‘নীতি নয়, কিন্তু কেন যাব আমি?’
‘জানো, তুমি নিজের বিপদ ডেকে আনছ’, টুপিটা পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন অব্লোন্স্কি।
‘কি করে?’
‘আমি কি দেখতে পাচ্ছি না স্ত্রীর কাছে তুমি নিজেকে কোথায় দাঁড় করিয়েছ? দু’দিনের জন্য তুমি শিকারে যাবে কি যাবে না, এই প্রশ্নটা তোমাদের কাছে কি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল সে তো আমি শুনেছি। এ সবই ভালো একটা সহজিয়া গীত হিসেবে। কিন্তু সারা জীবন তো তাতে চলবে না। পুরুষকে হতে হবে স্বাধীন, তার আছে নিজের পুরুষালী আগ্রহ। পুরুষকে হতে হবে পৌরুষময়’, অব্লোন্স্কি বললেন দরজা খুলে।
‘তার মানে? গাঁয়ে কুমারীদের সাথে লীলায় যেতে হবে?’ লেভিন জিজ্ঞেস করলেন।
‘যদি ফুর্তি লাগে, তাহলে কেন নয়? এতে পরিণামের কিছু নেই। এতে আমার স্ত্রীর কিছু খারাপ হবে না অথচ আমার খানিকটা ফুর্তি হবে। প্রধান কথা, গৃহটা পবিত্র রাখা। ঘরে যেন কিছু না হয়। কিন্তু নিজের হাত তো খোলা রাখা চাই।
‘হয়ত তাই’, শুষ্ককণ্ঠে বলে লেভিন পাশ ফিরলেন, ‘কাল সকাল সকাল যেতে হবে, কাউকে জাগিয়ে দেব না আমি। ভোর হতেই আমি যাব।’
‘তাড়াতাড়ি আসুন সাহেবরা!’ শোনা গেল ভেস্লোভস্কির গলা, ফিরেছেন তিনি; মনোহারিণী! আমি আবিষ্কার করেছি ওকে। মনোহারিণী! একেবারে গ্রেঠেন, আমাদের ভাব হয়ে গেছে। সত্যি পরমাসুন্দরী’, এমন পুলকিত হয়ে উনি বলতে লাগলেন যেন পরমাসুন্দরীকে গড়া হয়েছে তাঁর জন্যই, এবং তাঁর জন্যই যিনি গড়ে দিয়েছেন, তাঁর ওপর তিনি তুষ্ট।
ঘুমের ভান করলেন লেভিন আর বুট পরে চুরুট ধরিয়ে চালাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন অব্লোন্স্কি, শিগগিরই মিলিয়ে গেল তাঁদের কণ্ঠস্বর।
অনেকক্ষণ ঘুম এল না লেভিনের। শুনতে পাচ্ছিলেন বিচালি চিবুচ্ছে তাঁর ঘোড়ারা, গৃহকর্তা তার বড় ছেলেকে নিয়ে চলে গেল রাত চৌকিতে; পরে শুনলেন চালাঘরের অন্যদিকে সৈনিক তার ভাগনে, গৃহস্বামীর ছোট ছেলেকে নিয়ে শুচ্ছে; সরু গলায় ছেলেটা তার মামাকে বলছে কুকুরগুলোর কথা, সেগুলোকে ভয়ংকর আর অতিকায় বলে মনে হয়েছিল তার; এর পর সে জিজ্ঞেস করলে কি ধরবে কুকুরগুলো, ঘুম-ঘুম ভাঙা গলায় সৈনিক বলল যে, কাল শিকারীরা জলায় যাবে, গুলি চালাবে। তারপর ছেলেটার প্রশ্ন এড়াবার জন্য বলল, ‘নে ভাস্কা, ঘুমো, ঘুমো, নইলে দেখাব মজা’, এবং শিগগিরই নাক ডাকাতে লাগল নিজেই। চারদিক নিঝুম হয়ে এল; শোনা যাচ্ছিল শুধু ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি, স্নাইপের কর্কশ ডাক। ‘সত্যিই কি শুধু নেতিবাচক দিক থেকে’, মনে মনে আওড়ালেন লেভিন, ‘তা কি হল? আমার তো কোন দোষ নেই।’ আগামীকালের কথা তিনি ভাবতে লাগলেন।
‘কাল সকাল-সকাল যাব, উত্তেজিত হব না। স্নাইপ অঢেল, বড় স্নাইপও আছে। ফিরে দেখব কিটির চিঠি এসেছে। তা স্তিভা ঠিকই বলেছে। কিটির কাছে আমি পুরুষ নই, মেয়েমানুষ বনে গেছি… কিন্তু কি করা যাবে! আবার ওই নেতি!’
তিনি ঘুমের মধ্যে শুনলেন, ভেস্লোভস্কি আর অব্লোন্স্কির হাসি এবং উচ্ছল কথাবার্তা। তিনি ক্ষণিকের জন্য চোখ মেলে দেখলেন; চাঁদ উঠেছে, খোলা দরজায় উজ্জ্বল জ্যোৎস্নায় কথা বলছেন ওঁরা। ডবকা ছুঁড়ির সাথে সদ্য ফেটে- যাওয়া বাদামের তুলনা দিয়ে কি যেন বললেন অব্লোন্স্কি আর তাঁর সংক্রামক হাসি হেসে ভেস্লোভস্কি পুনরুল্লেখ করলেন, ‘নিশ্চয় চাষী তাঁকে যা বলেছিল সেই কথাটা তুমি তোমার নিজেরটিকে জোগাড় করার জন্যে যত পারো তোয়াজ করো!’
লেভিন ঘুমের মধ্যেই বললেন, ‘কাল সকালে!’ এ কথা বলেই ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি।
বারো
লেভিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে সঙ্গীদের জাগাবার চেষ্টা করলেন। ভাসেকা উপুড় হয়ে মোজা পরা একটা পা টান করে এমন বেদম ঘুমাচ্ছিলেন যে, তাঁর কাছ থেকে কোন জবাব পাওয়া সম্ভব হল না। ঘুমের মধ্যেই অব্লোন্স্কি আপত্তি করলেন এত সকালে যেতে। বিচালির কিনারায় কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমাচ্ছিল লাস্কা। এমন কি সেও উঠল অনিচ্ছায়, আলস্যভরে পেছনের পা দুটোর আড়মোড়া ভাঙল। হাই-বুট পরে, বন্দুক নিয়ে, সন্তর্পণে চালাঘরের ক্যাঁচকেঁচে দরজা খুলে লেভিন বেরিয়ে এলেন। কোচোয়ানরা ঘুমাচ্ছিল গাড়িতে, ঘোড়ারা ঝিমাচ্ছিল। শুধু একটা ঘোড়া আলস্যভরে ওট খাচ্ছিল, ঘোঁতঘোঁত করে তা ছড়াচ্ছিল পাতনায়। বাইরে তখনো ধূসর আঁধার।
কুটির থেকে বৃদ্ধা গৃহকর্ত্রী বেরিয়ে এসেছিল, যেন অনেক কালের পরিচয় এমনভাবে সে লেভিনকে জিজ্ঞেস করল, ‘এত সকালে উঠলে যে বাছা?’
‘শিকারে যাব খালা। এদিক দিয়ে জলায় যাওয়া যাবে?’
‘সোজা পেছনের আঙিনা দিয়ে; মাড়াইয়ের জমি হয়ে তিসি ক্ষেত। সেখানেই হাঁটা পথটা বেরিয়েছে।’
বৃদ্ধা সাবধানে রোদ-পোড়া খালি পা ফেলে লেভিনকে এগিয়ে দিল। তাঁর জন্য মাড়াইয়ের জমির বেড়া খুলে দিল।
‘সোজা চলে গেলেই জলা। আমাদের ছেলেগুলো কাল সাঁঝে ঘোড়া খেদিয়েছে ওখানে।’
হাঁটা পথটা দিয়ে ফুর্তিতে লাস্কা ছুটে গেল। অবিরাম আকাশটা লক্ষ্য করতে করতে ক্ষিপ্র লঘু পদক্ষেপে লেভিন গেলেন তার পিছু পিছু। তাঁর ইচ্ছে হচ্ছিল জলায় পৌঁছবার আগে যেন সূর্য না ওঠে। কিন্তু গড়িমসি করল না সূর্য। যখন তিনি বেরোন, বাঁকা চাঁদ তখনো জুলজুল করছিল। এখন তার আভা এক ফোঁটা পারদের মত : কিছুক্ষণ আগেও শুকতারা চোখে না পড়ে যেত না এখন তাকে খুঁজতে হচ্ছে; দূরের ক্ষেতে যে ছোপগুলো আগে আবছা দেখা যাচ্ছিল, এখন তা পরিষ্কার ফুটে উঠেছে; রাই শস্যের আঁটি এগুলি। উঁচু উঁচু সুগন্ধ তিসি গাছ থেকে বন্ধ্যা মঞ্জরিগুলো তুলে ফেলা হয়েছে। সূর্যের আলো না থাকায় তখনো অদৃশ্য শিশির বিন্দুগুলো লেভিনের পা আর ব্লাউজ ভিজিয়ে দিল কোমরের ওপর পর্যন্ত। প্রভাতের স্বচ্ছ স্তব্ধতায় সামান্যতম ধ্বনিও শোনা যাচ্ছিল। গুলির শিস দিয়ে লেভিনের কানের কাছ দিয়ে উড়ে গেল একটা মৌমাছি। তাকিয়ে দেখতে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় মৌমাছিও চোখে পড়ল। বেড়ার পেছনে মৌচাক থেকে উড়ে গিয়ে তারা তিসি ক্ষেতের ওপর দিয়ে সোজা জলার দিকে মিলিয়ে যাচ্ছে। পথটা চলে গেছে জলায়। জলাটা চেনা যায় সেখান থেকে ওঠা ভাঁপ দেখে, কোথাও তা ঘন, কোথাও পাতলা, সে ভাঁপের মধ্যে দ্বীপের মত দুলছে হোগ্লা আর উইলোর ঝোপ। যে ছোকরা আর মরদেরা রাতে ঘোড়াগুলোর চৌকি দিয়েছিল জলার কিনারায় আর পথের ধারে তারা ভোর হলেও অঘোরে ঘুমাচ্ছে কাফতান জড়িয়ে। তাদের অদূরে চলছে ছাঁদনদড়ি বাঁধা তিনটা ঘোড়া। তাদের একটা ঝনঝনিয়ে চলছে বেড়ি। লাস্কা যাচ্ছিল তার প্রভুর পাশে পাশে, তাকাচ্ছে এদিক- ওদিক, এগিয়ে যেতে চাইছে। ঘুমন্ত চাষীদের পেরিয়ে গিয়ে প্রথম নাবালটায় পৌঁছে লেভিন তাঁর কার্তুজ পরীক্ষা করে লেলিয়ে দিলেন কুকুরটাকে। বাদামি রঙের তিন-বছুরে একটা পুরুষ্টু ঘোড়া কুকুর দেখে লাফিয়ে সরে গিয়ে ঘোঁতঘোঁত করে উঠল। ভয় পেয়েছিল বাকি ঘোড়াগুলোও। ছাঁদনদড়ি বাঁধা পায়ে পানিতে ছপছপ করে ঘন পাঁকে ডুবে যাওয়া খুর টেনে তোলায় হাততালি দেবার মত শব্দ করে তারা লাফিয়ে এল জলা থেকে। লাস্কা থেমে গিয়ে ঘোড়াগুলোর দিকে সবিদ্রূপ আর সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে লেভিনের দিকে তাকাল। লেভিন তার গায়ে হাত বুলিয়ে শিস দিয়ে ইঙ্গিত করলেন যে, এখন শুরু করা যায়।
