লাস্কা তার পায়ের তলার টলমলে পাঁকের ওপর দিয়ে ফুর্তিতে উদ্বেগ নিয়ে ছুটল।
লাস্কা জলায় তখনই শিকড়, জলা-ঘাস, মরচের চেনা এবং অশ্বমলের অচেনা গন্ধের মধ্যে টের পেল সারা জায়গাটায় ছড়িয়ে যাওয়া পাখির গন্ধ, ঠিক সেই ঝাঁঝালো গন্ধটাই যা তাকে তাতিয়ে তোলে সবচেয়ে বেশি। শ্যাওলা আর পানার মধ্যে কোথাও কোথাও গন্ধটা খুবই তীব্র, কিন্তু ঠিক কোন দিকে তা বেড়ে উঠছে বা কমে আসছে তা স্থির করা যাচ্ছিল না। দিশা ঠিক করার জন্য সরে আসতে হত বাতাস থেকে। পায়ের গতি সম্পর্কে সচেতন না থেকে লাস্কা প্রাপ্ৰত্যূষ যে বাতাস বইছিল পূর্ব থেকে তার ডান দিকে ছুটে গিয়ে, বাতাসের দিকে ফিরে লাফিয়ে চলল উত্তেজিত দুলকি চালে এমনভাবে যাতে প্রয়োজন পড়লে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। বিস্ফারিত নাক দিয়ে বাতাস টেনে সে তখনই টের পেল যে শুধু গন্ধ নয়, পাখিগুলো রয়েছে তার কাছেই এবং শুধু একটা নয়, অনেক। লাস্কা তার চলার গতি কমাল। পাখিগুলো খুঁজে পাবার জন্য সে পাক দেওয়া শুরু করা মাত্র শুনল প্রভুর ডাক। ‘লাস্কা! এখানে!’ অন্য দিক দেখিয়ে বললেন তিনি। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে পড়ল লাস্কা : যা শুরু করেছে সেটা শেষ করাই কি ভালো হবে না? কিন্তু পানিতে ভাসা কয়েকটা ঘেসো ডিপি যেখানে কিছুই থাকতে পারে না, সেটা দেখিয়ে রাগত স্বরে লেভিন পুনরাবৃত্তি করলেন তাঁর হুকুমের। তাঁর কথা শুনল লাস্কা, প্রভুকে খুশি করার জন্য ভান করল যেন খুঁজছে, ডিপিগুলোর মাঝে ঢুকল সে, কিন্তু আগের জায়গায় ফিরে আসতেই টের পেল পাখিদের। এখন, লেভিন যখন তাকে বাধা দিচ্ছেন না, লাস্কা বুঝে গেল কি করতে হবে এবং নিজের পায়ের দিকে না তাকিয়ে, বিরক্তিতে উঁচু উঁচু ডিপিগুলোয় হোঁচট খেয়ে, পানিতে পড়ে গিয়ে কিন্তু স্থিতিস্থাপক সবল পায়ে সামলে নিয়ে সে শুরু করল পাক দিতে, যাতে সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার কথা। ওদের গন্ধ ক্রমেই তীব্র আর সুনির্দিষ্ট রূপে অভিভূত করছিল তাকে, আর হঠাৎ তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল যে ওদের একটা আছে এখানেই, পাঁচ পা দূরে তার সামনের ডিপিটার পেছনে, থেমে গেল সে, আড়ষ্ট হয়ে উঠল গোটা শরীর। পা তার খাটো হওয়ায় সামনে কিছু সে দেখতে পাচ্ছিল না, কিন্তু গন্ধটা ক্রমাগত টেনে প্রত্যাশার পরিতৃপ্তিতে দাঁড়িয়ে রইল সে। উত্তেজিত লেজ টান টান হয়ে তিরতির করছিল কেবল ডগাটায়। মুখ সামান্য হাঁ-করা, কান খাড়া। দৌড়ের দরুন একটা কান উল্টে গেছে, হাঁফাচ্ছিল লাস্কা। কিন্তু সাবধানে এবং আরো সাবধানে, মাথা না ঘুরিয়ে বরং শুধু চোখ দিয়ে তাকাচ্ছিল প্রভুর দিকে। তাঁর মুখ তার কাছে অভ্যস্ত, কিন্তু চোখ সব সময়ই ভয়ংকর, আসছেন তিনি ঘেসো ডিপিতে হোঁচট খেতে খেতে এবং লাস্কার মনে হল, আসছেন অসাধারণ ধীরে। লাস্কার মনে হয়েছিল যে তিনি আসছেন ধীরে ধীরে, আসলে কিন্তু তিনি দৌড়াচ্ছিলেন।
যে বিশেষ ভঙ্গিতে লাস্কা একেবারে শুয়ে পড়ে, পেছনের বড় থাবায় মাটি আঁচড়ায় আর মুখ সামান্য হাঁ করে, তা দেখে লেভিন বুঝলেন যে বড় স্নাইপের ধান্ধায় আছে সে, এবং যাতে সাফল্য লাভ করেন, বিশেষ করে প্রথম পাখিটায়, তার জন্য মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে ছুটে গেলেন লাস্কার দিকে। তার পাল্লা ধরে উঁচু থেকে তিনি চাইলেন সামনে আর লাস্কা যা দেখেছিল গন্ধে সেটা তিনি দেখলেন চোখ দিয়ে। দুটো ডিপির মাঝখানে একটায় তিনি দেখতে পেলেন বড় একটা স্নাইপ। মাথা ঘুরিয়ে ও যেন কান পাতল। তারপর ডানা নেড়ে আবার তা গুটিয়ে বিদঘুটে ঢঙে পিছিয়ে কোণে লুকিয়ে গেল।
লেভিন পেছন থেকে লাস্কাকে ঠেলা দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘নে, নে!’
লাস্কা ভাবল : ‘কিন্তু আমি যে যেতে পারি না। যাব কোথায়? এখান থেকে আমি ওদের টের পাচ্ছি, আর যদি এগিয়ে যাই, তাহলে ধরতে পারব না কোথায় তারা, কে তারা।’ কিন্তু লেভিন হাঁটু দিয়ে তাকে ঠেলা মেরে উত্তেজিত ফিসফিস স্বরে আবার বললেন, ‘নে লাসোকা, নে!’
‘তা উনি যদি তাই চান, তাহলে করছি, কিন্তু আমার কোন দায়িত্ব থাকবে না’, এই ভেবে লাস্কা তেড়ে গেল সামনের ডিপি দুটোর মাঝখানে। এখন সে আর কোন গন্ধ পাচ্ছিল না, কিছুই না বুঝে শুধু দেখছিল আর শুনছিল।
আগের জায়গাটা থেকে দশ পা দূরে, প্রচণ্ড ক্যাঁ-ক্যাঁ করে ডেকে, বড় স্নাইপের বৈশিষ্ট্যসূচক পক্ষধ্বনি তুলে উড়ল একটা পাখি। আর গুলির পরেই সাদা বুকে ধপ করে পড়ল ভেজা মাটির ওপর। দ্বিতীয় পাখিটা কুকুর ছাড়াই উড়ল লেভিনের পেছন থেকে।
লেভিন যখন ঘুরলেন তার দিকে। ততক্ষণে অনেক দূরে চলে গেছে সে, তাহলেও গুলিটা লাগল। আরো কিছুটা উড়ে গিয়ে, সোজা হয়ে, বলের মত ঘুরপাক খেয়ে সশব্দে সে পড়ল শুকনো ডাঙ্গায়।
‘হ্যাঁ, এটা একটা কাজের কাজ হল’, মাংসল স্লাইপ দুটোকে থলের মধ্যে ভরতে ভরতে লেভিন ভাবলেন, ‘কি লাসোকা, কাজ হবে তো?’
আবার বন্দুকে গুলি ভরে লেভিন যখন আরো এগিয়ে গেলেন, সূর্য তখন উঠে গিয়েছিল। যদিও মেঘের আড়াল থেকে দেখা যাচ্ছিল না। শশীকলা তার সমস্ত দীপ্তি হারিয়ে ম্যাড়ম্যাড় করছিল সাদা একখণ্ড মেঘের মত; একটা তারাও দেখা যাচ্ছিল না আর। শিশিরে নাবালগুলো আগে ছিল রূপালি, এখন সোনালি। মরচে-ধরা পানিগুলো এখন অ্যাম্বারের মত হলদে। ঘাসের নীলাভা এখন পরিণত হলদেটে সবুজে। স্রোতের কাছে শিশিরে চিকচিকে, লম্বা ছায়া ফেলা ঝোপঝাড়গুলোয় গিজগিজ করছে জলার পাখিরা। ঘুম থেকে জেগে একটা বাজপাখি খড়ের গাদিতে বসে এপাশে- ওপাশে মাথা ফিরিয়ে অপ্রসন্ন দৃষ্টিতে চাইছিল জলার দিকে। মাঠের ওপর দিয়ে উড়ছিল দাঁড়কাকগুলো। ঘুম থেকে উঠে কাফতানের তল থেকে গা চুলকাচ্ছিল একজন বৃদ্ধ। খালি পা একটা বালক ঘোড়াগুলোকে তাড়িয়ে আনছিল তার দিকে। গুলির ধোঁয়া দুধের মত ধবধব করছিল সবুজ ঘাসের ওপর। লেভিনের দিকে ছুটে এল একটা ছেলে। কিছু দূরে পেছন পেছন যেতে যেতে একটা ছেলে চেঁচাল, ‘কাল হেথায় হাঁস এসেছিল কাকা!’ ছেলেটার চোখের সামনে পরপর আরো তিনটা স্নাইপ মারতে পেরে দ্বিগুণ খুশি লাগল লেভিনের। ছেলেটার মুখে তারিফ ফুটেছিল।
তেরো
পয়লা শিকার, তা পশু বা পাখি যাই হোক যদি ফসকে না যায়, তাহলে শিকারে ভাগ্য খুলবে — দেখা গেল শিকারীদের এই বিশ্বাসটা সত্যি।
