কয়েক পা তারা হাঁটল নীরবে; ভারেঙ্কা দেখতে পাচ্ছিল যে উনি কিছু বলতে চাইছেন; সেটা কি তা অনুমান করে পুলক আর ত্রাসের উত্তেজনায় বুক তার নিথর হয়ে এল। ওঁরা এত দূরে চলে গিয়েছিলেন যে ওঁদের কথা কারো কানে যাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু তখনও তিনি কিছু বলতে শুরু করেনি। ভারেঙ্কার পক্ষে চুপ করে থাকাই ভালো হত; তাঁরা যা বলতে চাইছিলেন সেটা ভালো বলা যেত নীরবতার পরে, ব্যাঙের ছাতা নিয়ে আলাপের পরে নয়। কিন্তু নিজের বিরুদ্ধেই যেন একটা আপতিক ঝোঁকে ভারেঙ্কা বলে উঠল, ‘তাহলে আপনি কিছুই পেলেন না? তবে বনের ভেতর দিকে ব্যাঙের ছাতা থাকে সব সময়ই কম।’
সের্গেই ইভানোভিচ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, কোন জবাব দিলেন না। ও যে ব্যাঙের ছাতা নিয়ে কথা বলছে, এতে বিরক্তি লাগছিল তাঁর। নিজের শৈশবের কথা ও যা প্রথমে বলেছিল, সেই প্রসঙ্গে ওকে ফেরাতে চাইছিলেন তিনি; কিন্তু যেন নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মন্তব্য করলেন ভারেঙ্কার প্রথম নয়, শেষ কথাটার ওপর।
‘আমি শুধু শুনেছি যে সাদা ছত্রাক গজায় প্রধানত কনের কিনারায়, কিন্তু সাদাগুলো আমার চোখে পড়ে না।‘
কাটল আরো কয়েক মিনিট, ছেলেপেলেদের কাছ থেকে আরো দূরে চলে গিয়েছিলেন তাঁরা, একেবারে তাঁরা, একেবারে তাঁরা তখন একলা। ভারেঙ্কার বুক এমন টিপটিপ করছিল যে তার শব্দ পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছিল সে, টের পাচ্ছিল যে সে রাঙা হয়ে উঠছে, ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে, আবার রাঙা।
মাদাম শ্টালের কাছে ভারেঙ্কা যে অবস্থায় ছিল, তারপর কর্নিশেভের মত একজন মানুষের স্ত্রীর হতে পারা তার কাছে মনে হচ্ছিল সুখের চূড়ান্ত। তা ছাড়া সে প্রায় নিশ্চিত হয়ে উঠেছিল যে ওঁকে সে ভালোবাসে। এখানই সেটা স্থির হয়ে যাওয়ার কথা। ভয় হচ্ছিল তার। কি উনি বলবেন আর কি বলবেন না, দুয়েতেই ভয়।
প্রেম নিবেদনের সময় হয় এখনই, নতুবা আর কখনোই নয়; এটা কজ্নিশেভও টের পাচ্ছিলেন। ভারেঙ্কার সবকিছুতে, তার দৃষ্টি, গণ্ডের লালিমা, নত নয়নে প্রকাশ পাচ্ছিল একটা আতুর প্রতীক্ষা।কজ্নিশেভ সেটা দেখতে পাচ্ছিলেন, ভারেঙ্কার জন্য কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। তিনি এও অনুভব করছিলেন যে এখন ওকে কিছু না বলা মানে ওকে অপমান করা। নিজের সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তিগুলি তিনি সব মনে মনে ঝালিয়ে নিলেন। যে কথায় তিনি ওর পাণিপ্রার্থনা করবেন ভেবেছিলেন, সেটারও পুনরাবৃত্তি করলেন মনে মনে; কিন্তু সে কথাগুলোর বদলে হঠাৎ কি-একটা অপ্রত্যাশিত ভাবনার উদয় হওয়ায় তিনি বললেন : ‘সাদা আর বার্চ ছত্রাকের মধ্যে পার্থক্য কি?’
উত্তর দিতে গিয়ে ভারেঙ্কার ঠোঁট থরথর করছিল : ‘ছাতার দিকে প্রায় কোন পার্থক্য নেই, কিন্তু বোঁটার দিকে আছে।’
আর এই কথাগুলো বলা মাত্রই দুজনেরই বোঝা হয়ে গেল যে ব্যাপারটা চুকে গেছে, যা বলার কথা ছিল তা আর বলা হবে না, দুজনের যে উদ্বেলতা এর আগে কূল ছাপাতে যাচ্ছিল, তা শান্ত হয়ে আসতে থাকল।
‘বার্চ ছত্রাকের বোঁটা—মনে হবে যেন দু’দিন না কামানো কালো দাড়ি’, একেবারে সুস্থির হয়ে বললেন কজ্নিশেভ।
‘সত্যি’, হেসে জবাব দিলে ভারেঙ্কা আর অজ্ঞাতসারে তাঁদের গতি বদলে গেল। বাচ্চাদের দিকে যেতে থাকলেন তাঁরা। ভারেঙ্কার কষ্ট হচ্ছিল, লজ্জা হচ্ছিল, সে সাথে হালকাও বোধ করছিল সে।
বাড়ি ফিরে সমস্ত যুক্তিগুলো আবার বিচার করে কজ্নিশেভ দেখলেন যে তিনি ভুল সিদ্ধান্ত করেছিলেন। মেরি’র স্মৃতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করতে তিনি পারেন না।
আনন্দে কলরব করে ছেলেমেয়েরা যখন ছুটে এল তাঁদের দিকে, স্ত্রীকে আগালয়ে লেভিন বলতে কি সক্রোধেই চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘আস্তে, আস্তে বাচ্চারা!’
ছেলেমেয়েদের পর বন থেকে বেরোলেন কজ্নিশেভ আর ভারেঙ্কা। ভারেঙ্কাকে জিজ্ঞেস করার দরকার হল না কিটির; দুজনের শান্ত আর কিছুটা লজ্জিত মুখভাব দেখে কিটি বুঝল যে তার পরিকল্পনা ফলেনি।
বাড়ি ফেরার পথে স্বামী জিজ্ঞেস করলেন, ‘তা, কি হল?’
‘লাগল না’, কিটি বলল হেসে এবং এমন ভঙ্গিতে যাতে লেভিন প্রায়ই তার পিতার ধরন দেখে খুশি হতেন।
‘লাগল না মানে?’
‘এইরকম’, স্বামীর হাত নিয়ে রুদ্ধ মুখের কাছে ছুঁয়ে সে বলল, ‘পাদ্রীর হাতে লোকে চুমু খায় যেভাবে ‘ হেসে লেভিন শুধালেন, ‘কার লাগল না?’
‘দুজনেরই, অথচ দরকার ছিল এইরকমটা…’
‘এই, চাষীরা আসছে।’
‘না, ওরা দেখতে পায়নি।
ছয়
ছেলেমেয়েরা যখন চা খাচ্ছে, বড়রা তখন ঝুল-বারান্দায় বসে এমনভাবে কথাবার্তা বলছিলেন যেন কিছুই হয়নি, যদিও সবাই, বিশেষ করে কজ্নিশেভ আর ভারেঙ্কা ভালো করে বুঝছিলেন যে নেতিবাচক হলেও খুবই গুরুতর একটা ব্যাপার ঘটে গেছে। দুজনেরই একইভাবে নিজেদের মনে হচ্ছিল সেই ছেলের মত, পরীক্ষায় ফেল করে যাকে নিচের ক্লাসেই পড়ে থাকতে হবে, নতুবা একেবারেই ছেড়ে দিতে হবে লেখাপড়া। কিছু-একটা ঘটে গেছে টের পেয়ে উপস্থিতরাও সবাই সজীব কথাবার্তা চালাচ্ছিলেন অন্য বিষয় নিয়ে। এ সন্ধ্যায় লেভিন আর কিটি নিজেদের বোধ করছিলেন বিশেষ রকমের প্রেমাকুল আর সুখী। এবং তাঁরা যে নিজেদের প্রেমে সুখী, তাতে অন্যদের প্রতি একটা ভর্ৎসনার ইঙ্গিত নিহিত থাকছিল যাঁরা তাই চেয়েছিলেন, কিন্তু পারলেন না—তার জন্য লজ্জা হচ্ছে তাঁদের।
