এর জন্য পরে মায়ের কাছে বকুনি খেতে হয়েছিল কিটিকে। এরকম একটা সম্পর্ক হতে দিয়েছে বলে লেভিনের চোখে কিটি দোষী আর সে সম্পর্ক যে তার ভালো লাগছে না সেটা অমন বিদঘুটের মত প্রকাশ করে দোষ করেছে আরো বেশি।
‘কি এত ঘুমাবার তাড়া!’ নৈশাহারের সময় কয়েক গ্লাস মদ্যপানের পর নিজের অতি মধুর ও কাব্যিক মেজাজে পৌঁছে অব্লোন্স্কি বললেন, ‘ওই দেখো কিটি’, লিন্ডেন গাছের পেছনে উদীয়মান চাঁদের দিকে দেখিয়ে বললেন তিনি, ‘কি অপূর্ব! ভেস্লোভস্কি, এই হল সেরিনেড গাওয়ার সময়। জানো, চমৎকার গলা ওর। সারা রাস্তা আমরা দুজনে গাইতে গাইতে এসেছি। চমৎকার রোমান্স নিয়ে এসেছে ও, দুটো নতুন। ভারভারা আন্দ্রেয়েভনার সাথে গাইলে হত।’
.
সবাই চলে গেলে ভেস্লোভস্কির সাথে অব্লোন্স্কি অনেকক্ষণ বেড়ান তরুবীথিটায়। শোনা যাচ্ছিল তাঁদের গাওয়া নতুন রোমান্স।
স্ত্রীর শয়নকক্ষে চেয়ারে বসে মুখে গোঁজ করে সে গান শুনছিলেন লেভিন, তাঁর কি হয়েছে, কিটির এ প্রশ্নে চুপ করে থাকছিলেন একগুঁয়ের মত; কিন্তু কিটি নিজেই যখন ভীরু হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘ভেস্লোভস্কিকে তোমার খারাপ লেগেছে বুঝি?’ লেভিন ফেটে পড়লেন, বললেন সবকিছু, আর যা বললেন তাতে নিজেকে অপমানিত লাগছিল তাঁর, ফলে আরো বেশি চটে উঠছিলেন।
কিটির সামনে তিনি দাঁড়িয়ে ভ্রূকুটির তল থেকে ভয়াবহ চকচকে চোখে চাইলেন কিটির দিকে, সবল হাতে বুক চাপলেন, যেন নিজেকে সংযত রাখার জন্য নিয়োগ করছেন সমস্ত শক্তি। তাঁর মুখভাবকে কঠোর, এমনকি নিষ্ঠুরই বলা যেতে পারত যদি তাতে না থাকত যন্ত্রণার ছাপ, যা স্পর্শ করল কিটিকে। চোয়াল তাঁর কেঁপে উঠল, ভেঙে গেল গলা।
‘আমার কথাটা বোঝো, ঈর্ষা হচ্ছে না আমার, ওটা অতি নীচ একটা কথা। ঈর্ষা করতে আমি পারি না এবং বিশ্বাস করতে যে… আমি কি বোধ করছি সেটা তোমাকে বুঝিয়ে বলতে পারছি না, কিন্তু এটা সাঙ্ঘাতিক….ঈর্ষা আমি করছি না, কিন্তু কেউ তোমার দিকে অমন দৃষ্টিতে চাইবে বলে ভাববে, চাইবার স্পর্ধা করবে, এতে আমি অপমানিত, লাঞ্ছিত বোধ করছি।’
‘কিরকম দৃষ্টিতে?’ সেদিন সন্ধ্যায় ওঁদের ওখানে যত কথা আর ভাবভঙ্গির বিনিময় হয়েছিল, সততার সাথে তা সব স্মরণ করার চেষ্টা করে বলল কিটি।
মনের গভীরে কিটি জানতো যে ভেস্লোভস্কি যখন টেবিলের অন্য প্রান্তে তার কাছে চলে আসেন সেই মুহূর্তটায় কিছু-একটা হয়েছিল, কিন্তু নিজের কাছেই সেটা স্বীকার করার ইচ্ছে হচ্ছিল না তার, আর তা বলে লেভিনের যন্ত্রণা আরো বাড়িয়ে দেবার সাহস তো একেবারেই হচ্ছিল না।
‘আমি এখন যে অবস্থায় তাতে আমার মধ্যে আকর্ষণীয় কি থাকতে পারে?…’
‘আহ্!’ মাথা চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠলেন লেভিন, ‘ও কথাটা না বলল আর চলছিল না? তার মানে তোমার যদি আকর্ষণ থাকত…’
‘আরে, না কস্তিয়া, শোন, শোন’, লেভিনের দিকে সমবেদনার কাতর দৃষ্টিতে চেয়ে কিটি বলল, ‘কি তুমি ভাবতে পারো যখন কোন নাগর নেই আমার, নেই, নেই!… অপর কারো মুখও দেখব না, তাই তুমি চাও?’
লেভিনের ঈর্ষার প্রথমটা ক্ষুণ্ন হয়েছিল কিটি; সামান্য একটা আমোদ, তাও যা নিতান্ত নির্দোষ, তা তাকে বারণ করা হচ্ছে বলে সে বিরক্ত হয়েছিল, কিন্তু এখন লেভিনের প্রশান্তির জন্য, যে কষ্ট তিনি ভোগ করছেন তা থেকে তাঁকে মুক্ত করার জন্য শুধু ওই ধরনের তুচ্ছ ব্যাপারই নয়, সবকিছুই সাগ্রহে ত্যাগ করতে সে প্রস্তুত।
‘আমার অবস্থাটা যে কি সাংঘাতিক আর হাস্যকর সেটা বুঝে দেখো’, হতাশায় ফিসফিস করে বললেন লেভিন, ‘সে আমার অতিথি, এই আমোদ দানটুকু আর পায়ের ওপর পা তুলে দেওয়া ছাড়া সত্যিই কিছু সে করেনি, ধারণা যে এটা বেশ ভালো রেওয়াজ, সুতরাং তার প্রতি সৌজন্য দেখাতে হবে।’
‘তুমি কিন্তু বাড়িয়ে বলছ কস্তিয়া’, কিটি বলল, তার প্রতি লেভিনের ভালোবাসার যে প্রবলতা এখন প্রকাশ পেল ঈর্ষায় তাতে অন্তরে অন্তরে খুশিই হয়েছিল সে।
‘সবচেয়ে সাংঘাতিক যে তুমি যেমন বরাবর, তেমনি এখন আমার কাছে তুমি যখন অতি পবিত্র, আমরা যখন সুখী, বিশেষ রকমের সুখী, হঠাৎ কিনা এই ওঁছাটা… না, ওঁছা নয়, কেন গালাগালি করছি ওকে। ওকে নিয়ে আমার যেন বড় দায়। কিন্তু আমার সুখ, তোমার সুখ কিসের জন্য?…’
‘আমি বুঝতে পারছি কি থেকে এমনটা ঘটেছে’, শুরু করল কিটি
‘কি থেকে? কি থেকে?’
‘রাতের খাওয়ার সময় আমরা যখন গল্প করছিলাম, তখন কেমন করে তুমি চেয়েছিল আমি দেখেছি।’
‘তা ঠিক, তা ঠিক!’ লেভিন বললেন ভীতভাবে।
কি নিয়ে তাঁরা কথা বলছিলেন সেটা বলল কিটি। আর সেটা বলতে ব্যাকুলতায় দম বন্ধ হয়ে এল তার। লেভিন চুপ করে রইলেন। তারপর কিটির বিবর্ণ ভীতু, মুখখানা লক্ষ করে নিজের মাথা চেপে ধরলেন হঠাৎ।
‘কাতিয়া, তোমাকে কষ্ট দিয়েছি আমি! ক্ষমা করো লক্ষ্মীটি! এটা যে ক্ষেপামি! কাতিয়া, সব দোষ আমার। অমন একটা বাজে ব্যাপার নিয়ে অত কষ্ট পাবার মানে হয় কখনো?’
‘না, তোমার জন্য কষ্ট হচ্ছে আমার।’
‘আমার জন্য? আমার জন্য? কে আমি? ক্ষেপা!… কিন্তু তোমার কষ্ট হবে কেন? ভাবতেই ভয় হয় যে যতসব বাইরের লোক এসে আমাদের সুখ পণ্ড করে দিতে পারে…’
‘বটেই তো, এটাই হল অপমানকর…’
‘উলটে আমি ইচ্ছে করে আমার কাছে ওকে রেখে দেব সারা গ্রীষ্মকালটা, সৌজন্য ওকে ছেয়ে দেব’, কিটির করচুম্বন করে লেভিন বললেন। ‘দেখেনিও তুমি। কাল… হ্যাঁ, সত্যি, কাল আমরা যাচ্ছি।’
আট
মহিলারা এখনো ওঠেননি, ফটকের কাছে শিকারীদের গাড়িগুলো তৈরি। সকাল থেকেই লাস্কা বুঝেছিল যে শিকারে যাচ্ছে, প্রাণপণে ঘেউঘেউ আর লাফালাফি করে সে গিয়ে বসল কোচয়ানের পাশে আর যে দরজাটা দিয়ে শিকারীরা এখনো বেরোচ্ছে না, অসন্তুষ্ট আর উত্তেজিত হয়ে তাকাতে লাগল তার দিকে। প্রথমে বেরোলেন ভাসেকা ভেস্লোভস্কি। তাঁর প্রকাণ্ড নতুন হাই-বুট উঠেছে মোটা উরুর আধখানা পর্যন্ত, পরনে সবুজ কামিজ, নতুন চামড়ার গন্ধ ছাড়া কার্তুজ রাখার কোমারবন্ধ। মাথায় সেই ফিতে দোলানো টুপি, শিকলি ছাড়া নতুন একটা বিলাতি বন্দুক। লাস্কা লাফিয়ে গেল তাঁর কাছে, স্বাগত করল, লাফালাফি করে নিজের ধরনে জিজ্ঞেস করলে শিগগিরই ওরা বেরোবে নাকি, কিন্তু উত্তর না পেয়ে আবার ফিরে গেল তার প্রতীক্ষার জায়গায়, মাথাটা পাশে হেলিয়ে, একটা কান খাড়া করে নিথর হয়ে রইল। অবশেষে সশব্দে দরজা খুলে গেল, বাতাসে পাক খেয়ে লাফাতে লাগল অব্লোন্স্কির ফুটকিদার পয়েন্টার কুকুর ক্রাক, তারপর বন্দুক হাতে চুরুট মুখে স্বয়ং অব্লোন্স্কি। কুকুরটা তার পেট আর বুকে পা দিয়ে শিকারের ব্যাগে থাবা আটকে বসালে তিনি আদর করে চ্যাঁচাতে লাগলেন, ‘নাম্ ক্রাক, নাম্!’ পরনে তাঁর খাটো কোট, ছেঁড়া পেন্টালুন, পায়ে চাষীদের ধরনে ন্যাকরা, মাথায় জীর্ণ কি-একটা টুপি, কিন্তু নতুন মডেলের বন্দুকটা অপূর্ব, শিকারের ব্যাগ আর কার্তুজের বেল্ট নতুন না হলেও বেশ মজবুত।
