‘আর আমি মনে করি, চমৎকার মিডিয়া হবেন আপনি’, বললেন কাউন্টেস নর্ডস্টন, ‘আপনার মধ্যে ভাবাবেগের মত কি-একটা যেন আছে।
মুখ খুলতে গিয়েছিলেন লেভিন, ভেবেছিলেন কিছু একটা বলবেন, কিন্তু লাল হয়ে গিয়ে কিছুই আর বললেন না।
ভ্রনস্কি বললেন, ‘আসুন, কাউন্টেস, এখনই টেবিলের পরীক্ষা হয়ে যাক। আপনার আপত্তি নেই তো প্রিন্সেন?
উঠে দাঁড়িয়ে ভ্রনস্কি এদিক-ওদিক তাকিয়ে টেবিল খুঁজতে লাগলেন।
কিটি টেবিল ছেড়ে উঠে পাশ দিয়ে যাবার সময় চোখাচোখি হয়ে গেল লেভিনের সাথে। তার ভারি কষ্ট হচ্ছিল লেভিনের জন্য। কষ্টটা আরো হচ্ছিল এই কারণে যে ওঁর দুর্ভাগ্যের হেতু সে-ই। তার চাহনি বলছিল, ‘পারলে আমাকে ক্ষমা করুন, আমি ভারি সুখী।
আর লেভিনের দৃষ্টি জবাব দিলে, ঘৃণা করি সবাইকে। আপনাকেও, নিজেকেও। টুপি তুলে নিলেন তিনি, কিন্তু চলে যাবার নির্বন্ধ তার ছিল না। ছোট টেবিলটা ঘিরে সবাই জুটতে চাইছে আর লেভিন চাইছেন যেতে–এমন সময় ঘরে ঢুকলেন বৃদ্ধ প্রিন্স। মহিলাদের সাথে সম্ভাষণ বিনিময় করে ফিরলেন লেভিনের দিকে। সানন্দে তিনি শুরু করলেন, ‘আরে! অনেকদিন হল নাকি? আমি জানতাম না যে তুমি এখানে! ভারি খুশি হলাম আপনাকে দেখে।
বৃদ্ধ প্রিন্স লেভিনকে কখনো বলছিলেন তুমি’, আবার কখনো ‘আপনি। লেভিনকে আলিঙ্গন করে তার সাথেই কথা জুড়লেন, খেয়াল করলেন না ভ্রনস্কিকে। ভ্রনস্কি উঠে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে অপেক্ষা করছিলেন–কখন প্রিন্স ফিরবেন। তার দিকে।
কিটি টের পাচ্ছিল, যা ঘটে গেছে তার পর বাবার এই মনোযোগ লেভিনের পক্ষে কত দুঃসহ। সে এও দেখল যে, বাবা শেষ পর্যন্ত ভ্রনস্কির অভিবাদনের জবাবে কি নিরুত্তাপ প্রত্যভিবাদন দিলেন এবং কি অমায়িক বিহ্বলতায় ভ্রনস্কি তাকিয়ে ছিলেন তার বাবার দিকে, বুঝবার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু বুঝতে পারছিলেন না কেন, কিসের জন্য তার প্রতি বিরূপতা সম্ভব। লাল হয়ে উঠল কিটি।
কাউন্টেস নর্ডস্টন বললেন, প্রিন্স, কনস্তান্তিন দৃমিত্রিচকে আমাদের ছেড়ে দিন। আমরা একটা পরীক্ষা করতে চাই।’
‘কি পরীক্ষা? টেবিল চালনা? কিন্তু ভদ্র মহোদয় ও মহোদয়ারা, মাপ করবেন আমাকে, আমার ধারণা, কলেচুকো’ খেলায় মজা বেশি’, ভ্রনস্কির দিকে তাকিয়ে এবং তিনি-ই যে ব্যাপারটার হোতা তা আন্দাজ করে বৃদ্ধ প্রিন্স বললেন, কলেচুকো’র তবু একটা মানে হয়।’
ভ্রনস্কি অবাক হয়ে তার অচঞ্চল চোখে প্রিন্সের দিকে তাকালেন এবং সামান্য হেসে তখনই কাউন্টেস নর্ডস্টনের সাথে আলাপ শুরু করলেন–আগামী সপ্তাহে বড় রকমের একটা বলনাচের ব্যাপার নিয়ে।
কিটির দিকে তিনি ফিরলেন, আশা করি আপনি আসবেন। আসবেন তো?’
তাঁর কাছ থেকে বৃদ্ধ প্রিন্স সরে যেতেই লেভিন অলক্ষ্যে বেরিয়ে গেলেন, এ সন্ধ্যার শেষ যে ছাপটা তার মনে রইল, সেটা বলনাচ নিয়ে ভ্রনস্কির প্রশ্নের জবাবে কিটির হাসিমাখা সুখী-সুখী মুখখানি।
আন্না কারেনিনা – ১.১৫
পনেরো
লেভিনের সাথে তার কি কথা হয়েছে–সান্ধ্য বাসর শেষ হলে কিটি মাকে বলল আর লেভিনের জন্য তার কষ্ট হলেও এই ভেবে তার খুশি লাগছিল যে, তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। তার সন্দেহ ছিল না যে সে উচিত কাজই করেছে। কিন্তু শয্যায় অনেকক্ষণ ঘুম এল না তার। একটা ছবি কিছুতেই ছেড়ে যাচ্ছিল না তাকে। সেটা ভুরু কোঁচকানো লেভিনের মুখ, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার পিতার কথা শোনবার সময় সে ভুরুর তল থেকে মন মরার মত চাইছিল তার সদয় চোখ, যখন তিনি দৃষ্টিপাত করছিলেন তার আর ভ্রনস্কির দিকে। তাঁর জন্য এত কষ্ট হল যে চোখ ভরে উঠল পানিতে। কিন্তু ওঁর বদলে যাকে সে বেছেছে, তখনই তার কথা ভাবল সে। তার স্পষ্ট মনে পড়ল সেই পৌরুষব্যঞ্জক দৃঢ় মুখমণ্ডল, সেই উদার স্থৈর্য আর তার সব কিছু থেকে বিকিরিত সবার প্রতি সহায়তা; মনে পড়ল নিজের প্রতি তার ভালোবাসা যাকে সে ভালোবেসেছে এবং আবার প্রাণ তার ভরে উঠল আনন্দে, সুখের হাসি নিয়ে সে বালিশে মাথা দিলে। নিজেকে সে বলছিল, কষ্ট হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু কি করি? আমার তো দোষ নেই; কিন্তু অন্তরের কণ্ঠস্বর বলছিল ভিন্ন কথা। কিসের জন্য তার অনুতাপ হচ্ছে–লেভিনকে আকৃষ্ট করেছে, নাকি তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলে, তা সে জানত না। কিন্তু নানা দুশ্চিন্তায় সুখ ওর বিষিয়ে যাচ্ছিল। সৃষ্টিকর্তা দয়া কর, সৃষ্টিকর্তা দয়া কর, সৃষ্টিকর্তা দয়া কর! ঘুমিয়ে না পড়া পর্যন্ত নিজের জন্য এই প্রার্থনা করে গেল সে।
এই সময় নিচে, প্রিন্সের ছোট পাঠকক্ষে চলছিল স্নেহের মেয়েকে নিয়ে মা-বাপের মধ্যে ঘন ঘন কলহের একটা।
‘কি বলছি? এই বলছি!’ দু’হাত আস্ফালন করে এবং সাথে সাথেই ড্রেসিং-গাউনটা ঠিক করে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন প্রিন্স, বলছি যে, আপনার গর্ববোধ নেই, মর্যাদাবোধ নেই। মেয়ের নাম ডোবাচ্ছেন, তাকে ধ্বংস করছেন এই হীন, নির্বোধ ঘটকালি করে!’
‘কিন্তু দোহাই, সৃষ্টিকর্তার দোহাই প্রিন্স, কি আমি করলাম? প্রিন্স-মহিষী বললেন কাঁদো-কাঁদো হয়ে।
মেয়ের সাথে কথা কওয়ার পর তিনি খুশি হয়ে প্রিন্সের কাছে এসেছিলেন সচরাচরের মত শুভরাত্রি জানাতে এবং যদিও লেভিনের প্রস্তাব ও কিটির প্রত্যাখ্যানের কথা জানাবার কোন অভিপ্রায় তার ছিল না, তাহলেও স্বামীকে এই ইঙ্গিত দেন যে তার মনে হচ্ছে, ভ্রনস্কির ব্যাপারটা শেষের মুখে এসে পড়েছে, ওঁর মা এলেই স্থির হয়ে যাবে সব। এ কথা শুনেই প্রিন্স খেপে ওঠেন এবং অশালীন গালাগালি দিয়ে চেঁচাতে থাকেন।
