এর আগে ভাসেকা ভেস্লোভস্কি জানতেন না যে শিকারীর সত্যিকারের চালিয়াতি হল ন্যাতাকানি পরা কিন্তু সেরা কিসিমের হাতিয়ার রাখা। দীনহীন বেশে অব্লোন্স্কির জ্বলজ্বলে, সুশ্রী, অভিজাত হৃষ্টপুষ্ট মূর্তিটা দেখে তিনি এখন সেটা বুঝলেন এবং স্থির করলেন পরের বার শিকারে অবশ্য-অবশ্যই ওই রকমের বেশ ধারণ করবেন।
‘কিন্তু আমাদের, কর্তাটি কোথায়?’ জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
‘তরুণী ভার্যা’, হেসে বললেন অব্লোন্স্কি।
‘হ্যাঁ, এবং অমন মনোহারিণী।’
‘ওর তো পোশাক পরা হয়ে গিয়েছিল। নিশ্চয় আবার গেছে বৌয়ের কাছে।’
অব্লোন্স্কি ঠিকই অনুমান করেছিলেন। লেভিন স্ত্রীর কাছে আবার গিয়েছিলেন আরো একবার গতকালের আহাম্মকির জন্য সে ক্ষমা করেছে কিনা জিজ্ঞেস করতে এবং তা ছাড়াও খ্রিস্টের দোহাই দিয়ে অনুরোধ করতে সে যেন সাবধানে থাকে। প্রধান কথা, ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে সরে থাকে যেন, সব সময়ই তারা ধাক্কা দিতে পারে তাকে। তা ছাড়া উনি দু’দিনের জন্য চলে যাচ্ছেন তাতে কিটি যে পরের দিন সকালে সে যেন সওয়ারের হাতে অবশ্যই অন্তত দুটো কথা লিখে পাঠায় যাতে তিনি জানতে পারেন যে ভালো আছে সে
দু’দিন স্বামীকে ছেড়ে থাকতে হবে, এতে কষ্ট হচ্ছিল কিটির, কিন্তু লেভিনের সজীব মূর্তি, শিকারীর হাই-বুট আর সাদা ব্লাউজে যা কেমন যেন আরো বড় আর বলিষ্ঠ মনে হচ্ছিল, এবং তার কাছে দুর্বোধ্য শিকারের উত্তেজনার দীপ্তি—এসব দেখে লেভিনের আনন্দের জন্য কিটি নিজের দুঃখটুকু ভুলে গেল, ফুর্তি করেই বিদায় দিলে তাঁকে।
‘মাপ করবেন সাহেবেরা!’ গাড়ি-বারান্দায় ছুটে এসে তিনি বললেন, ‘প্রাতরাশ দিয়েছিল? পাটকিলে রঙের
ঘোড়াটা ডাইনে কেন? যাক-গে কিছু এসে যাবে না। লাস্কা নেমে আয়, বসবি।’
বলদগুলোর কি করা হবে জিজ্ঞেস করতে এসেছিল গোপালক, গাড়ি-বারান্দার কাছে সে অপেক্ষা করছিল। তার দিকে ফিরে লেভিন বললেন, ‘পালে ছেড়ে দাও। মাপ করবেন, আরও এক বেটা ছ্যাঁচোড় আসছে।’
লেভিন উঠে বসেছিলেন গাড়িতে, সেখান থেকে নেমে গেলেন ভাড়া করা ছুতারের কাছে, মাপকাঠি হাতে সে গাড়ি-বারান্দার দিকে আসছিল।
‘কাল সেরেস্তোয় এলে না আর এখন আমাকে আটকে রাখছো। কি ব্যাপার?’
‘আরও একটা পাক দিতে আজ্ঞা করুন। মাত্র তিনটা ধাপ জুড়লেই চলবে। একেবারে যা চাই। নির্ঝঞ্ঝাট হবে।’
‘আমার কথা শুনলে পারতে’, বিরক্তিতে বললেন লেভিন, ‘বলেছিলাম আগে ফ্রেমটা কর, পরে সিঁড়ির ধাপগুলো বানিয়ো। এখন আর উপায় নেই, আমি যেমন বলেছিলাম তাই কর। নতুন করে বানাও।’
ব্যাপারটা হয়েছিল এই : বাড়ির একটা নতুন অংশ করতে গিয়ে ছুতার সিঁড়িটা আলাদা করে বানিয়ে তার উচ্চতার হিসেবে না করে তা নষ্ট করে ফেলে এবং তা যথাস্থানে বসাতে গিয়ে দেখা গেল তা ঢালু হয়ে গেছে। এখন সে ওই সিঁড়িটাই রেখে তার সাথে তিনটা ধাপ যোগ করতে চাইছে।
‘অনেক ভালো হবে।’
‘তিন ধাপ নিয়ে ওটা কোন কাজে লাগবে?’
‘দেখুন কেনে’, অবজ্ঞার হাসি হেসে বলল ছুতার, ‘একেবারে ফ্রেমে ঢুকে যাবে। মানে শুরু করতে হবে নিচু থেকে’, বললে একটা নিশ্চিতির ভঙ্গি করে। ‘এক-ধাপ দু’ধাপ করে লেগে যাবে একদম।’
‘লম্বায় যে আরো তিন ধাপ… কোথায় তা পৌঁছবে?’
‘মানে নিচু থেকে শুরু করলে পৌঁছে যাবে’, একগুঁয়ের মত নিশ্চিত কণ্ঠে বলল ছুতার।
‘দেয়াল ফুঁড়ে একেবারে সিলিঙের নিচে।’
‘আজ্ঞে দেখুন কেনে—নিচু থেকে যে শুরু হচ্ছে। এক ধাপ, দু’ধাপ করে বাস—পৌঁছে যাবে।’
বন্দুকের নল পরিষ্কার করার একটা শিক নিয়ে ধুলোর মধ্যে লেভিন সিঁড়ি এঁকে দেখাতে লাগলেন তাকে।
‘এখন দেখছো তো?’
‘যা বলবেন’, ছুতার বলল, হঠাৎ চোখ তার জ্বলজ্বল করে উঠল, মনে হল শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা তার মাথায় ঢুকেছে, ‘বোঝা যাচ্ছে ব্যাপারটা, তাহলে নতুন করে বানাতে হবে।’
‘হ্যাঁ, তাই কর যা বললাম!’ গাড়িতে উঠতে উঠতে চিৎকার করে বলল লেভিন, ‘চালাও! কুকুরগুলোকে ধরে রেখো ফিলিপ!’
পরিবার আর বিষয়-আশয়ের সমস্ত ঝামেলা পেছনে ফেলে লেভিন এমন একটা প্রবল জীবনানন্দ আর প্রত্যাশা বোধ করছিলেন যে কথা বলার ইচ্ছে হচ্ছিল না তাঁর। তা ছাড়া অকুস্থল কাছিয়ে আসতে প্রতিটি শিকারীই যা বোধ করে, তেমন একটা একাগ্র উত্তেজনা হচ্ছিল তাঁর। কোন কিছু নিয়ে এখন তাঁর যদি কোন ভাবনা থেকে থাকে, তবে সেটা এই নিয়ে যে কলপেনস্কি জলায় তাঁরা কিছু পাবেন কিনা, ক্রাকের তুলনায় কেমন কীর্তি দেখাবে লাস্কা, এবং আজ তিনি নিজে ভালো গুলি করতে পারবেন কি। যে করেই হোক এই নতুন লোকটার সামনে নিজেকে যেন লজ্জা পেতে না হয়, অব্লোন্স্কি যেন তাঁকে ছাড়িয়ে না যায়—এসব চিন্তাই মাথায় আসছিল তাঁর।
অব্লোন্স্কিরও মনোভাব হচ্ছিল একই রকম এবং তিনিও কথা বলতে চাইছিলেন না। শুধু ভাসেকা ভেস্লোভস্কি ফুর্তিতে বকে চললেন অনর্গল। এখন তাঁর কথা শুনে গত সন্ধ্যায় লেভিন যে তাঁর সম্বন্ধে অন্যায় ধারণা করেছিলেন তা স্মরণ করে লজ্জা হল তাঁর। ভাসেকা সত্যিই খাসা ছোকরা, সহজ সরল ভালোমানুষ, এবং অতি ফুর্তিবাজ। লেভিন অবিবাহিত থাকতে দেখা হলে ওঁর সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে পারতেন। জীবন সম্পর্কে তাঁর কেমন একটা উৎসবের মনোভাব আর বাবুগিরির হেলাফেলা চাল খানিকটা ভালো লাগেনি লেভিনের। ওঁর যে লম্বা লম্বা নখ, টুপিটা এবং উপযোগী আরো অনেক কিছু আছে, তার জন্য নিজেকে যেন নিঃসন্দেহে অতি গুরুত্বপূর্ণ বলে ভাবছিলেন তিনি; কিন্তু সেটা মার্জনা করা যায় তাঁর ভালোমানুষি আর সৌজন্যের জন্য। তাঁর চমৎকার সহবত, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় দখল, এবং উনি যে তাঁরই জগতের লোক, এ সবের জন্য তাঁকে ভালো লাগল লেভিনের।
