‘কি? অনেক মেরেছ?’ ফুর্তিতে হেসে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
‘আর তুমি?’ লেভিন শুধালেন। কিন্তু শুধাবার কিছু ছিল না, কেননা দেখতে পাচ্ছিলেন যে শিকারের থলেটা ভরা।
‘মন্দ নয়।‘
চৌদ্দটি স্নাইপ পেয়েছেন তিনি।
‘চমৎকার জলা! তোমার নিশ্চয় অসুবিধা ঘটিয়েছে ভেস্লোভস্কি। দুজন শিকারী, একটা কুকুর-এ ঠিক চলে না’, নিজের বিজয়কে নামিয়ে আন্নার জন্য বললেন অব্লোন্স্কি।
এগারো
লেভিন যে চাষীর বাড়িতে সব সময় আস্তানা গাড়তেন, অব্লোন্স্কির সাথে সেখানে যখন তিনি পৌঁছলেন, দেখা গেল ভেস্লোভস্কি ইতিমধ্যেই এসে গেছেন সেখানে। কুটিরের মাঝখানে দুই হাতে বেঞ্চি ধরে ছিলেন তিনি, আর গৃহকর্ত্রীর ভাই, জনৈক সৈনিক তাঁর পাঁক ভরা হাই-বুট টেনে খুলছিল। হাসছিলেন তিনি তাঁর সংক্রামক ফুর্তির হাসি।
‘আমি এইমাত্র এসেছি। চমৎকার লোক। ভেবে দেখুন, আমাকে ওরা খাওয়াল, পান করাল। কি রুটি, অপূর্ব! সুস্বাদু! আর ভোদ্কা—এর চেয়ে ভালো জিনিস আমি আর কখনো খাইনি! কিন্তু কিছুতেই পয়সা নিতে চাইল না। কেন জানি কেবলি বলল, ‘কড়া চোখে চেয়ো না গো’।’
‘পয়সা লেবে কেনে? ওরা আপনাকে মানে মান্য করল। ওদের ভোদকা কি আর বেচার জন্য?’ কালো হয়ে আসা মোজা আর ভেজা বুট শেষ পর্যন্ত টেনে বার করে বলল সৈনিক
শিকারীদের বুটের কাদা আর কুকুরদের গা চেটে তুলতে থাকায় নোংরা কুটিরের পাঁক, ঘরভরা জলা আর বারুদের গন্ধ, এবং ছুরি-কাঁটার অভাব সত্ত্বেও শিকারীরা চা খেলেন, রাতের খাবার সারলেন এমন তৃপ্তিতে যা সম্ভব কেবল শিকারে। গা-হাত-পা ধুয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে তাঁরা গেলেন ঝাড় দেওয়া বিচালি গোলায়, সহিসেরা যেখানে সাহেবদের জন্য বিছানা করে রেখেছিল।
অন্ধকার হয়ে এলেও শিকারীদের কারো ইচ্ছে হচ্ছিল না ঘুমাবার।
গুলি চালনা, কুকুর, আগেকার শিকার ইত্যাদির স্মৃতি ও কাহিনীর মধ্যে দোল খেয়ে আলাপটা চলল তাঁদের সবাকার আগ্রহজনক প্রসঙ্গ নিয়ে। এরকম নিশা যাপনের মধুরতা, বিচালির সুগন্ধ, ভাঙা গাড়ির (ওঁর মনে হয়েছিল ভাঙা, যদিও শুধু খুলে নেওয়া হয়েছিল সামনের চাকা দুটো) অপূর্বতা, তাঁকে ভোদ্কা খাইয়েছিল যে চাষীরা তাদের সদাশয়তা, নিজ নিজ কর্তার পায়ের কাছে পড়ে থাকা কুকুর ইত্যাদি নিয়ে ইতিমধ্যেই কয়েকবার পুনরুক্ত ভাসেকার উচ্ছ্বাস উপলক্ষে অব্লোন্স্কি বললেন মালতুসের ওখানে তাঁর শিকারের অপরূপ কাহিনী। গত বছর গ্রীষ্মে সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। মালতুস রেলপথের নামকরা একজন মালিক। অব্লোন্স্কি বললেন ভের গুবের্নিয়ায় কি রকম জলা কিনেছেন মালতুস, কিভাবে তা আগলে রাখছেন এবং কিসব গাড়ি আর ডগ্-কার্টে শিকারীদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আর জলার কাছে খাটানো হয়েছিল কেমন তাঁবু আর সেখানে ছিল কত খাবার।
‘তোমাকে আমি বুঝি না’, নিজের তৃণশয্যা থেকে মাথা তুলে বললেন লেভিন; ‘এসব লোকদের কেন তোমার খারাপ লাগে না বুঝি না। লাফিত সহযোগে প্রাতরাশ যে খুবই উপাদেয় তা বুঝি, কিন্তু ঠিক এই বিলাসটাই কি তোমার বিছছিরি লাগে না? এসব লোকেরা আমাদের আগেকার ঠিকা-জমিদারদের মত টাকা কামায় এমনভাবে যে কামাবার সময় লোকের ঘৃণার পাত্র হলেও সে ঘৃণা উপেক্ষা করে আর পরে অসাধু উপায়ে অর্জিত টাকায় আগেকার সে ঘৃণা কিনে নেয়।’
‘ঠিক বলেছেন!’ সায় দিলেন ভাসেকা ভেস্লোভস্কি, ‘ঠিক, ঠিক! অবশ্য অব্লোন্স্কি এটা করছেন ভালো মনে, কিন্তু অন্যেরা তো বলবে যে অব্লোন্স্কিও ভিড়ল।’
‘মোটেই না’, লেভিন টের পাচ্ছিলেন যে তাঁর এই কথায় অব্লোন্স্কি হাসছেন, ‘ধনী কোনো বেনিয়া বা অভিজাতের চেয়ে ওঁকে বেশি অসাধু বলে আমি মনে করি না। এরা আর ওরা টাকা করেছে একই রকম খেটে আর মাথা খাটিয়ে।’
‘কিন্তু কি খাটুনি? একটা পারমিট পেয়ে অন্যকে সেটা বেচে দেওয়া কি খাটুনি হল?’
‘অবশ্যই খাটুনি। এই অর্থে খাটুনি যে উনি বা ওঁর মত লোক না থাকলে রেলপথই হত না।’
‘কিন্তু এ খাটুনি তো চাষী-মজুর বা বুদ্ধিজীবীর মত নয়।’
‘মানলাম, কিন্তু তাঁর ক্রিয়াকলাপ ফল দিচ্ছে—রেলপথ। তবে তুমি তো মনে কর রেলপথ অনাবশ্যক।’
‘না, এটা অন্য প্রশ্ন। আমি মানতে রাজি যে রেলপথের প্রয়োজন আছে, কিন্তু যে টাকাটা খাটুনির সমানুপাতিক নয় তা কামনো অসাধু।’
‘কিন্তু সমানুপাতটা স্থির করবে কে?’
‘অসাধু পন্থায়, কলা-কৌশলে’, সাধু আর অসাধুর মধ্যে যে স্পষ্ট সীমারেখা টানতে পারছেন না তা অনুভব করেই লেভিন বললেন, ‘টাকা করা একটা ব্যাঙ্কের মালিক হওয়ার মত ব্যাপার’, বলে চললেন তিনি; ‘এটা একটা অকল্যাণে, না খেটে বিপুল টাকা পাওয়া, সেই আগেকার ঠিক বন্দোবস্তের মত, শুধু এখন তার চেহারা পালটেছে।রাজা মারা গেছেন, দীর্ঘজীবী হোন রাজা! ঠিকা বন্দোবস্তের হাত থেকে রেহাই পেতে না পেতেই দেখা দিয়েছে রেলপথ, ব্যাংক : এও না খেটে মুনাফা।’
‘এ সবই সম্ভবত খুবই ঠিক এবং বুদ্ধিমন্ত… থাম, ক্রাক!’ চেঁচালেন অব্লোন্স্কি। কুকুরটা নিজেকে আঁচড়াচ্ছিল, বিচালি এলোমেলো করে দিচ্ছিল, তাকে ধমকালেন তিনি, তারপর স্পষ্টতই নিজের যুক্তির ন্যায্যতায় নিঃসন্দেহ হওয়ায় ধীরস্থিরভাবে বললেন, ‘কিন্তু সাধু আর অসাধু শ্রমের মধ্যে ভেদরেখাটা তো তুমি দেখালে না। আমার অধীনস্থ যে বড়বাবু কাজকর্ম আমার চেয়ে ভালো জানলেও আমি যে বেতন পাই তার চেয়ে অনেক বেশি, এটা কি অসাধু?’
