‘কিভাবে আমরা যাব? জলা চমৎকার, তা দেখতে পাচ্ছি, বাজপাখিও আছে’, হোগলাগুলোর ওপর ভাসমান দুটো বড় বড় পাখি দেখিয়ে বললেন অব্লোন্স্কি, ‘যেখানে বাজপাখি আছে, সেখানে শিকারও থাকবে নিশ্চয়। ‘
‘হ্যাঁ, ওই দেখুন আপনারা’, খানিকটা বিমর্ষ মুখে হাই-বুট টেনে, বন্দুকের লক পরীক্ষা করে লেভিন বললেন, ‘ওই হোগলা ঝাড়টা দেখতে পাচ্ছেন? নদীর ডান দিক বরাবর বিশাল এক আধ-কাটা ঘাসের স্যাঁৎসেঁতে মাঠে কালোয় সবুজে গাঢ় হয়ে আসা হোগলার একটা চর দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘জলা শুরু হচ্ছে এখান থেকে, সোজা আমাদের সামনে। ঐ যে, যে-জায়গাটা বেশি সবুজ। এখান থেকে তা গেছে ডাইনে, যেখানে ঘোড়া চরছে; সেখানে ঘাসের চাপড়াগুলোর মধ্যে বড় স্নাইপ থাকে, আর তা চলে গেছে গোটা হোগলা বন ঘিরে, সোজা অ্যালডার ঝোপ আর মিল পর্যন্ত। আর ঐ দেখুন, যেখানে খাঁড়িটা রয়েছে। এটা সবচেয়ে ভালো জায়গা। একবার ওখানে আমি সতেরটা স্নাইপ মারি। কুকুর নিয়ে আমরা ভিন্ন ভিন্ন দিকে চলে গিয়ে মিলব মিলটার ওখানে।
‘তাহলে কে ডানে যাবে, কে বাঁয়ে?’ জিজ্ঞেস করলেন অব্লোন্স্কি। ‘ডানের দিকটা চওড়া, আপনারা দুজনে যান, আমি বাঁয়ে’, তিনি বললেন এমনভাবে যেন ব্যাপারটা কিছুই নয়।
‘চমৎকার! আমরা ওঁকে হারিয়ে দেব। চলুন যাই, চলুন!’ কথাটা লুফে নিলেন ভাসেকা।
রাজি না হয়ে লেভিন পারলেন না, দু’ভাগ হলেন ওঁরা।
জলায় পা দেওয়া মাত্র দুটো কুকুরই শুঁকতে শুঁকতে ছুটল একটা জায়গার দিকে, পানি যেখানে মরচে রঙা। লাস্কার এই সাবধান অনির্দিষ্ট অনুসন্ধান লেভিনের জানা; জায়গাটাও তিনি চিনতেন এবং আশা করছিলেন যে উঠবে এক ঝাঁক পাখি।
‘ভেস্লোভস্কি, আমার পাশে পাশে আসুন, পাশে পাশে!’ পেছনে পানি ছপছপ করে হাঁটছেন যে সঙ্গীটি, তাঁকে বললেন লেভিন আড়ষ্ট গলায়, কলপেনস্কি জলায় সেই আচমকা গুলিটার পর তাঁর বন্দুকের নল কোন দিকে ঘোরানো সেটায় অজ্ঞাতসারেই আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন লেভিন।
‘না, আমি আপনার বাধা হয়ে থাকব না, ভাববেন না আমাকে নিয়ে।’
কিন্তু আপনার থেকেই লেভিনের ভাবনা হচ্ছিল, মনে পড়ল বিদায় দেবার সময় কিটির কথাটা : ‘দেখো, দুজন দুজনকে গুলি করে বসো না যেন।’ একে অপরকে এড়িয়ে, প্রত্যেকেই নিজ নিজ সূত্র ধরে কাছিয়ে আসছিল কুকুর দুটো; স্নাইপের প্রতীক্ষাটা ছিল এতই প্রবল যে মরচে রঙা জলা থেকে টেনে তোলা মচমচ শব্দটা লেভিনের মনে হচ্ছিল স্নাইপের ডাক, বন্দুক বাগিয়ে ধরলেন তিনি।
‘গুম, গুম!’ শোনা গেল একেবারে কানের কাছেই। জলা থেকে উঠে একঝাঁক হাঁস উঁচুতে পাল্লার অনেক বাইরে উড়ে আসছিল শিকারীদের দিকে, ভাসেকা গুলি করেছেন তাদের। লেভিন ফিরে তাকাতে না তাকাতেই ফুরুৎ করে বেরোল একটা, দুটো, তিনটা, একের পর এক আরো আটটা স্নাইপ।
একটা পাখি তার আঁকাবাঁকা ওড়া শুরু করার মুহূর্তেই তাকে ঘায়েল করলেন অব্লোন্স্কি, একটা দলার মত ঝুপ করে সে পড়ল জলায়। নিচুতে হোগলা বনের দিকে উড়ে যাচ্ছিল আরেকটা পাখি। তাড়াহুড়ো না করে অব্লোন্স্কি তাক করলেন, গুলির শব্দের সাথে সাথে পাখিটাও পড়ে গেল; দেখা যাচ্ছিল কেটে ফেলা হোগলা মাঠে কিভাবে সে তার একটা অক্ষত, নিচের দিকে সাদা রঙের ডানা ঝাপটিয়ে লাফাচ্ছে।
লেভিন তেমন সৌভাগ্যবান হননি : প্রথম স্নাইপটাকে তিনি গুলি করেন বড় বেশি কাছ থেকে এবং গুলি ফসকে যায়; পাখিটা ওপরে উঠতে শুরু করলেন তার দিকে তাক করছিলেন, এমন সময় আরো একটা তাঁর পায়ের কাছ থেকে উড়ে গিয়ে মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করল, ফস্কালেন দ্বিতীয়বার
বন্দুকে যখন আবার গুলি ভরা হচ্ছিল, আরো একটা স্নাইপ উড়ল। ভেস্লোভস্কির গুলি ভরা ইতিমধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ায় পানির ওপর তিনি ছররা গুলি চালালেন দু’বার। অব্লোন্স্কি তাঁর স্নাইপ দুটো জোগাড় করে জ্বলজ্বলে চোখে চাইলেন লেভিনের দিকে।
‘এবার ভাগাভাগি হওয়া যাক’, এই বলে অব্লোন্স্কি বাঁ পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বন্দুক বাগিয়ে শিস দিয়ে ডাকলেন তাঁর কুকুরকে এবং চললেন একদিক ধরে। লেভিন আর ভেস্লোভস্কি গেলেন অন্যদিকে।
প্রথম গুলিটা ফসকালে লেভিন সব সময়ই উত্তেজিত হয়ে রেগে উঠতেন আর সারা দিনটাই তাঁর বন্দুক চলতো বাজে। আজকেও তাই হল। স্নাইপ দেখা গেল অনেক। কুকুরের পায়ের কাছ থেকে, শিকারীদের পায়ের কাছ থেকে অবিরাম উড়ে যেতে থাকল পাখিগুলো, ফলে লেভিন তাঁর লোকসান পুষিয়ে নিতে পারত; কিন্তু যত বেশি তিনি গুলি করলেন তত বেশি তাঁর মাথা হেঁট হল ভেস্লোভস্কির কাছে, যিনি পাল্লার মধ্যে হোক, বাইরে হোক ফুর্তিতে গুলি চালিয়ে যাচ্ছিলেন, কিছুই মারা পড়ছিল না এবং তাতে বিব্রত বোধ করছিলেন না একটুও। লেভিন তাড়াহুড়া করছিলেন, ধৈর্য ধরতে পারছিলেন না, ক্রমেই উত্তেজিত হয়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছলেন যে গুলি করতে লাগলেন পাখি মারার আশা না রেখে। মনে হল লাস্কা যেন সেটা বুঝেছে। পাখি খজতে লাগল সে আরও আলস্যে, শিকারীদের দিকে তাকাতে থাকল হতবুদ্ধি অথবা ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে। গুলি চলছিল একের পর এক। শিকারীদের ঘিরে রইল বারুদের ধোঁয়া, অথচ লেভিনের প্রকাণ্ড, প্রশস্ত থলেটায় মাত্র তিনটা শোচনীয় ছোট স্নাইপ। তাও তার একটা মেরেছে ভেস্লোভস্কি, অন্যটা পড়েছে দুজনেরই গুলিতে। তবে জলার অন্যদিকে শোনা যাচ্ছিল অব্লোন্স্কির ঘন ঘন নয়, তবে লেভিনের মনে হচ্ছিল মোক্ষম গুলির শব্দ আর প্রায় প্রতিটি গুলির পরেই কানে আসছিল : ‘ক্রাক, ক্রাক, নিয়ে আয়!’
