ভাসেকার ভারি ভালো লেগেছিল জোয়ালের বাইরে বাঁয়ে বাঁধা দেন স্তেপ অঞ্চলের ঘোড়াটাকে। কেবলি তারিফ করছিলেন তার।
‘কি চমৎকার হয়ে স্তেপের ঘোড়ায় চেপে স্তেপে ছোট, অ্যাঁ? তাই না?’ বলছিলেন তিনি।
স্তেপের ঘোড়ায় চেপে তিনি যে ছুটছেন, নিজের সম্পর্কে তাঁর এই কল্পনাটা খানিকটা উদ্দাম, কাব্যিক, বাজে; কিন্তু তাঁর সরলতা, বিশেষ করে তাঁর রূপ, মিষ্টি হাসি, সুশ্রী ভঙ্গিমার সাথে মিলে খুবই আকর্ষণীয় লাগছিল। তাঁর স্বভাবটাই লেভিনের কাছে মনোরম বলে, নাকি গতকালের পাপ স্খালনের জন্য তাঁর মধ্যে সবকিছু ভালো দেখতে চাইচ্ছেন বলে, সে যাই হোক, লেভিনের ভালো লাগল তাঁর সঙ্গ।
তিন ভার্স্ট চলে যাবার পর ভেস্লোভস্কির হঠাৎ টনক নড়ল যে চুরুটের বাক্স আর মানি ব্যাগ নেই, মনে করতে পারলেন না ওগুলো হারিয়েছেন না ফেলে এসেছেন টেবিলে। মানি ব্যাগে ছিল তিনশ সত্তর রুল, তাই ব্যাপারটা ফেলে রাখা যায় না।
‘জানেন লেভিন, আমি এই দনের ঘোড়াটায় বাড়ি ফিরে যাই। চমৎকার হবে, এ্যা?’ এই বলে প্ৰায় নামতে যাচ্ছিলেন তিনি।
‘আপনি কেন?’ ভাসেন্কার ওজন অন্তত ছয় পুদ হবার কথা, মনে মনে এই হিসেব করে লেভিন বললেন, ‘আমি কোচোয়ানকে পাঠাচ্ছি।’
কোচোয়ান বাড়তি ঘোড়াটায় চেপে চলে গেল, লেভিন নিজে গাড়ি চালাতে লাগলেন।
নয়
‘তা আমাদের পথটা কেমন হবে? বুঝিয়ে দাও তো ভালো করে’, বললেন অব্লোন্স্কি।
‘এই আমাদের পরিকল্পনা : এখন আমরা যাচ্ছি গভদেভোতে। গভজ্দেবোর এদিকটায় বড় স্নাইপের জলা। আর ওদিকটায় অপূর্ব স্নাইপ ঝিল, বড় স্নাইপও আছে। এখন গরম, আমরা পৌঁছব (বিশ ভার্স্ট) সন্ধের দিকে। সন্ধ্যার মাঠে কিছু শিকার করা যাবে, রাত কাটাব আর বড় জলা কাল সকালে।’
‘আর পথে কিছু পড়বে না?
‘আছে, কিন্তু দেরি হয়ে যাবে। তা ছাড়া গরম। দুটো চমৎকার জায়গা আছে, কিন্তু কিছু মিলবে কিনা সন্দেহ।’ লেভিনের নিজেরই ইচ্ছে হচ্ছিল জায়গা দুটোয় যাবার, কিন্তু বাড়ি থেকে তা বেশি দূরে নয়, সব সময়ই তিনি শিকারে যেতে পারেন সেখানে, তাছাড়া জায়গাটা ছোট, তিন শিকারী ধরবে না। সেই জন্য কিছু মিলবে কিনা সন্দেহ বলে তিনি মিথ্যাচার করেন। শিগগিরই ছোট জলাটার কাছে এসে গেল গাড়ি। লেভিন চেয়েছিলেন পাশ কাটিয়ে চলে যাবেন, কিন্তু অব্লোন্স্কির অভিজ্ঞ শিকারী চোখ রাস্তা থেকে নজরে পড়া জলো জায়গাটা শিকারের জায়গা বলে ধরে ফেলল।
‘যাব নাকি?’ ছোট জলাটা দেখিয়ে বললেন তিনি।
‘লেভিন, চলুন যাই! কি চমৎকার!’ অনুরোধ করতে লাগলেন ভাসেকা ভেস্লোভস্কি, ফলে লেভিন রাজি না হয়ে পারলেন না।
গাড়ি থামতে না থামতেই কুকুর দুটো পাল্লাপাল্লি করে ছুটল জলার দিকে।
‘ক্রাক! লাস্কা!…’
কুকুর দুটো ফিরে এল।
‘তিনজনের পক্ষে বড় ঘেঁষাঘেঁষি হবে। আমি এইখানেই থাকব’, লেভিন বললেন এই আশায় যে পিউইট ছাড়া আর কিছু ওঁরা পাবেন না। কুকুর দেখে তারা পালায় আর এখন জলার ওপর দুলে দুলে উড়ে করুণ কান্না জুড়েছে।
‘উঁহু! চলুন লেভিন, চলুন একসাথে!’ ডাকলেন ভেস্লোভস্কি।
‘সত্যিই ঘেঁষাঘেঁষি। লাস্কা আবার, লাস্কা! দুটো কুকুর কি আপনার দরকার হবে?’
গাড়ির কাছে রয়ে গেলেন লেভিন, ঈর্ষার দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন শিকারীদের। গোটা জলা তাঁরা পাড়ি দিলেন। পিউইট ছাড়া কিছুই ছিল না জলায়, তার একটা মেরেছিলেন ভাসেকা
‘দেখলেন তো’, লেভিন বললেন, ‘জলার জন্য আমি দ্বিধা করিনি, শুধু সময় নষ্ট।’
‘না, তাহলেও বেশ ফুর্তি হল। আপনি দেখেছিলেন?’ হাতে বন্দুক আর পাখিটা নিয়ে আনাড়ির মত গাড়িতে উঠতে উঠতে বললেন ভাসেকা ভেস্লোভস্কি, ‘কি চমৎকার মারলাম এটাকে! তাই না? কিন্তু সত্যিকার জলায় শিগগিরই পৌঁছব কি? হঠাৎ হেঁচকা মেরে ছুটতে গেল ঘোড়াগুলো, কার যেন বন্দুকের নলে ঘা লাগল লেভিনের মাথায়, শোনা গেল গুলি ছোঁড়ার আওয়াজ। আওয়াজটা অবশ্য আগেই হয়েছিল, কিন্তু লেভিনের কাছে ঘটনা এইরকম লেগেছিল। ব্যাপারটা হয়েছিল এই যে ভেস্লোভস্কি তাঁর বন্দুক লক করতে গিয়ে একটা ঘোড়া খাড়াই রেখেছিলেন। কারো ক্ষতি না করে কার্তুজ ঢুকে যায় মাটিতে। অব্লোন্স্কি ভর্ৎসনায় মাথা দুলিয়ে মৃদু হাসলেন ভেস্লোভস্কির দিকে চেয়ে। কিন্তু তিরস্কার করতে মন হচ্ছিল না লেভিনের। প্রথমত, যে কোন রকম তিরস্কারই মনে হতে পারত কেটে যাওয়া বিপদটার জন্য ভয় আর কপালের ফোলাটার কারণে; দ্বিতীয়ত, ভেস্লোভস্কি প্রথমটা এত সরল রকমে মুষড়ে পড়েছিলেন এবং পরে সকলের আঁকানিতে এমন ভালোমানুষি চিত্তজয়ী হাসি হাসতে লাগলেন যে নিজেও না হেসে পারা গেল না।
দ্বিতীয় জলাটার কাছে তাঁরা যখন এলেন, যেটা বেশ বড় গোছের, শিকারে অনেক সময় নেবার কথা, লেভিন বোঝালেন না নামতে। কিন্তু ভেস্লোভস্কি আবার অনুরোধ করতে লাগলেন। জলাটা সরু বলে লেভিন আবার অতিথিবৎসল গৃহস্বামীর মত রয়ে গেলেন গাড়ির কাছে
পৌঁছতেই ক্রাক সোজা ছুটল ঘেসো চাপড়াগুলোর দিকে। কুকুরটার পেছনে প্রথম ছুটলেন ভাসেকা ভেস্লোভস্কি। অবলোন্স্কি তাঁদের কাছে পৌঁছতে না পৌঁছতেই উড়ে উঠল একটা বড় স্নাইপ। ভেস্লোভস্কির গুলি ফসকাল, পাখিটা উড়ে গিয়ে আবার বসল একটা ঘেষো মাঠে। সেটা ছেড়ে দেওয়া হল ভেস্লোভস্কির জন্য। ক্রাক আবার পাখিটাকে খুঁজে বার করে দাঁড়িয়ে পড়ল, ভেস্লোভস্কি সেটাকে মেরে ফিরে গেল গাড়ির কাছে।
