কি আপনি করেছেন? করেছেন এই : প্রথমত আপনি টোপ ফেলে বর ধরেছেন, গোটা মস্কো সে কথা বলাবলি করবে এবং যুক্তিসহকারেই। আপনি যদি সান্ধ্য বাসরের আয়োজন করেন, তাহলে সবাইকে ডাকুন। শুধু বাছাই করা পাত্রদের নয়। ডাকুন সমস্ত এই ন্যাকামণিদের (মস্কোর যুবকদের প্রিন্স এই নাম দিয়েছিলেন), পিয়ানোবাদক ভাড়া করুন, নাচানাচি করুক সবাই–আজকের মত কেবল পাত্রদের জোটানো নয়। আমার দেখতেও বিছুছিরি লাগে, বিছুছিরি, আর আপনি যা চেয়েছিলেন–পেয়েছেন, মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছেন মেয়েটার। লেভিন হাজার গুণ ভালো লোক। আর এই পিটার্সবুর্গী সাহেব–এদের বানানো হয় যন্ত্রে, সবাই ওরা একই ধাঁচের এবং সবাই ওঁছা। ও যদি বনেদি ঘরের প্রিন্সও হয়, তাহলেও ওকে কোন দরকার নেই আমার মেয়ের!
‘কিন্তু আমি কি করেছি?
করেছেন এটা…’ রাগে চেঁচিয়ে উঠলেন প্রিন্স।
বাধা দিয়ে প্রিন্স-মহিষী বললেন, ‘তোমার কথা শুনতে গেলে মেয়ের বিয়ে হবে না কখনো। আর তাই যদি হয়, তাহলে গায়েই চলে যাওয়া দরকার।
সেই ভালো।
‘শোনো, আমি কি পাত্র ধরার সন্ধানে আছি? কখনো তা করিনি। নেহাৎ একটা যুবক এবং অতি উত্তম যুবক প্রেমে পড়েছে এবং মনে হয় মেয়েটাও…’।
হ্যাঁ, আপনার মনে হচ্ছে। মেয়েটা যদি সত্যিই প্রেমে পড়ে থাকে আর বিয়ে করার কথা উনি ততটাই ভাবছেন যতটা আমি, তাহলে? ওহ! ওঁকে যদি কখনো চোখে না দেখতে হত!… ‘ও প্রেতবাদ, ও নীস, ও বলনাচ…’, আর এই প্রতিটা শব্দের পর প্রিন্স স্ত্রীকে অনুকরণ করে আধবসা হয়ে অভিবাদনের ভঙ্গি করতে লাগলেন, এই করেই আমরা দুর্ভাগা করে তুলব কিটিকে, এই করে সত্যিই ওর মাথায় ঢুকবে…’
কিন্তু তুমি তা ভাবছ কেন?
‘আমি ভাবছি না, জানি; এ ব্যাপারে আমাদের চোখ আছে, মেয়েদের নেই। একজন লোককে আমি দেখতে পাচ্ছি যার গুরুত্বপূর্ণ সংকল্প আছে, সে লেভিন; তিতির-টিতিরও আমি দেখতে পাই। যেমন এই… শুধু আমোদ আহ্লাদ হলেই যার হল।
মাথায় ঢুকিয়েছ যতসব…’
‘এ সব কথা তোমার মনে পড়বে, যখন আর সময় থাকবে না। যেমন ডল্লির বেলায়।
নাও হয়েছে, হয়েছে। এ সব কথা আর তুলব না’, ডল্লির কথা মনে পড়ায় ওঁকে থামিয়ে দিলেন প্রিন্স-মহিষী।
সে তো তোফা! শুভ রাত্রি!
পরস্পরের ওপর ক্রস করে ওঁরা চুম্বন বিনিময় করলেন। কিন্তু দুজনেই টের পাচ্ছিলেন যে ওঁরা নিজের নিজের মত আঁকড়েই রইলেন। যে যার ঘরে গেলেন স্বামী-স্ত্রী।
প্রথমটায় প্রিন্স-মহিষীর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আজকের সন্ধ্যায় কিটির ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে। ভ্রনস্কির অভিপ্রায়ে কোন সন্দেহই থাকতে পারে না; কিন্তু স্বামীর কথাগুলোয় তিনি গোলমালে পড়লেন। নিজের ঘরে এসে তিনি ঠিক কিটির মতই ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার সামনে কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করলেন : ‘সৃষ্টিকর্তা দয়া কর! সৃষ্টিকর্তা দয়া কর! সৃষ্টিকর্তা দয়া কর!
ষোলো
ভ্রনস্কি জানতেন না–পারিবারিক জীবন কি। যৌবনে তার মা ছিলেন উঁচু সমাজের মনোহারিণী মহিলা। বিয়ে করার সময় এবং বিশেষ করে তার পরে বহু প্রেমলীলা করেছেন তিনি, গোটা সমাজই তা জানত। পিতাকে ভ্রনস্কির প্রায় মনেই পড়ে না। তিনি শিক্ষা পান পেজেস কোরে।
স্কুল থেকে চমৎকার তরুণ অফিসার হয়ে বেরিয়ে এসেই তিনি পিটার্সবুর্গের ধনী সামরিক অফিসারদের মহলে গিয়ে পড়েন। কখনো কখনো সমাজে গেলেও তার প্রেমের সমস্ত আকর্ষণগুলো ছিল সমাজের বাইরে।
বিলাসবহুল আর রুক্ষ পিটার্সবুর্গ জীবনের পর ভ্রনস্কি মস্কোতে প্রথম অনুভব করলেন সমাজের একটা মনোরম নিষ্পাপ বালিকার সাথে সান্নিধ্যের মাধুর্য, যে ভালোবেসেছে তাকে। কিটির সাথে তার সম্পর্কে খারাপ কিছু থাকতে পারে, এটা তার কল্পনাতেই আসেনি। বলে তিনি নাচতেন প্রধানত তার সাথেই; খেতেন ওঁদের বাড়িতে। তার সাথে তিনি যে সব কথা বলতেন, সাধারণতই তা বলা হয়ে থাকে সমাজে, যত বাজে কথা, কিন্তু সেই বাজে কথাকেই তিনি অজান্তে কিটির কাছে বিশেষ অর্থময় করে তুলতেন। সবার সমক্ষে যা বলতে পারেন না তেমন কোন কথা কিটিকে না বললেও তিনি অনুভব করছিলেন যে কিটি ক্রমেই তার মুখাপেক্ষী হয়ে উঠছে এবং যত তা অনুভব করছিলেন ততই সেটা তার ভালো লাগছিল, কিটির প্রতি তার মনোভাব হয়ে উঠছিল কোমল। তিনি জানতেন না যে, কিটির কাছে তার এই ধরনের আচরণের একটা নির্দিষ্ট নাম আছে। এটা হল বিবাহের সংকল্প না করে বালিকার মন ভোলানো আর এই ভোলানোটাই হল তাঁর মত চমৎকার যুবকদের ভেতর প্রচলিত গর্হিত আচরণের একটা। তাঁর মনে হচ্ছিল এই তৃপ্তি আবিষ্কার করেছেন তিনিই প্রথম এবং সে আবিষ্কারে পরম আনন্দ পাচ্ছিলেন তিনি।
সে সন্ধ্যায় কিটির মা-বাবা কি কথা বলেছেন তা যদি তিনি শুনতে পেতেন, তিনি যদি নিজেকে পরিবারের দৃষ্টিকোণে নিয়ে গিয়ে জানতে পারতেন যে কিটিকে তিনি বিয়ে না করলে সে অসুখী হবে, তাহলে ভয়ানক অবাক লাগত তার এবং সেটা বিশ্বাস করতে পারতেন না। তিনি বিশ্বাসই করতে পারতেন না যে তাকে এবং বড় কথা কিটিকে যা এমন তৃপ্তি দিচ্ছে সেটা খারাপ কিছু হতে পারে। তার যে বিয়ে করা উচিত, এটা তিনি বিশ্বাস করতে পারতেন আরো কম।
বিয়ে তার কাছে সম্ভবপর বলে কদাচ মনে হয়নি। পারিবারিক জীবন তিনি শুধু যে ভালোবাসতেন না তাই নয়, যে অবিবাহিত দুনিয়ায় তার বাস, সেখানকার সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে পরিবারে, বিশেষ করে স্বামী হিসেবে নিজেকে কল্পনা করা তার কাছে মনে হত বিজাতীয়, তার চেয়েও বেশি হাস্যকর। কিটির মা-বাবা কি বলাবলি করেছেন তাঁর কোন সন্দেহ না থাকলেও সে সন্ধ্যায় শ্যেরবাৎস্কিদের ওখান থেকে বেরিয়ে তিনি অনুভব করছিলেন যে তার আর কিটির মধ্যে যে গোপন আত্মিক সংযোগ ছিল, সেটা সে সন্ধ্যায় এত দৃঢ়ীভূত হয়ে উঠেছে যে কিছু-একটা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। কিন্তু কি করা সম্ভব এবং উচিত সেটা তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না।
