‘জানি না।’
‘তাহলে আমি তোমাকে বলি : কৃষিকাজে তোমার খাটুনির জন্য তুমি যে পাচ্ছ ধরা যাক পাঁচ হাজারের ওপর, যেখানে আমাদের স্বাধীন চাষী যতই খাটুক পঞ্চাশ রুবলের বেশি পাচ্ছে না, এটাও ঠিক তেমনি অসাধু যেমন আমি পাই আমার নিম্নতন বড়বাবুর চেয়ে বেশি, মালতুস বেশি পায় তার রেল-মিস্ত্রির চেয়ে। এসব লোকের প্রতি সমাজের কেমন একটা অযৌক্তিক বিরূপতায় আমার বরং মনে হয় রয়েছে ঈর্ষা…
‘না, এটা অন্যায়’, বললেন ভেস্লোভস্কি, ‘ঈর্ষা হতে পারে না। এসব ব্যাপারে কিছু-একটা কারচুপি থাকেই। ‘না শোন’, লেভিন বলে চললেন, ‘বলছ এটা ন্যায্য নয় যে আমি পাই পাঁচ হাজার আর চাষী পঞ্চাশ, তা ঠিক, এটা অন্যায়, আমি সেটা অনুভব করি, কিন্তু…’
‘সত্যিই তাই। কেন আমরা কোন মেহনত না করে খানাপিনা করি, শিকারে যাই, আর সে খেটেই চলেছে অবিরাম?’ ভাসেকা ভেস্লোভস্কি বললেন, স্পষ্টতই জীবন পরিষ্কার করে এ বিষয়ে ভাবলেন এই প্রথম, তাই তাঁর কথায় ছিল পরিপূর্ণ অকপটতা।
‘হ্যাঁ, তুমি অনুভব কর, কিন্তু নিজের সম্পত্তিটা ওকে দাও না’, যেন ইচ্ছে করে লেভিনকে খোঁচাবার জন্য বললেন অব্লোন্স্কি।
ইদানীং দুই ভায়রাভাইয়ের মধ্যে যেন গোপন একটা শত্রুতা গড়ে উঠেছিল : দুজন দুই বোনকে বিয়ে করার পর থেকে তাঁদের মধ্যে যেন একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল—কে তাঁর জীবনকে ভালো করে গড়ে তুলবেন তাই নিয়ে এখন এই শত্রুতা প্রকাশ পেল কথাবার্তায় একটা ব্যক্তিগত ঝাঁঝ এনে।
‘দিই না কারণ কেউ সেটা চাইছে না আমার কাছে, আর আমি নিজে চাইলেও এমন কেউ নেই যাকে দেওয়া যায়’, লেভিন বললেন।
‘দিয়ে দাও এই চাষীটাকে, সে আপত্তি করবে না।
‘কিন্তু দেব কেমন করে? ওর সাথে গিয়ে দলিল সই করব?’
‘তা জানি না, তবে তোমার যদি বিশ্বাস হয়ে থাকে যে তোমার অধিকার নেই…’
‘মোটেই সে বিশ্বাস আমার নেই। বরং আমি অনুভব করি যে দান করার অধিকার আমার নেই, বরং জমি এবং পরিবারের কাছে দায়িত্ব আছে আমার।’
‘না শোন, যদি তুমি মনে কর এই অসাম্য অন্যায়, তাহলে কেন এমন কাজ করছ না…’
‘আমি সেই কাজই করছি, শুধু নেতিবাচক দিক থেকে, শুধু দুজনের মধ্যে অবস্থার যে পার্থক্য আছে সেটা বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা আমি করব না।’
‘না, মাপ কর, এটা একটা আপাতবিপরীত কূট।’
‘হ্যাঁ, এটা কেমন যেন একটা কুতার্কিক যুক্তি বলে মনে হচ্ছে’, সমর্থন করলেন ভেস্লোভস্কি; ‘আরে, কর্তা যে!’ দরজা ক্যাচকেঁচিয়ে এ সময় চালাঘরে ঢোকায় চাষীটাকে বললেন তিনি, ‘কি, এখনো ঘুমাচ্ছ না?’
‘কোথায় ঘুম! ভাবলাম আমাদের বাবুরা ঘুমিয়ে পড়েছে, শুনি কথাবার্তা। এলাম একটা আঁকশি নিতে। কুকুরটা কামড়াবে না তো?’ সাবধানে খালি পা ফেলে জিজ্ঞেস করল সে।
‘আর তুমি ঘুমাবে কোথায়?’
‘রাতের ডিউটিতে।’
‘আহ্, কি রাত!’ খোলা দরজার বড় ফ্রেম দিয়ে প্রদোষের ক্ষীণ আলোয় দেখা যাচ্ছিল কুটিরের একটা কোণ, ঘোড়া খুলে নেওয়া গাড়ি, সেদিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন ভেস্লোভস্কি, ‘আরে শুনুন, শুনুন, মেয়েদের গলায় গান, গাইছে মন্দ না তো! কে গাইছে কর্তা?’
‘গাঁয়ের মেয়েরা, ওই কাছেই।’
‘চলুন যাই, বেরিয়ে আসি! ঘুম তো হবে না। অব্লোন্স্কি, চলুন, বেড়ানো যাক!
‘শুয়ে থাকা আর যাওয়া, কি করে হয় একসাথে’, দেহ টান করে বললেন অব্লোন্স্কি, ‘শুয়ে থাকাটা চমৎকার। ‘তাহলে আমি একাই যাব’, সবেগে উঠে দাঁড়িয়ে বুট পরতে পরতে বললেন ভেস্লোভস্কি, ‘আসি সাহেবরা। ফুর্তির কিছু থাকলে আপনাদের ডাকব। আপনরা আমাকে শিকারে এনেছেন সেটা ভুলব না।
‘চমৎকার ছোকরা, তাই না?’ ভেস্লোভস্কি চলে গেলে এবং চাষী দরজা বন্ধ করে দেবার পর বললেন অব্লোন্স্কি।
‘হ্যাঁ, চমৎকার’, যে আলাপটা হচ্ছিল তার কথা ভাবতে ভাবতে জবাব দিলেন লেভিন। তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি যতটা পারেন পরিষ্কার করে তাঁর ভাবনা ও অনুভূতি প্রকাশ করেছেন, অথচ দুজনেই ওঁরা, নির্বোধ বা কপট নন, একবাক্যে বলেছেন যে কুযুক্তিতে তিনি প্রবোধ দিচ্ছেন নিজেকে। এটা বিচলিত করছিল তাঁকে।
‘তাহলে ভায়া, দুটোর একটা। হয় মানো যে বর্তমান ব্যবস্থাটা ন্যায্য, তাহলে নিজের অধিকার বজায় রাখো; নয় স্বীকার কর যে অন্যায় বিশেষাধিকার ভোগ করছ, আর আমি যা করি, সেটা ভোগ করি খুবই তৃপ্তির সাথেই। ‘না, এ সুবিধা যদি অন্যায় হয়, তাহলে তৃপ্তির সাথে সেটা ভোগ করতে তুমি পার না, অন্তত আমি পারি না। আমার কাছে প্রধান কথা হল এই যে আমার দোষ নেই, এটা অনুভব করা।
‘কিন্তু সত্যি, গেলে হয় না?’ স্পষ্টতই এসব ভাবনায় ক্লান্তি বোধ করে বললেন অব্লোন্স্কি, ‘ঘুম তো হবে না, সত্যি, চল যাই!’
লেভিন উত্তর দিলেন না। তিনি ন্যায় আচরণ করছেন নেতিবাচক অর্থে এই যে কথাটা তাঁরা বলেছেন, তা নিয়ে ভাবছিলেন তিনি। নিজেকে প্রশ্ন করলেন, ‘ন্যায্য হওয়া যায় কেবল কি নেতিবাচক দিক থেকে?’
‘আহ্ কি গন্ধ ছাড়ছে তাজা বিচালি!’ উঠে বসে বললেন অব্লোন্স্কি, ‘না, কিছুতেই ঘুমাব না। ভাসেকা কিছু- একটা জমিয়েছে ওখানে। শুনছ খিলখিল হাসি আর ওর গলা? গেলে হয় না? চল যাই!’
‘না, আমি যাব না’, লেভিন বললেন।
‘এটাও তোমার একটা নীতি নাকি?’ অন্ধকারে টুপি খুঁজতে খুঁজতে হেসে বললেন অব্লোন্স্কি।
