‘এবার আপনি যান, আমি থাকছি ঘোড়ার কাছে’, বললেন তিনি। শিকারীর ঈর্ষা কুরে কুরে খেতে শুরু করেছিল লেভিনকে। ভেস্লোভস্কির হাতে লাগাম দিয়ে তিনি চলে গেলেন জলায়।
লাস্কা অনেকক্ষণ ধরে করুণ সুরে কেঁউ-কেঁউ করছিল, অভিযোগ করছিল তার প্রতি অন্যায়ের, এখন সে সোজা ছুটে গেল লেভিনের পরিচিত ঘাসের চাপড়ায় আকীর্ণ নির্ভরযোগ্য একটা জায়গায় যেখানে ক্রাক যায়নি।
‘ওকে থামাচ্ছ না কেন?’ চেঁচালেন অব্লোন্স্কি।
‘ও ভয় পাইয়ে দেবে না’, জবাব দিলেন লেভিন। নিজের কুকুরের জন্য আনন্দ হচ্ছিল তাঁর, চললেন তার পেছু পেছ্।
চেনা চাপড়াগুলোর দিকে লাস্কা যতই কাছিয়ে আসছিল, ততই তার অন্বেষণে দেখা দিচ্ছিল একটা গুরুত্বের ভাব। জলার ছোট্ট একটা পাখি শুধু মুহূর্তের জন্য বিমনা করেছিল তাকে। লাস্কা চাপড়াগুলোকে একটা পাক দিয়ে দ্বিতীয় পাক দিতে যাচ্ছিল, হঠাৎ কেঁপে উঠে নিথর হয়ে গেল।
‘এসো, এসো স্তিভা!’ লেভিন চিৎকার করে ডাকলেন। টের পাচ্ছিলেন তিনি বুক তাঁর কি প্রচণ্ড ঢিপঢিপ করছে, হঠাৎ যেন তাঁর উত্তেজিত কর্ণকুহরে কি-একটা জানলা খুলে গিয়েছে আর সমস্ত শব্দ দূরত্বের বোধ না রেখেই এলোমেলোভাবে কিন্তু প্রচণ্ডরকম ঘা দিচ্ছে তাঁকে। অব্লোন্স্কির পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলেন তিনি আর মন হচ্ছিল তা যেন দূরে ঘোড়ার খুর ঠোকার শব্দ, যে চাপড়ায় তিনি পা দিয়েছিলেন তার কোণে শিকড় সমেত উপড়ে আসা ঘাসের ঠুনকো শব্দ শুনতে পেলেন আর মনে হল তাঁর সেটা স্নাইপ ওড়ার শব্দ। পেছনে খানিক দূরে পানিতে ছপছপ শব্দ, কিন্তু সেটা কি ধরতে পারলেন না।
‘পা রাখার জায়গা খুঁজে তিনি এগিয়ে গেলেন কুকুরের দিকে।
‘নে!’
বড় নয়, ছোট একটা স্নাইপ উড়ে গেল কুকুরের কাছ থেকে লেভিন বন্দুক তুললেন, কিন্তু যেই তাক করতে যাবেন ঠিক সেই সময়েই ছপছপানিটা বেড়ে উঠল, কাছিয়ে এল, আর সেই শব্দের সাথে যোগ দিল ভেস্লোভস্কির গলা, অদ্ভুত রকম চিৎকার করে কি যেন বলছেন। লেভিন দেখতে পেলেন যে পাখিটাকে তিনি তাক করেছেন পেছন থেকে, যেটা উচিত নয়, তা সত্ত্বেও গুলি করলেন।
গুলি যে ফসকেছে সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে লেভিন ফিরে তাকালেন এবং দেখলেন যে গাড়ি-ঘোড়া রাস্তায় আর নেই, জলায়।
শিকার দেখার জন্য ভেস্লোভস্কি জলায় গাড়ি চালিয়ে আসেন এবং ঘোড়াগুলোকে পাঁকে আটকে ফেলেন। ‘চুলায় যা তুই!’ আটকে যাওয়া গাড়ির কাছে ফিরে মনে মনে উচ্চারণ করলেন লেভিন, ‘কেন এলেন এখানে?’ শুকনো গলায় ওঁকে তিনি বলে কোচোয়ানকে ডাক দিয়ে ঘোড়া খুলতে লাগলেন।
লেভিনের এই জন্য রাগ হয়ে গিয়েছিল যে তিনি শিকারও ফস্কালেন, ঘোড়াগুলোও আটকে পড়েছে, আর প্রধান কথা, ঘোড়া খোলার জন্য অব্লোন্স্কি বা ভেস্লোভস্কি কেউই তাঁকে আর কোচোয়ানকে সাহায্য করছেন না, কেননা ঘোড়ার জোতটা কি ব্যাপার সে সম্পর্কে দুজনের কারুরই সামান্যতম ধারণাও ছিল না। জায়গাটা একেবারে শুকোন ছিল, ভাসেকার এই নিশ্চিতিদানে একটা কথাও না বলে লেভিন ঘোড়াগুলোকে খুলে আনার জন্য নীরবে খেটে চললেন কোচোয়ানের সাথে। কিন্তু পরে, কাজের উত্তেজনায় এবং এই দেখে যে মাডগার্ড ধরে ভেস্লোভস্কি গাড়িটাকে এত মন দিয়ে প্রাণপণে টানছেন যে সেটাকে ভেঙেই ফেলবেন বুঝি, লেভিন নিজেকে এই বলে ভর্ৎসনা করলেন যে গতকালকার অনুভূতির প্রভাবে ভেস্লোভস্কির সাথে তিনি বড় বেশি নিষ্প্রাণ ব্যবহার করেছেন, বিশেষ রকমের সৌজন্য দেখিয়ে চেষ্টা করলেন নিজের এই রুক্ষতাটা মুছে ফেলতে। যখন সব ঠিকঠাক হয়ে গেল, গাড়ি দাঁড়াল রাস্তায়, লেভিন খাবার দিতে বললেন।
‘ভালো খিদে মানে বিবেকও ভালো। এই কুক্কুটশাবক যাচ্ছে আমার প্রাণের গভীরে।’ আবার খুশি হয়ে উঠে দ্বিতীয় কুক্কুটশাবকটিকে শেষ করে ফরাসি ভাষায় ইয়ার্কি করলেন ভাসেকা। ‘তাহলে আমাদের বিপদ ঘুচেছে; এখন সব চলবে ভালোয় ভালোয়। শুধু আমি আমার দোষের জন্য কোচোয়ানের বাক্সে বসতে বাধ্য। তাই না? এ্যা? উঁহু, আমি অটোমেডন। দেখুন-না কেমন করে আমি আপনাদের নিয়ে যাই!’ লেভিন কোচোয়ানকে বাক্সে উঠতে দিতে বলায় লাগাম না ছেড়ে জবাব দিলেন তিনি। ‘উঁহু, আমাকে পাপ স্খালন করতেই হবে আর কোচোয়ানের বাক্সে আমার চমৎকার লাগে।’ গাড়ি ছেড়ে দিলেন তিনি।
লেভিনের খানিকটা ভয় হচ্ছিল যে ঘোড়াগুলোকে উনি কষ্ট দেবেন, বিশেষ করে বাঁয়ের পাটকিলেটাকে যেটাকে তিনি সামলাতে পারছিলেন না; কিন্তু অজ্ঞাতসারেই ওঁর ফুর্তিতে লেভিন আত্মসমর্পণ করলেন, বাক্সে বসে সারা রাস্তা উনি যে রোমান্সগুলো গেছে যাচ্ছিলেন, শুনতে লাগলেন তা অথবা দেখতে লাগলেন ইংরেজ কিভাবে চার ঘোড়ার গাড়ি চালায় তার অভিনয়। খাওয়া-দাওয়ার পর অতি ফুর্তির মেজাজে তাঁরা পৌঁছলেন গভজ্দেভো জলায়।
আন্না কারেনিনা – ৬.১০
দশ
ভাসেকা ঘোড়াগুলোকে এমন জোর হাঁকিয়েছিলেন যে জলায় তাঁরা বড় বেশি আগেই এসে পড়েন, ফলে তখনো গরম যায়নি।
তাঁদের যাত্রার যা প্রধান লক্ষ্য, বিস্তীর্ণ এই জলাটার কাছে আসতে আসতে লেভিন অজ্ঞাতসারেই ভাবছিলেন কি করে ভাসেন্কার কাছ থেকে রেহাই পেয়ে অবাধে হাঁটা যায়। স্পষ্টতই অব্লোন্স্কিও তাই চাইছিলেন। লেভিন তাঁর মুখে দেখলেন দুশ্চিন্তার ছাপ, শিকার শুরুর আগে সত্যিকার শিকারীদের ক্ষেত্রে যা দেখা যায়, দেখলেন তাঁর স্বভাবসিদ্ধ খানিকটা সেই ধূর্ততা।
