সেটা আরো বেশি ব্যাকুল করছিল লেভিনকে। হোগলা ঝোপের ওপর অবিরাম উড়ছিল স্নাইপগুলো। মাটিতে তাদের ফুরুৎ করে বেরোবার শব্দ আর আকাশে ক্রেঙ্কার ডাক থামছিল না, শোনা যাচ্ছিল তা চারদিক থেকে। যে স্নাইপগুলো আগে থেকে উড়ছিল, তারা মাটিতে বসে পড়ছিল শিকারীদের সামনেই। দুটো বাজপাখির বদলে এখন কয়েক ডজন চিঁচিঁ করে উড়ছিল জলার ওপর
জলার আধখানার বেশি পাড়ি দিয়ে আসার পর লেভিন আর ভেস্লোভস্কি পৌঁছলেন সেই জায়গাটায় যেখানে হোগলা বনে এসে পড়া লম্বা লম্বা ফালিতে ভাগ করা হয়েছে চাষীদের ঘেসো জমি, কোথাও সীমা টানা হয়েছে ঘাস পায়ে দলে, কোথাও কেটে। এসব ফালির ঘাস অর্ধেকই কাটা হয়ে গিয়েছিল।
যেমন ঘাস কেটে ফেলা জায়গায়, তেমনি না-কাটা জায়গাতেও শিকার মেলার আশা না থাকলেও লেভিন অব্লোন্স্কিকে কথা দিয়েছিলেন যে ওঁর সাথে মিলিত হবেন, তাই দু’রকম জায়গা দিয়েই তিনি এগিয়ে চললেন সঙ্গীকে নিয়ে।
‘ওহে শিকারী ভেয়েরা!’ ঘোড়া খুলে রাখা একটা গাড়ির কাছে বসে থাকা একদল চাষীর মধ্যে থেকে একজন ডাকলে তাঁদের। ‘এসো আমাদের সাথে ভোজন হবে! মদও খাব!’
লেভিন এদিক-ওদিক তাকালেন।
‘এসো, এসো, ডর নাই গো!’ ধবধবে সাদা দাঁত কেলিয়ে রোদ্দুরে ঝকমকে একটা সবুজ বোতল তুলে চেঁচালে রক্তিমানন ফুর্তিবাজ দেড়েল একজন চাষী।
ভেস্লোভস্কি ফরাসি ভাষায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি ওরা বলছে?’
‘ভোদ্কা খেতে ডাকছে। ওরাই বোধ হয় ঘেসো মাঠটা ভাগ করেছে। আমি আপত্তি করব না’, লেভিন বললেন একটু চালাকি না করে নয়, আশা করছিলেন যে ভোদ্কার কথায় প্রলুব্ধ হয়ে ভেস্লোভস্কি যাবেন ওদের কাছে।
‘কিন্তু আমাদের নিমন্ত্রণ করছে কেন?’
‘এমনি, ফুর্তি করতে। সত্যি, যান ওদের কাছে। মজা পাবেন।’
‘চলুন যাই, কৌতূহলের ব্যাপার।’
‘যান, যান, মিলে যাবার পথ আপনি খুঁজে পাবেন!’ লেভিন বললেন চেঁচিয়ে আর খুশি হয়ে চেয়ে দেখলেন যে ভেস্লোভস্কি কুঁজো হয়ে, ক্লান্ত পায়ে হোঁচট খেতে খেতে বন্দুক তুলে ধরে জলা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন চাষীদের কাছে।
‘তুমিও এসো গো!’ লেভিনের উদ্দেশে চ্যাঁচাল একজন চাষী, ‘ডর কি! পিঠে খেয়ে দেখবে!’
লেভিনের ভয়ানক ইচ্ছে হচ্ছিল এক টুকরো রুটি আর ভোদ্কা খেতে। জেরবার হয়ে পড়েছিলেন তিনি, টের পাচ্ছিলেন যে কাদায় বসে যাওয়া পা তুলতে হচ্ছে কষ্ট করে, মুহূর্তের জন্য তিনি দ্বিধায় পড়লেন। কিন্তু কুকুর ওদিকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সমস্ত ক্লান্তি অন্তর্ধান করল তৎক্ষণাৎ, কাদা ভেঙে অনায়াসে লেভিন গেলেন কুকুরের কাছে। তাঁর পায়ের কাছ থেকে উড়ে গেল একটা স্নাইপ; লেভিন গুলি করে মারলেন সেটাকে—কুকুর কিন্তু দাঁড়িয়েই রইল। ‘নে!’ কুকুরের কাছ থেকে উঠল আরেকটা। লেভিন গুলি করলেন। কিন্তু দিনটা ছিল অপয়া, গুলি ফসকে গেল। আর যেটাকে মারা গিয়েছিল, খুঁজতে গিয়ে সেটাকেও পেলেন না। গোটা হোগলা ঝোপটা তিনি মাড়ালেন, কিন্তু লাস্কার বিশ্বাস হচ্ছিল না যে তিনি মারতে পেরেছেন, তাই লাস্কাকে যখন খুঁজতে ডাকলেন, সে ভান করল যেন খুঁজছে, কিন্তু খুঁজছিল না।
নিজের সমস্ত অসাফল্যের জন্য তিনি দায়ী করেছিলেন ভেস্লোভস্কিকে, কিন্তু তিনি না থাকাতেও উন্নতি হল না অবস্থার। এখানেও স্নাইপ অনেক, কিন্তু একের পর এক গুলি তাঁর ফসকাল।
সূর্যের তীর্যক রোদে গরম তখনো বেশি। ঘামে ভিজে জবজবে জামা এঁটে বসেছে গায়ের সাথে; পানিতে ভরা বাঁ দিকের বুটটা ভারি হয়ে উঠে প্রতি পদে পচ্পচ্ করে উঠছে; বারুদের থিতানিতে নোংরা মুখ বেয়ে গড়াচ্ছে বিন্দু বিন্দু ঘাম; মুখটা তেতো, নাকে বারুদ আর মরচের গন্ধ; কানে স্নাইপের ক্ষান্তিহীন ফুরুৎ শব্দ; বন্দুকের নল এত গরম যে ছোঁয়া যায় না; বুকের স্পন্দন ঘন ঘন, সংক্ষিপ্ত; উত্তেজনায় হাত কাঁপছে, হোঁচট খাচ্ছে ক্লান্ত পা, জড়িয়ে যাচ্ছে ঘাসের চাপড়ায় আর কাদায়; তাহলেও এগিয়ে গেলেন তিনি, গুলি করে চললেন। শেষ পর্যন্ত লজ্জাকর একটা ব্যর্থতার পর টুপি আর বন্দুক তিনি ছুঁড়ে ফেললেন মাটিতে।
‘না, আত্মস্থ হতে হবে!’ নিজেকে বললেন তিনি। টুপি আর বন্দুক তুলে নিয়ে তিনি লাস্কাকে নিজের কাছে ডাকলেন এবং বেরিয়ে এলেন জলা থেকে। শুকনো ডাঙায় এসে তিনি বসলেন একটা চাঙড়ের ওপর, জুতা খুললেন, বাঁয়ের বুট থেকে পানি ঢেলে ফেললেন, তারপর গেলেন জলায়, মরচের স্বাদ মাখা পানি খেলেন পেট পুরে, বন্দুকের আতপ্ত নল দুটোকে ঠাণ্ডা করলেন পানি মাখিয়ে আর নিজের হাত মুখ ধুলেন। তাজা হয়ে তিনি আবার গেলেন সেই জায়গাটায় যেখানে স্নাইপটা এসে বসেছে, দৃঢ় সংকল্প করলেন যে উত্তেজিত হবেন না।
ভেবেছিলেন সুস্থির থাকবেন, কিন্তু দাঁড়াল সেই একই। পাখিটাকে নিশানা করার আগেই আঙুল তাঁর ঘোড়া টিপে বসল। ব্যাপার গড়াল কেবলই খারাপের দিকে।
যে অ্যালডার ঝোপটার কাছে অব্লোন্স্কির সাথে তাঁর মেলার কথা, জলা থেকে উঠে সেখানে যখন তিনি গেলেন, তখন তাঁর থলেতে মাত্র পাঁচটা পাখি।
অব্লোন্স্কিকে দেখার আগেই তিনি দেখতে পেলেন তাঁর কুকুরকে।
অ্যালডারের পাকানো পাকানো শিকড়ের তল থেকে সে লাফিয়ে এল, জলার দুর্গন্ধ-ভরা পাঁকে সর্বাঙ্গ তার কালো, বিজয়ীর ভঙ্গিতে শুঁকল লাস্কাকে। ক্রাকের পরে অ্যালডার গাছের ছায়ায় দেখা দিল অব্লোন্স্কির দর্শনধারী মূর্তি। রক্তিম মুখে, ঘর্মাক্ত কলেবরে বোতাম খোলা গলায় আগের মতই খোঁড়াতে খোঁড়াতে তিনি এগিয়ে এলেন লেভিনের দিকে।
