‘বেশ, খুশি হলাম, যাব। এ বছর আপনি শিকার করেছেন কি?’ মন দিয়ে তাঁর পা-টা নিরীক্ষণ করতে একটা কপট সৌজন্য নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন লেভিন। এটা কিটির চোখে পড়েছিল এবং লেভিনকে এটা মানায় না। বড় স্নাইপ পাওয়া যাবে কিনা জানি না, কিন্তু ছোট পাখি অনেক। তবে যেতে হবে সকাল সকাল। আপনি ক্লান্ত হবেন না? তুমি ক্লান্ত হওনি স্তিভা?’
‘আমি ক্লান্ত হব? কদাচ ক্লান্ত হইনি আমি। এসো, সারা রাত আজ ঘুমাব না। চলো বেড়াতে যাই।’
‘সত্যিই ঘুমাব না! চমৎকার হবে!’ সমর্থন করলেন ভেস্লোভস্কি।
‘আমাদের কোন সন্দেহ নেই যে তুমি নিজে না ঘুমিয়ে অন্যদেরও ঘুমাতে না দিতে পারো’, ডল্লি বললেন সামান্য লক্ষণীয় সেই খোঁচা দিয়ে যেটা তখন থেকে আজকাল স্বামীর সাথে সম্পর্কে প্রায়ই উঁকি দেয়। ‘আর আমার মতে ঘুমোবার সময় হয়ে গেছে… চললাম, রাতে আমি খাই না।’
‘না, না, বসো ডল্লিনকা’, বড় যে টেবিলটায় খাবার দেওয়া হয়েছিল, তার ওপাশে ডল্লির কাছে গিয়ে বললেন অব্লোন্স্কি, ‘তোমাকে কিছু বলবার মত খবর আছে।’
‘নিশ্চয় কিছুই না।’
‘জানো, ভেস্লোভস্কি গিয়েছিল আন্নার কাছে। আবার ওদের কাছে যাবে। ওরা যে তোমাদের এখান থেকে মাত্র সত্তর ভার্স্ট দূরে। আমিও অবশ্য-অবশ্য যাব। ভেস্লোভস্কি, আয় এখানে!’
মহিলাদের দলে গিয়ে ভেস্লোভস্কি বসলেন কিটির পাশে।
‘আহ্, বলুন-না। আপনি গিয়েছিলেন আন্নার কাছে? কেমন আছে সে?’ দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা জিজ্ঞেস করলেন তাঁকে।
লেভিন টেবিলের অন্য প্রান্তে বসে প্রিন্স-মহিষী আর ভারেঙ্কার সাথে অনবরত কথা চালিয়ে যেতে যেতে লক্ষ করছিলেন যে অব্লোন্স্কি, ডল্লি, কিটি আর ভেস্লোভস্কির মধ্যে একটা সজীব ও রহস্যময় কথোপকথন চলছে। শুধু রহস্যময় নয়, প্রাণবন্ত ঢঙে ভাসেকা কি যেন বলছিলেন আর তাঁর সুন্দর মুখের দিকে অপলকে চেয়ে থাকা তাঁর স্ত্রীর মুখে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভাব লক্ষ করলেন লেভিন।
ভ্রন্স্কি আর আন্না সম্পর্কে ভাসেকা বলছিলেন, ‘বেশ ভালো আছে ওরা, আমি অবশ্য বিচার করতে যাব না, কিন্তু ওদের বাড়িতে মনে হয় যেন নিজেদের সংসারেই আছি।’
‘কি ওরা করবে ভাবছে?’
‘মনে হয় শীতকালটা মস্কোয় কাটাবে।’
‘তুমি যাবে?’ স্ত্রীকে শুধালেন অব্লোন্স্কি।
ডল্লি বললেন, ‘আমার অনেক দিনের ইচ্ছে। নিশ্চয় যাব। ওর জন্য কষ্ট হয় আমার। ওকে তো আমি চিনি। অপরূপ নারী। আমি যাব একলা যখন তুমি চলে আসবে। কারো কোন বাধা ঘটাব না। তুমি না থাকলেই বরং ভালো।’
‘বেশ’, বললেন অব্লোন্স্কি, ‘আর তুমি, কিটি?’
‘আমি? আমি কেন যাব?’ একেবারে লাল হয়ে কিটি বলল, চাইলে স্বামীর দিকে।
‘আপনি আন্না আর্কাদিয়েভনার সাথে পরিচিত?’ জিজ্ঞেস করলেন ভেস্কোভস্কি, ‘অতি মনোহরা নারী।’
‘হ্যাঁ পরিচিতি’, আরো লাল হয়ে উত্তর দিল কিটি, উঠে গেল স্বামীর কাছে।
বলল, ‘তাহলে কাল তুমি শিকারে যাচ্ছ?’
এ কয়েক মিনিটে ঈর্ষা তাঁর প্রচণ্ড বেড়ে উঠেছিল, বিশেষ করে ভেস্লোভস্কির সাথে কথা বলার সময় কিটির গণ্ডে রক্তিমা ছড়িয়ে পড়তে দেখে। এখন কিটির কথাটার অর্থ তিনি করলেন নিজের মত করে। পরে ব্যাপারটা স্মরণ করে তাঁর অদ্ভুত লাগলেও এখন তাঁর মনে হল এটা পরিষ্কার যে কাল তিনি শিকারে যাবেন কিনা যখন জিজ্ঞেস করছে, তখন ভাসেকা ভেস্লোভস্কিকে এই উপভোগটা তিনি দেবেন কিনা জানতে চাইছে সেইটেই। তাঁর ধারণা, কিটি ওঁর প্রেমে পড়ে গেছে।
‘হ্যাঁ, যাব’, অস্বাভাবিক গলায় উত্তর দিলেন তিনি, যা নিজের কাছেই বিছছিরি শোনাল।
‘না, কাল বরং বাড়ি থেকো ডল্লি স্বামীকে দেখেনি অনেকদিন, পরশু যেও’, বলল কিটি।
কিটির কথার মানে লেভিন করলেন এইরকম : ‘ওকে আমার কাছে থেকে সরিয়ে নিও না। তুমি যদি যাও তাতে কিছু এসে যায় না আমার, কিন্তু সুন্দর এই যুবকটির সাহচর্য উপভোগ করতে আমাকে দাও।’
‘তুমি যদি চাও তাহলে কাল বাড়ি থাকব’, খুব একটা প্রীতির ভাব নিয়ে বললেন লেভিন।
তাঁর উপস্থিতিতে লেভিনের কি কষ্ট হচ্ছে সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করে ভাসেকা ইতিমধ্যে কিটির পরই টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং মধুর দৃষ্টিপাত করে হেসে এলেন তার কাছে।
সে দৃষ্টি নজরে পড়েছিল লেভিনের। ফ্যাকাশে হয়ে গেল তাঁর মুখ, মুহূর্তের জন্য দম আটকে এল তাঁর। ‘আমার স্ত্রীর দিকে অমনভাবে সে চাইতে পারে কেমন করে!’ ভেতরটা তাঁর টগবগ করছিল।
‘তাহলে কালকে? চলুন যাই’, চেয়ারে বসে নিজের অভ্যাসমত ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাঙ তুলে বললেন ভাসেকা। লেভিনের ঈর্ষা বেড়ে গেল আরও। প্রতারিত স্বামী বলে নিজেকে বোধ হচ্ছিল, স্ত্রী এবং তার প্রণয়ীর কাছে যার দরকার কেবল তাদের সুখস্বাচ্ছন্দ্য ও উপভোগের ব্যবস্থা করার জন্য… তা সত্ত্বেও তিনি সৌজন্য ও আতিথেয়তার সাথে রাজি হলেন পরের দিন শিকারে যেতে।
লেভিনের সৌভাগ্যক্রমে প্রৌঢ়া প্রিন্সেস নিজে উঠে পড়লেন পড়লেন এবং কিটিকে পরামর্শ দিলেন ঘুমাতে যাবার জন্য। তাতে লেভিনের কষ্টটা দূর হল বটে, কিন্তু নতুন আরেকটা কষ্ট বাদ গেল না তাঁর। গৃহস্বামিনীকে বিদায় দেবার সময় আবার তার হস্তচুম্বনের চেষ্টা করলেন ভাসেকা, কিন্তু লাল হয়ে কিটি হাত টেনে নিয়ে সরল রূঢ়তায় বলে দিলঃ ‘আমাদের এখানে ওটার চল নেই।’
