‘এই আমি বলে রাখছি, আলেকজান্ডার আসবে না’, বললেন প্রৌঢ়া প্রিন্সেস।
আজ সন্ধ্যায় ট্রেনে করে অব্লোন্স্কি আসবেন বলে সবাই আশা করছিলেন আর বৃদ্ধ প্রিন্স লিখে পাঠিয়েছিলেন যে তিনিও আসতে পারেন।
‘আর আমি জানি কেন আসবে না’, বলে চললেন প্রিন্সেস, ‘ও বলে যে নবদম্পতিকে প্রথম দিকটায় একলা থাকতে দেওয়া উচিত।’
‘হ্যাঁ, উনি আমাদের ফেলে রেখেছেন। কতদিন দেখিনি, কিটি বলল, ‘তা ছাড়া আমরা নবদম্পতি হলা কোথায়? বুড়িয়েই গেছি।’
‘যদি ও না আসে, আমি তাহলে তোমাদের কাছ থেকে বিদায় নেব বাছারা’, সখেদে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন প্রিন্সেস।
‘কি বলছেন মা!’ দুই মেয়েই ঝাঁপিয়ে পড়লেন তাঁর ওপর।
‘তুই ভেবে দেখ, ওর কি অবস্থা, ওর এখন…’
হঠাৎ গলা কেঁপে উঠল প্রৌঢ়া প্রিন্সেসের। মেয়েরা চুপ করে গিয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। সে চাউনি বলছিল, ‘কিছু-একটা দুঃখ মা সব সময়ই খুঁজে নেবে।’ তাঁরা জানতেন না যে মেয়ের কাছে থাকতে প্রিন্সেসের যতই ভালো লাগুক, এখানে তাঁর প্রয়োজনীয়তা তিনি যতই অনুভব করুন, আদরের শেষ মেয়েটাকে বিয়ে দেওয়ায় সংসারের বাসা শূন্য হয়ে যাবার পর থেকে নিজের জন্য, স্বামীর জন্য তাঁর বড় কষ্ট।
রহস্যময় ও গুরুতর একটা ভাব করে এসেছিলেন আগাফিয়া মিখাইলোভনা।
‘কি ব্যাপার, আগাফিয়া মিখাইলোভনা’, সচকিত হয়ে জিজ্ঞেস করল কিটি 1
‘রাতের খাওয়া কি হবে।’
‘ভালোই হল, তুই যা’, বললেন ডল্লি, ‘খাবারের খবরদারি কর, আমি যাই, গ্রিশার পড়া করাই, আজ কিছুই করেনি সে।’
‘এটা আমার পক্ষে একটা শিক্ষা! না ডল্লি, আমি যাচ্ছি’, লাফিয়ে উঠে বললেন লেভিন।
গ্রিশা ভর্তি হয়েছে জিমন্যাসিয়ামে, গ্রীষ্মে পুরনো পড়াগুলো আবার আবৃত্তি করার কথা। দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা মস্কো থাকতেই ছেলের সাথে লাতিন পড়তেন, লেভিনদের এখানে এসে তিনি নিয়ম করেছিলেন যে দিনে অন্তত একবার পাটীগণিত আর লাতিনের সবচেয়ে কঠিন পাঠগুলোর পুনরাবৃত্তি করাতে হবে। লেভিন তাঁর জায়গা নিতে চান। কিন্তু লেভিন কিভাবে পড়াচ্ছেন, একবার তা শুনে এবং মস্কোয় টিউটর যেভাবে শেখান সেখাবে শেখানো হচ্ছে না লক্ষ করে ডল্লি হতবুদ্ধি হয়ে এবং লেভিনকে আঘাত না দেবার চেষ্টা করেও দৃঢ়ভাবে বলেন যে পড়ানো উচিত পাঠ্যপুস্তক অনুসারে, যেভাবে শিক্ষক পড়াতেন, নইলে বরং ডল্লি নিজেই পড়াবার ভারটা আবার নেবেন। অব্লোন্স্কি যে হেলাফেলায় ছেলের পড়াশুনা দেখার ভার নিজে না নিয়ে মায়ের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন, যা তিনি কিছুই বোঝেন না, আর শিক্ষকরা যে এত খারাপভাবে ছেলেদের শেখায়, তার জন্য বিরক্তি ধরেছিল লেভিনের, কিন্তু শ্যালিকাকে তিনি কথা দিয়েছিলেন যে পড়াবেন তিনি যেমন চান, তেমনি ভাবেই। এবং গ্রিশাকে তিনি পড়াতে লাগলেন নিজের পদ্ধতিতে নয়, পাঠ্যপুস্তক অনুসারে, আর তাই অনিচ্ছায় প্রায়ই ভুলে যেতেন পড়াবার সময়। আজও তাই হল।
বললেন, ‘না, আমি যাচ্ছি ডল্লি, তুমি বসো। আমরা সব ঠিকঠাক করব, পাঠ্যপুস্তকে যেমন। তবে স্তিভা এলেই কিন্তু আমরা যাব শিকারে, তখন কিন্তু ফাঁক পড়বে।’
লেভিন গেলেন গ্রিশার কাছে।
ভারেঙ্কাও একই রকম কথা বলেছিল কিটিকে। লেভিনদের সুখী, গোছানো সংসারেও কাজে লাগার উপায় করে নিতে পারার নৈপুণ্য ছিল তার।
‘রাতের খাবারের ব্যাপারটা আমি দেখছি, আপনারা বসে থাকুন এখানে’, এই বলে সে গেল আগাফিয়া মিখাইলোভনার কাছে।
‘সত্যিই তো’, কিটি বলল, ‘বাচ্চা মুরগি পাওয়া যায়নি। তাহলে নিজেদেরগুলোকেই কি…’
‘সে আমি আর আগাফিয়া মিখাইলোভনা বুঝব’, দুজনে চলে গেলেন ওঁরা।
‘কি মিষ্টি মেয়ে!’ বললেন প্রিন্সেস।
‘শুধু মিষ্টি নয় মা, এত অপূর্ব হয় না কখনো।’
‘তাহলে আজ আপনারা অব্লোন্স্কির আশা করছেন’, ভারেঙ্কাকে নিয়ে আলোচনাটা চলুক, স্পষ্টতই এটা না চেয়ে বললেন কজ্নিশেভ, ‘এত ভিন্ন দুটো জামাই পাওয়া কঠিন’; মিহি হেসে তিনি মন্তব্য করলেন, ‘একজন সজীব, মাছ যেমন পানিতে, তেমনি সমাজে যে সাবলীল; অন্যজন, আমাদের কস্তিয়া, প্রাণবন্ত, ক্ষিপ্র, সবকিছুতে সজাগ, কিন্তু যেই সমাজে গিয়ে পড়ে অমনি আড়ষ্ট হয়ে যায়, ডাঙায় পড়া মাছের মত মিছেই ঝাপটায় পাখনা।’
‘হ্যাঁ, ও বড় লঘুচিত্ত’, কজ্নিশেভের দিকে ফিরে বললেন প্রিন্সেস, ‘আমি আপনাকেই বলতে চাইছিলাম যে ওর (কিটির দিকে ইঙ্গিত করলেন তিনি) ‘এখন যে এখানে থাকা চলে না, অবশ্য-অবশ্য থাকা থাকা উচিত মস্কোয়, সে কথাটা আপনি ওকে বোঝান। ও বলে যে মস্কোর ডাক্তারকে ডাকবে…’
‘মা, ও সবই করবে, সবকিছুতেই ও রাজি’, এ ব্যাপারে কজ্নিশেভকে বিচারকের ভূমিকায় ডাকায় মায়ের ওপর রাগ করে বলল কিটি।
কথাবার্তার মাঝখানে ছায়াবীথিতে শোনা গেল ঘোড়ার ঘোঁৎঘোঁৎ শব্দ আর নুড়ির ওপর চাকার ঘর্ঘর।
ডল্লি উঠে স্বামীকে স্বাগত করতে যাবার আগেই নিচে গ্রিশার পড়ার ঘরের জানলা দিয়ে লাফিয়ে বেরোলেন লেভিন, গ্রিশাকে নিলেন সাথে।
ঝুল-বারান্দার নিচে থেকে লেভিন চেঁচালেন, ‘এ স্তিভা! আমাদের পড়া হয়ে গেছে। ভয় নেই ডল্লি’, এই বলে তিনি বাচ্চার মত ছুটলেন গাড়ির দিকে।
‘সে, সে (স্ত্রী), উহা, তাকে তাকে, তাকে’, ছায়াবীথিতে লাফাতে লাফাতে লাতিন ভাষায় চেঁচাতে লাগল গ্রিশা। বীথির মোড়ে থেমে লেভিন চেঁচিয়ে বললেন, ‘আরে, আরো একজন দেখছি। নিশ্চয় বাবা! খাড়া সিঁড়ি বেয়ে নেমো না কিটি, ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে।’
