তিনি ভাবছিলেন, ‘কেনই বা নয়? এটা যদি হত শুধুই একটা দমকা ভাবাবেগ কিংবা যৌনকামনা, যদি আমি এই আকর্ষণটা, এই পারস্পরিক আকর্ষণটা (পারস্পরিকই বলতে পারি আমি) বোধ করতাম, অথচ টের পেতাম যে তা আমার সমস্ত জীবনধারার বিরুদ্ধে যাচ্ছে, এই আকর্ষণে আত্মসমর্পণ করে যদি আমি অনুভব করতাম যে আমার সাধনা ও কর্তব্যের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করছি… কিন্তু সে তো নয়। এর বিরুদ্ধে শুধু একটা যে কথা আমি বলতে পারি সেটা এই যে মেরিকে হারিয়ে আমি মনে মনে বলেছিলাম যে তার স্মৃতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকব। নিজের হৃদয়াবেগের বিরুদ্ধে শুধু এই কথাটাই বলতে পারি… এটা গুরুত্বপূর্ণ।’ কজ্নিশেভ ভাবলেন গুরুত্বপূর্ণ, সেইসাথে অনুভব করছিলেন যে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাছে ওটার কোন গুরুত্ব থাকতে পারে না, যদিও লোকের চোখে তাঁর কাব্যিক মূর্তিটা মাটি হয়ে যেতে পারে। ‘কিন্তু এটা ছাড়া যতই খুঁজি কিছুই পাচ্ছি না আমার হৃদয়াবেগের বিরুদ্ধে। শুধু যুক্তি দিয়ে যদি কাউকে নির্বাচন করি, তাহলে ওর চেয়ে ভালো কাউকে পাব না।’
তাঁর পরিচিত নারী ও কুমারীদের তিনি যতই স্মরণ করে দেখুন, এমন কাউকে তিনি মনে করতে পারলেন না যার মধ্যে নিরাবেগে বিচার করে স্ত্রীর ভেতর যে গুণগুলি দেখতে তিনি চান, তা সব, একেবারে সবই ওর মত এমন মাত্রায় মিলেছে। যৌবনের সমস্ত মাধুর্য ও স্ফূর্তি তার ছিল, কিন্তু কচি খুকি সে নয়। তাঁকে যদি সে ভালোবেসে থাকে, তবে ভালোবেসেছে সজ্ঞানে, নারীর যেভাবে ভালোবাসা উচিত; এই হল এক কথা। দ্বিতীয়ত, উচ্চসমাজী চাল তার ছিল না শুধু তাই নয়, স্পষ্টতই উচ্চ সমাজের প্রতি বিতৃষ্ণাই ছিল তার, অথচ সমাজকে সে জানতো এবং ভালো সমাজের নারীর যোগ্য সবকিছু আচার ব্যবহার ছিল তার, যা ছাড়া জীবনসঙ্গিনী কজ্নিশেভের কাছে অকল্পনীয়। তৃতীয়ত, সে ধর্মপ্রাণা, কিন্তু শিশুর মত নির্বিচার ধর্মপরায়ণ আর ভালোমানুষ সে নয়, যেমন ধরা যাক–কিটি, কিন্তু তার জীবন প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় প্রত্যয়ের ওপর। স্ত্রীর কাছে যা তাঁর প্রত্যাশা, এমনকি খুঁটিনাটিতে পর্যন্ত তা সবকিছু কজ্নিশেভ দেখতে পেলেন ভারেঙ্কার মধ্যে; সে গরিব, একাকিনী, সুতরাং স্বামীগৃহে সে একরাশ আত্মীয়স্বজন আর তাদের প্রভাব নিয়ে আসবে না যা কিটি করেছে বলে তিনি দেখছেন, বরং সব সময় ঋণী থাকবে স্বামীর কাছে, এটাও নিজের ভবিষ্যৎ পারিবারিক জীবনের জন্য সব সময় তিনি চাইতেন। আর যে মেয়ের মধ্যে এই সমস্ত গুণই মিলেছে সে ভালোবাসে তাঁকে। তিনি মিতদর্শী কিন্তু এটা না দেখে তিনি পারলেন না। আর তিনিও ভালোবাসেন তাকে। বিরুদ্ধে শুধু একটা যুক্তি—তাঁর বয়স। কিন্তু তিনি দীর্ঘজীবী বংশের লোক, একটি চুলও তাঁর পাকে নি, সবাই বলবে তাঁর বয়স চল্লিশও নয়; তাঁর মনে পড়ল, ভারেঙ্কা বলেছিল যে কেবল রাশিয়াতেই লোকে পঞ্চাশ বছরেই বৃদ্ধ মনে করে নিজেকে, অথচ ফ্রান্সে পঞ্চাশবছরী পুরুষ নিজেকে মনে করে, বয়সের প্রভাতগগনে আর চল্লিশবছরী যুবাপুরুষ। কিন্তু কি মানে হয় বয়সের হিসেব করার যখন প্রাণে তিনি তেমনি তাজা যা ছিলেন বিশ বছর আগে? অন্য দিক থেকে বনের কিনারায় আবার ফিরে তীর্যক রোদের আলোয় ঝুড়ি হাতে হলদে পোশাকে, বুড়ো বার্চ গাছের কাছ দিয়ে লঘু পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়া ভারেঙ্কার সুশ্রী মূর্তিটা যখন তিনি দেখেছিলেন, তখন তাঁর যা অনুভূতি, সেটা কি যৌবন নয়? আর ভারেঙ্কার এই ছবিটা যখন একসাথে মিলে যায় বাঁকা রোদে হলুদ হয়ে আসা ওট খেত আর খেতের পরে হলুদ ছিটানো, সুদূরের নীলে মিলিয়ে যাওয়া পুরনো বনের সৌন্দর্যের সাথে যা বিস্মিত করছিল তাঁকে তখন আনন্দে টনটন করে উঠল তাঁর বুক। মন তাঁর গলে গেল। তিনি অনুভব করছিলেন ধে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। ব্যাঙের ছাতা তোলার জন্য বসে নমনীয় ভঙ্গিতে উঠে ভারেঙ্কা সবে চাইছিল চারিপাশে, চুরুট ছুঁড়ে ফেলে দৃঢ় পদক্ষেপে কজ্নিশেভ এগিয়ে গেলেন তার দিকে।
