ঊনিশটা শাঁসালো পাখি নিয়ে বেলা নয়টার পর ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, আনন্দিত লেভিন তিরিশ ভার্স্ট পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফিরলেন। একটা হাঁস থলেয় ঢোকানো যায়নি বলে সেটাকে তিনি ঝুলিয়ে নিয়েছিলেন তাঁর বেল্টে। তাঁর সঙ্গীদের ঘুম ভেঙেছে অনেকক্ষণ। তাঁরা ইতিমধ্যেই খিদে মিটিয়ে প্রাতরাশ সেরেছেন।
‘দাঁড়ান, দাঁড়ান, আমি জানি, উনিশটা’, উড়ন্ত অবস্থায় পাখিগুলোর যে রূপ ছিল এখন তা হারিয়ে মোচড়ানো, রক্তের দাগ ধরা, শুকিয়ে ওঠা স্নাইপগুলোকে দ্বিতীয়বার গুণতে গুণতে লেভিন বললেন।
লেভিন খুশি হলেন হিসেবটা সঠিক এবং অব্লোন্স্কির ঈর্ষায়। এটাও তাঁর ভালো লাগল যে ঘরে ফিরে তিনি দেখতে পেলেন কিটির চিঠি নিয়ে আসা লোকটাকে।
‘আমি বেশ ভালো আছি, হাসি-খুশি। আমার জন্যে তুমি যদি ভয় পাও, তাহলে এখন আরো নিশ্চিন্ত থাকতে পারো। আমার নতুন দেহরক্ষী হয়েছেন মারিয়া ভাসিয়েভনা (এই ধাইটি লেভিনের সংসারে নতুন গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যক্তি)। আমি কেমন আছি দেখতে এসেছিলেন তিনি। দেখলেন, আমি পুরোপুরি সুস্থ; তোমার আসা পর্যন্ত ওঁকে ধরে রেখেছি আমরা। সবাই আমরা ভালো আছি, সবাই হাসি-খুশি। তুমি বাপু তাড়াহুড়া করো না। শিকার যদি ভালো চলে, তাহলে আরো একদিন থেকে যেও।
পয়মন্ত শিকার আর স্ত্রীর চিঠি—এ দুই আনন্দ ছিল এতই বিপুল যে পরে যে দুটো ছোটখাটো অপ্রীতিকর ব্যাপার ঘটেছিল তাতে বিশেষ বিচলিত হননি লেভিন। তার একটা হল, বাড়তি পাটকিলে ঘোড়টাকে গতকাল স্পষ্টতই অত্যন্ত খাটানোয় সে খাচ্ছিল না কিছু, মুষড়ে পড়েছিল। কোচোয়ান বলল, সে জেরবার হয়ে গেছে। বলল, ‘কাল বড় বেশি ছুটিয়েছি ওকে। খারাপ রাস্তায় দশ ভার্স্ট পথ, কম তো নয়।
দ্বিতীয় যে ঘটনাটা তাঁর প্রথমদিককার খোশমেজাজকে মাটি করে দিয়েছিল, কিন্তু পরে যা নিয়ে তিনি খুব হেসেছেন সেটা এই যে, কিটি এত প্রচুর পরিমাণে খাবার দিয়েছিল যে এক সপ্তাহ ধরে খেয়েও শেষ করা যাবে না বলে মনে হয়েছিল, তার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। শিকার থেকে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে ফেরার সময় লেভিনের কাছে পিঠেগুলোর ছবি এত জ্বলজ্বলে হয়ে উঠেছিল যে ঘরের কাছে এসে তিনি নাকে-মুখে তার স্বাদ-গন্ধ এমনই পাচ্ছিলেন যেমন লাস্কা পায় মৃগয়ার, ফিলিপকে তখনই খাবার দিতে বললেন তিনি। দেখা গেল শুধু পিঠে নয়, মুরগির ছানাগুলোও শেষ করে ফেলেছে।
‘খিদে বটে!’ হেসে ভাসেকা ভেস্লোভস্কিকে দেখিয়ে বললেন অব্লোন্স্কি, ‘অগ্নিমান্দ্যে আমি ভুগি না, কিন্তু এটা আশ্চর্য…’
‘তা কি করা যাবে!’ ভেস্লোভস্কির দিকে বিষণ্ণ বদনে তাকিয়ে লেভিন বললেন, ‘তাহলে গরুর মাংসই দাও, ফিলিপ।
‘গরুর মাংসও খাওয়া হয়ে গেছে’, ফিলিপ বলল, ‘হাড়গুলো আমি দিয়েছি কুকুরদের।’
লেভিন এত ক্ষুব্ধ হলেন যে সখেদে বললেন, ‘অন্তত কিছু রাখলে পারতেন আমার জন্যে!’ কান্না পাচ্ছিল তাঁর। ভাসেকার দিকে তাকাবার চেষ্টা না করে কাঁপা কাঁপা গলায় তিনি ফিলিপকে বললেন, ‘যাও, পাখিগুলোর ছাল ছাড়াও গিয়ে। আর বিছুটি দিতে ভুলো না। আমার জন্যে অন্তত খানিক দুধ চেয়ে আনো তো।’
দুধ খাওয়ার পর বাইরের লোকের সামনে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন বলে যখন তাঁর লজ্জা হয়, নিজের ক্ষুধার্ত উষ্মা নিয়ে তখন হাসাহাসি করেছিলেন তিনি।
বিকেলে আরেকবার শিকারে যান তাঁরা, ভেস্লোভস্কি পর্যন্ত তাতে পাখি মারতে পারেন কয়েকটা। বাড়ি ফিরলেন রাতে।
ফিরতি পথটাও এখানে আসবার মত কাটল ফুর্তিতে। ভেস্লোভস্কি কখনো গান ধরলেন, কখনো স্মরণ করলেন চাষীদের কাছে তাঁর যাওয়াটা। যারা তাঁকে ভোদ্কা খাইয়ে বলেছিল : ‘কড়া চোখে তাকিয়ো না’। কখনো বললেন বাদামের সাথে তুলনীয় গ্রাম্য ছুঁড়ির সাথে তাঁর রঙ্গরসের কথা। একটি চাষী তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল তিনি বিবাহিত কিনা, আর বিবাহিত নন জেনে বলেছিল, ‘পরস্ত্রীর দিকে চোখ দিও না। নিজেরটিকে জোগাড় করার জন্যে তোয়াজ করো।’ এই কথাটায় ভীষণ মজা পেয়েছিল ভেস্লোভস্কি
‘বলা যায় এই সফরটায় ভীষণ আনন্দ পেলাম। আর লেভিন, আপনি?’
লেভিন আন্তরিকভাবেই বললেন, ‘আমিও। বাড়িতে ভাসেকার প্রতি যে বিরূপতা তিনি বোধ করেছিলেন সেটা আর বোধ করছিলেন না তাই নয়, বরং তাঁর প্রতি অতি সৌহার্দের একটা মনোভাবে তাঁর ভীষণ আনন্দ হচ্ছিল
চৌদ্দ
ভাসেকা যে ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন পরদিন সকাল দশটায়, সেখানে টোকা দিলেন লেভিন।
ভেস্লোভস্কি ফরাসি ভাষায় চেঁচিয়ে বললেন, ‘আসুন। মাপ করবেন, আমি সবেমাত্র আমার প্রক্ষালন সারলাম।’ তিনি শুধু অন্তর্বাস পরা অবস্থায় হেসে বললেন।
‘সংকোচের কিছু নেই’, জানালার কাছে বসলেন লেভিন, ‘ভালো ঘুম হয়েছে তো?’
‘ঘুমিয়েছি মড়ার মত। আজকের দিনটা শিকারের পক্ষে কেমন?’
‘কি খাবেন, চা নাকি কফি?’
‘এর কোনটাই নয়। আমি প্রাতরাশের অপেক্ষায় রইলাম। সত্যি লজ্জা হচ্ছে। মহিলারা এতক্ষণে উঠে পড়েছেন নিশ্চয়? এখন চমৎকার লাগবে বেড়াতে। আপনি আপনার ঘোড়া দেখান আমাকে।’
বাগান দিয়ে হেঁটে, আস্তাবলে গিয়ে, এমন কি প্যারালাল বারে একসাথে ব্যায়াম করে লেভিন অতিথি সমভিব্যাহারে বাড়ি ফিরে ঢুকলেন ড্রয়িং-রুমে।
কিটি বসে ছিল সামোভারের সামনে। তার কাছে গিয়ে ভেস্লোভস্কি বললেন, ‘শিকার হয়েছে চমৎকার। মনে কত যে ছাপ পড়ল! এ পরিতোষ থেকে মহিলারা বঞ্চিত বলে কষ্ট হচ্ছে।’
