‘কি আর হল, গৃহস্বামিনীর সাথে ওর কথা তো বলতে হয়’, মনে মনে ভাবলেন লেভিন। অতিথির হাসিতে, বিজয়ীর যে ভাব নিয়ে তিনি কথা বলছিলেন কিটির সাথে তার ভেতর আবার কি-একটা যেন নজরে পড়ল তাঁর 1
মারিয়া ভ্লাসিয়েভনা আর অব্লোন্স্কির সাথে প্রিন্স-মহিষী বসেছিলেন টেবিলের অন্য দিকটায়। লেভিনকে কাছে ডেকে তিনি প্রসবের জন্য কিটিকে মস্কো নিয়ে যাওয়া এবং ফ্ল্যাট ঠিকঠাক করা নিয়ে কথা পাড়লেন। বিয়ের সময় যেমন হয়েছিল আসনের মহিমার সামনে যে-কোন উদ্যোগ-আয়োজনই তার তুচ্ছতায় বিশ্রী লাগে লেভিনের কাছে, আর প্রসবের যে সময়টা সবাই কেমন যেন আঙুলে গুণে রেখেছে, তা তোড়জোড় তাঁর কাছে ঠেকল আরো অপমানকর। ভবিষ্যৎ শিশুকে কিভাবে কাঁথা জড়িয়ে রাখতে হবে, সে সব কথাবার্তায় কানে তালা দিয়ে রাখার চেষ্টা করলেন তিনি। অবিরাম বুনে চলা রহস্যময় কি সব ফালি, কি-সব সুতি ত্রিভুজ যাতে বিশেষ গুরুত্ব দেন ডল্লি। এসব না দেখার জন্য তিনি মুখ ফিরিয়ে নেবার চেষ্টা করলেন। পুত্রের যে জন্ম হবে বলে লোকে তাঁকে আশ্বাস দিয়েছে (তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছেলেই হবে), তাহলেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না—ঘটনাটা তাঁর কাছে মনে হচ্ছিল অতি অনন্যসাধারণ, এবং এক দিক থেকে এতই বিপুল সুতরাং অসম্ভাব্য একটা সুখ, অন্য দিক থেকে এতই রহস্যময় একটা ব্যাপার যে যা হতে চলেছে তা নিয়ে লোকদের কল্পিত একটা জ্ঞান আর সাধারণ একটা ব্যাপারের মত তার জন্য তোড়জোড় তাঁর কাছে মনে হচ্ছিল বিরক্তিকর, অপমানকর।
কিন্তু প্রিন্স-মহিষী তাঁর অনুভূতি বুঝছিলেন না। এ নিয়ে ভাবতে, কথা বলতে তাঁর অনিচ্ছাকে ধরে নিলেন লঘুচিত্ততা ও উদাসীনতার ফল, তাই শান্তি দিচ্ছিলেন না তাঁকে। ফ্ল্যাটটা দেখার ভার তিনি দিয়েছিলেন অব্লোন্স্কির ওপর আর এখন কাছে ডাকলেন লেভিনকে।
‘আমি কিছুই বুঝি না প্রিন্সেস। যা চান, করুন’, লেভিন বললেন।
‘তোমরা কখন আসছ, ঠিক করা দরকার।’
‘সত্যি, আমি জানি না। জানি যে লক্ষ লক্ষ শিশু জন্মাচ্ছে মস্কো এবং ডাক্তার ছাড়াই… তাহলে কেন…’
‘যদি তাই হয়…’
‘না-না, কিটি যা চাইবে তাই হবে।’
‘এ নিয়ে কিটির সাথে কথা বলা চলে না! তুমি কি চাও ওকে ভয় পাইয়ে দেব? এই তো, এই বছরেরই বসন্তে নাটালি গলিৎসিনা মারা গেল খারাপ ধাত্রীবিদ্যার জন্যে।’
‘আপনি যা বলবেন, আমি তাই করব’, বিমর্ষ মুখে বললেন লেভিন।
প্রিন্স-মহিষী কি-সব বলছিলেন ওঁকে, কিন্তু উনি শুনছিলেন না। প্রিন্স-মহিষীর কথাগুলো তাঁকে ক্ষুব্ধ করছিল, কিন্তু তিনি বিমর্ষ হয়েছিলেন তাঁর কথায় নয়, সামোভারের ওখানে যা ঘটছিল তা দেখে।
সুন্দর হাসি নিয়ে কিটির দিকে ঝুঁকে ভাসেকা কি যেন বলছেন তাকে আর বিচলিত কিটি যে লাল হয়ে উঠেছে, সেদিকে তাকিয়ে তিনি ভাবছিলেন, ‘না, এ অসম্ভব।’
ভাসেন্কার ভঙ্গিতে, তার দৃষ্টিতে, তার হাসিতে অসাধু কি-একটা যেন ছিল। লেভিন এমন কি কিটির ভঙ্গিতে আর দৃষ্টিতেও অসাধু কিছু-একটা দেখতে পেলেন। আবার তাঁর চোখে আঁধার নেমে এল। গতকালের মত আবার সুখ, প্রশান্তি, মর্যাদা থেকে হঠাৎ হতাশা, বিদ্বেষ, হীনতার অতলে নিক্ষিপ্ত বলে অনুভব করলেন নিজেকে। আবার সবাই এবং সব কিছু হয়ে উঠল তাঁর চক্ষুশূল।
‘যা চান তাই করুন প্রিন্সেস’, আবার ওঁদের দিকে দৃষ্টিপাত করে লেভিন বললেন।
‘মহারাজের উষ্ণীষ ধারণ বড় সহজ নয়’, রহস্য করে অব্লোন্স্কি বললেন তাঁকে, স্পষ্টতই ইঙ্গিতটা প্রিন্স-মহিষীর সাথে কথোপকথন নিয়ে শুধু নয়, তাঁর অস্থিরতার কারণ নিয়েও। যেটা তাঁর নজরে পড়েছিল, ‘আজ এত দেরি করলে যে ডল্লি!’
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনাকে সম্ভাষণের জন্য উঠে দাঁড়ালেন সবাই। ভাসেকা এক মিনিটের জন্য উঠে দাঁড়িয়ে মহিলাদের প্রতি সৌজন্যের যে অভাব নব্য যুবাদের প্রকৃতিগত তার পরিচয় দিয়ে সামান্য মাথা নুইয়ে আবার কথাবার্তা চালিয়ে গেলেন কি জন্য যেন হাসতে হাসতে।
‘মাশা আমাকে জ্বালিয়েছে। ভালো ঘুম হয়নি তার, আজ নানারকম জেদ ধরেছে কেবলি’, ডল্লি বললেন।
কিটির সাথে ভাসেকা যে কথাবার্তা শুরু করেছিলেন তা আবার চলতে থাকল গতকালের প্রসঙ্গ, আন্নার ব্যাপারটা আর প্রেম সামাজিক রীতিনীতির ঊর্ধ্বে হতে পারে কিনা তাই নিয়ে। এ আলাপটা কিটির ভালো লাগছিল না। তার বিষয়বস্তু এবং যে সুরে তা ব্যক্ত হচ্ছিল, দুয়েতেই অস্থির বোধ করছিল সে। বিশেষ করে এজন্য যে, এতে স্বামীর কি প্রতিক্রিয়া ঘটবে তা সে জানত। কিন্তু বড় বেশি সহজ-সরল হওয়ায় আলাপটা থামিয়ে দিতে, এমন কি এই যুবা পুরুষটির সুস্পষ্ট মনোযোগে সে যে একটা বাহ্যিক তুষ্টিলাভ করছে, সেটা পর্যন্ত লুকাতে পারছিল না। কথাবার্তাটা বন্ধ করতেই সে চাইছিল, কিন্তু জানত না কি করতে হবে তাকে। যা-ই সে করুক, স্বামী যে সেটা লক্ষ করবেন এবং সব কিছুরই একটা খারাপ অর্থ করা হবে তা সে জানত। এবং কিটি যখন ডল্লিকে জিজ্ঞেস করল, মাশার কি হয়েছে আর ভাসেন্কার কাছে নীরস এই আলাপটা শেষ হবার অপেক্ষায় উদাসীন দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে রইলেন ডল্লির দিকে, তখন সত্যিই লেভিনের মনে হল যে প্রশ্নটা স্বাভাবিক নয়, কদর্য একটা চালাকি।
ডল্লি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি, আজ ব্যাঙের ছাতা তুলতে যাব?’
