কিন্তু গাড়িতে যে বসে ছিলেন, তাঁকে বৃদ্ধ প্রিন্স ভাবায় ভুল হয়েছিল লেভিনের। গাড়ির কাছে যেতে তিনি অব্লোন্স্কির সাথে দেখলেন প্রিন্সকে নয়, সুন্দর স্বাস্থ্যবান এক যুবাপুরুষকে, মাথায় তাঁর পেছন দিকে লম্বা ফিতে ঝোলানো স্কটল্যান্ডী টুপি। এটি ভাসেকা ভেস্লোভস্কি, শ্যেরবাৎস্কিদের তিন ধাপে সম্পর্কিত ভাই, পিটার্সবুর্গ-মস্কোর দীপ্তিমান যুবক, ‘চমৎকার ছোকরা আর শিকারের প্রচণ্ড ভক্ত’, অব্লোন্স্কি তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে যে কথাটা বলেছিলেন।
বৃদ্ধ প্রিন্সের বদলে তিনি আসায় যে হতাশা দেখা দিয়েছিল, তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয় তিনি ফুর্তি করে প্রিয়-সম্ভাষণ করলেন লেভিনের সাথে, মনে করিয়ে দিলেন যে তাঁদের আগেই পরিচয় হয়েছিল, অব্লোন্স্কি যে পয়েন্টার কুকুর সাথে আনছিলেন, তার ওপর দিয়ে গ্রিশাকে তুলে নিলেন গাড়িতে।
লেভিন গাড়িতে উঠলেন না, হেঁটে এলেন তার পেছন পেছন। বৃদ্ধ প্রিন্স, যাঁকে গাড়িতে উঠলেন না, হেঁটে এলেন তার পেছন পেছন। বৃদ্ধ প্রিন্স, যাঁকে তিনি যত বেশি জানছেন ততই ভালোবাসছেন, তিনি না আসায়, এবং একেবারে অনাত্মীয় ও অবান্তর এই ভাসেকা ভেস্লোভস্কিটির আবির্ভাব ঘটায় খানিকটা বিরক্তই হয়েছিলেন তিনি। তাঁকে লেভিনের বেশি অনাত্মীয় ও অবান্তর লেগেছিল আরো এই জন্য যে ছোট-বড় সবার চঞ্চল জটলা শুরু হয়েছিল যে গাড়ি-বারান্দাটায় সেখানে এসে তিনি দেখলেন যে ভাসেকা ভেস্লোভস্কি কিটির হস্তচুম্বন করছেন বিশেষ একটা সোহাগ ঢেলে, নাগরের ভাব নিয়ে।
‘আমি আপনার স্ত্রীর সম্পর্কিত ভাই, পুরানো পরিচিত’, বলে ভাসেকা ভেস্লোভস্কি আবার সজোরে করমর্দন করলেন লেভিনের।
‘কি শিকার আছে?’ প্রত্যেককে আলাদা আলাদা করে সম্ভাষণ জানানো কোনরকমে শেষ করে লেভিনকে জিজ্ঞেস করলেন অব্লোন্স্কি। ‘ও আর আমি একেবারে মারমুখী হয়ে আছি। কি মা, সেই থেকে ওরা মস্কোয় যায়নি। নে তানিয়া, এটা তোর জন্য! গাড়ির পেছন দিকে আমার ব্যাগটা আছে, নিয়ে আয়-না’, তিনি কথা বলছিলেন প্রত্যেকের সাথেই, ‘ডল্লিনকা, বেশ যে দেখছি তাজা হয়ে উঠেছ’, স্ত্রীকে বললেন তিনি, আরো একবার তাঁর হাতে চুমু খেয়ে আর তা ধরে রেখে অন্য হাতে তার ওপর টোকা দিতে দিতে।
এক মিনিট আগেও লেভিন ছিলেন অতি শরিফ মেজাজে, কিন্তু এখন তিনি সবার দিকে চাইছিলেন মুখ হাঁড়ি করে, কিছুই তাঁর ভালো লাগছিল না।
স্ত্রীর প্রতি অব্লোন্স্কির কমনীয়তা লক্ষ করে লেভিন ভাবলেন, ‘ওই ঠোঁট দিয়ে কাকে সে চুমু খেয়েছে গতকাল?’ ডল্লির দিকে চাইলেন তিনি, তাঁকেও তাঁর ভালো লাগল না।
‘ওর ভালোবাসায় তো ওর বিশ্বাস নেই। তাহলে অত আহ্লাদ কিসের? জঘন্য!’ ভাবলেন লেভিন।
চাইলেন প্রিন্সেসের দিকে, এক মিনিট আগেও যাঁকে বেশ লেগেছিল লেভিনের, কিন্তু ফিতে ঝোলানো, এই ভাসেকাকে তিনি যে সমাদরে স্বাগত করছেন যেন এটা তাঁর নিজের বাড়ি, সেটা ভালো লাগল না তাঁর।
এমনকি কজ্নিশেভ, তিনিও এসে দাঁড়িয়েছিলেন গাড়ি-বারান্দায়, তাঁকেও তাঁর ভালো লাগল না এই জন্য যে অব্লোন্স্কিকে তিনি একটা কৃত্রিম সৌহার্দ্য দেখাচ্ছেন, যে ক্ষেত্রে অব্লোন্স্কিকে তিনি ভালোবাসেন না, শ্রদ্ধা করেন না, সেটা লেভিন জানেন।
আর ভারেঙ্কাকেও তাঁর খারাপ লাগল, কারণ সাধু-এর ভাব করে সে মহাশয়টির সাথে পরিচয় ফাঁদছে। কেননা তার একমাত্র কামনা বিয়ে করা যায় কিভাবে।
আর সবচেয়ে বিছ্ছিরি লাগল কিটিকে, কেননা গ্রামে এই আগমনকে তাঁর নিজের এবং সবার কাছে একটা উৎসব বলে গণ্য করে এই যে মহাশয়টি ফুর্তির হাওয়া বইয়ে দিয়েছেন, তাতে গা ভাসিয়েছে কিটিও; যে বিশেষ একটা হাসি দিয়ে লোকটার হাসির জবাব দিল কিটি, সেটা খারাপ লাগল সবচেয়ে বেশি।
কলরব করে কথা বলতে বলতে সবাই ঢুকলেন ভেতরে; কিন্তু সবাই আসন নেওয়া মাত্র লেভিন পিছন ফিরে বেরিয়ে গেলেন।
কিটি দেখতে পাচ্ছিল স্বামীর কিছু-একটা হয়েছে। ওঁর সাথে একা কথা বলার সুযোগ খুঁজছিল কিটি, কিন্তু সেরেস্তায় কাজ আছে বলে লেভিন চলে গেলেন তাড়াতাড়ি। বিষয়-আশয়ের ব্যাপারটা তাঁর কাছে আজকের মত এত জরুরি বোধ হয়নি বহুদিন। তাঁর মনে হল, ‘ওদের তো উৎসব, কিন্তু এখানে উৎসব নয়, যা অপেক্ষা করে থাকবে না, দিন চলবে না তা ছাড়া।’
সাত
নৈশাহারের জন্য তাঁকে ডাকতে লোক পাঠাবার পরই মাত্র বাড়ি ফিরলেন লেভিন। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কিটি আর আগাফিয়া মিখাইলোভনা পরামর্শ করছিলেন খাবার সময় কি সুরা দেওয়া হবে।
‘কি ব্যতিব্যস্ততা? সাধারণত যা দেওয়া হয় তাই দেবেন।’
‘না, স্তিভা তা খাবে না… কস্তিয়া, দাঁড়াও তো, কি হল তোমার?’ লেভিনের পিছু পিছু গিয়ে কিটি বলল। কিন্তু তার জন্য অপেক্ষা না করে নির্মমভাবে বড় বড় পা ফেলে লেভিন চলে গেলেন ডাইনিং-রুমে এবং ভাসেকা ভেস্লোভস্কি আর অবলোন্স্কি যে সাধারণ সজীব আলাপটা চালু রেখেছিলেন, তৎক্ষণাৎ যোগ দিলেন তাতে।
‘তাহলে কি, কাল যাব শিকারে?’ জিজ্ঞেস করলেন অবলোবস্ক্রিপ
‘হ্যাঁ, যাওয়া যাক’, অন্য একটা চেয়ারে সঙ্গে পাপকে ভঙ্গিতে বসে পায়ের ওপর মোটা একখানা পা চাপিয়ে বললেন ভেস্লোভস্কি।
