা লক্ষ্মীছাড়া মেয়ে! এসব বিছ্ছিরি প্রবৃত্তি আসে কোত্থেকে?’
লেভিন বেশ নির্বিকারভাবেই বললেন, ‘কিন্তু সে কি করল?’ তিনি চেয়েছিলেন যে নিজের ব্যাপারটা নিয়ে কিছু পরামর্শ চাইবেন। তাই অসময়ে এসে পড়েছেন বলে বিরক্ত তাঁর লাগছিল।
‘গ্রিশার সাথে ও যায় র্যাম্পবেরি ভুঁইয়ে… আর সেখানে কি যে করেছে তা বলার নয়। মিস এলিয়টকে কতবার মাপ করে দিয়েছি, কিন্তু উনি কিছুই দেখেন না। একটা যন্ত্র …কল্পনা করুন, মেয়েটা…’, দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা এই বলে মাশার অপরাধ বর্ণনা করতে লাগলেন।
লেভিন প্রবোধ দিলেন, ‘এতে কিছুই প্রমাণ হয় না, এটা মোটেই বিছিরি প্রবৃত্তির লক্ষণ নয়। নেহাৎ দুষ্টুমি।’
‘কিন্তু তুমি কেমন যেন মনমরা? কেন এলে বল তো?’ জিজ্ঞেস করলেন ডল্লি, ‘ওখানে কি হচ্ছে?’
প্রশ্নের ধরনটা দেখে লেভিন বুঝলেন তিনি যা বলতে চাইছিলেন তা বলা সহজ হবে।
আমি ওখানে ছিলাম না, কিটির সাথে বাগানে গিয়েছিলাম। এই দ্বিতীয়বার আমাদের ঝগড়া হুল… যেদিন থেকে স্তিভা এসেছে।
বিজ্ঞ, বোদ্ধার দৃষ্টিতে ডল্লি তাঁর দিকে তাকালেন।
‘কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলো তো…কিটির দিক থেকে নয়, এই ভদ্রলোকটির আচরণে এমন কিছু কি ছিল, যা সম্ভবত স্বামীর কাছে অপ্রীতিকর। না, অপ্রীতিকর নয়। ভয়ংকর, অপমানকর?’
