সেই একই হাসি নিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, ‘আর তুমি? কিসে তোমার অসন্তোষ?’
নিজের ওপর তাঁর অসন্তোষে কিটির অবিশ্বাস খুশি করল লেভিনকে আর তার এই অবিশ্বাসের কারণটা যাতে সে বলে, অজ্ঞাতসারে সেই দিকে কিটিকে ঠেলা দিলেন লেভিন।
বলল, ‘আমি সুখী, কিন্তু নিজের ওপর অসন্তুষ্ট।‘
‘সুখী হলে অসন্তুষ্ট হতে পারো কি করে?’
মানে কি করে তোমাকে বোঝাই? যেমন মনে প্রাণে আমি এখন চাইছি শুধু তুমি যেন হোঁচট না খাও। আহ্, অমন করে লাফাতে হয় কখনো!’ হাঁটা পথটায় পড়ে থাকা একটা ডাল ডিঙতে গিয়ে বড় বেশি তাড়াহুড়ো করায় কিটিকে বকুনি দেবার জন্য তিনি থেমে গেলেন নিজের কথায়। কিন্তু যখন আমি নিজেকে বিচার করি, তুলনা করি অন্যদের বিশেষ করে বড় ভাইয়ের সাথে, তখন বেশ বুঝি যে আমি ভালো নেই।
‘কিসে খারাপ?’ একই হাসি নিয়ে বলে গেল কিটি, তুমিও কি অন্যদের জন্যে কাজ করো না? চাষীদের বিলি করা জমি, তোমার নিজের কৃষি কাজ, তোমার বই, এ সব কি তবে?…’
‘না, আমি এটা অনুভব করছি এবং আরও বেশি করে এখন : ও সব যে ঠিক তেমন নয়, কিটির হাতে চাপ দিয়ে বলল তিনি, ‘তার জন্য দায়ী তুমি। এ আমি করি এমনি, ওপর-ওপর। তোমাকে যেমন ভালোবাসি এ সব কাজকে যদি তেমনি ভালোবাসতে পারতাম… ইদানীং আমি এ সব করছি যেন স্কুলের হোমটাস্ক।‘
কিটি জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে বাবাকে কি তুমি বলবে? উনি খারাপ কারণ সাধারণের জন্য কিছুই তিনি করেননি?’
‘উনি? না, উনি নন। তোমার বাবার মত সহজ-সরলতা, স্বচ্ছতা, সহৃদয়তা থাকা দরকার, সেটা কি আমার আছে? আমি কিছু করছি না আর কষ্ট পাচ্ছি সে জন্য। এটা তুমি ঘটিয়েছ। যখন তুমি ছিলে না আর ছিল না এটি’, কিটির উদরের দিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি বললেন এবং ইঙ্গিতটা কিটি বুঝল, তখন কাজে আমার সমস্ত শক্তি আমি ঢেলে দিয়েছিলাম; কিন্তু এখন তা আর পারছি না অথচ বিবেকে বিঁধছে। আমি এ সব করি ঠিক হোমটাস্ক করার মত, ভান করি…’
‘তা এখন তোমার জায়গা বদল করতে চাও কি কজ্নিশেভের সাথে?’ কিটি শুধাল, চাও কি সাধারণের জন্য কাজ করতে আর শুধু ওই হোমটাস্কটাকে ওঁর মত ভালোবাসতে, বাস?’
‘অবশ্যই নয়’, লেভিন বললেন, ‘তবে আমি এত সুখী যে জ্ঞানগম্যি আর কিছু নেই। আচ্ছা, তুমি সত্যিই ভাবছ যে উনি আজ পাণিপ্রার্থনা করবেন?’ একটু চুপ করে থেকে যোগ দিলেন উনি।
‘ভাবছিও বটে, আবার ভাবছিও না। শুধু ওটা চাইছি ভয়ানক। দাঁড়াও, দাঁড়াও’, নিচু হয়ে পথের পাশে গজানো বুনো একটা ডেইজি ফুল তুলল সে, ‘এবার পাপড়িগুলো পর পর গুণে যাও : পাণিপ্রার্থনা করবেন, কি করবেন না, করবেন, কি করবেন না’, ফুলটা দিয়ে কিটি বলল।
লম্বা, সাদা পাপড়িগুলো ছিঁড়তে ছিঁড়তে লেভিন বলে চললেন, ‘করবেন, করবেন না… ‘
‘উঁহু, উঁহু, হল না’, উদ্দ্গ্রীব হয়ে লেভিনের আঙুল লক্ষ করছিল কিটি, হাত ধরে তাঁকে থামিয়ে সে বলে উঠল, ‘এক বার দুটো পাপড়ি ছিঁড়ে ফেলেছ তুমি।’
‘তাতে কি, এই ছোটটা তো আর ধর্তব্য ছিল না’, পুরো বেড়ে না-ওঠা একটা পাপড়ি ছিঁড়ে লেভিন বললেন, ‘এই তো আমাদের বগিগাড়ি এসে গেছে।’
‘ক্লান্ত হোসনি, কিটি?’ গাড়ি থেকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন প্রিন্স-মহিষী।
‘একটুও না।’
‘নইলে গাড়িতে উঠতে পারিস, ঘোড়াগুলো যদি শান্তভাবে এক-পা করে চলে।’
কিন্তু গাড়িতে উঠতে হল না। কাছাকাছি এসে পড়েছিল জায়গাটা, তাই সবাই চলল পায়ে হেঁটে।
চার
ভারেঙ্কার কালো চুল সাদা রুমালে বাঁধা। ছেলেমেয়ের দল ঘিরে ধরেছে তাকে, তাদের নিয়ে সে বেশ আনন্দ করেই ব্যস্ত আর যে পুরুষটিকে তার ভালো লাগে তাঁর কাছ থেকে প্রেম নিবেদন শোনার সম্ভাবনায় স্পষ্টতই আন্দোলিত। অতি আকর্ষণীয় লাগছিল তাকে। কজ্নিশেভ হাঁটলেন তার পাশে পাশে আর মুগ্ধ হয়ে দেখছিলেন তাকে। তার দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে পড়ছিল কত মধুর কথা তিনি শুনেছেন ভারেঙ্কার কাছ থেকে, তার সম্পর্কে কত ভালো ভালো জিনিস জানতে পেরেছেন তিনি আর ক্রমেই টের পাচ্ছিলেন যে তার প্রতি যে হৃদয়াবেগ তিনি বোধ করছেন সেটা কেমন যেন বিশেষ রকমের, তেমনটা বহুকাল তাঁর হয়নি, যা হয়েছিল তাও শুধু একবার, তাঁর প্রথম যৌবনে 1 তার কাছাকাছি থাকার আনন্দটা ক্রমেই বেড়ে উঠে এমন স্তরে পৌঁছল যে সরু ডাঁটির ওপর কিনারা মেলে দেওয়া যে বার্চ ব্যাঙের ছাতাটি তিনি পেয়েছিলেন সেটি ভারেঙ্কার ঝুড়িতে দেবার সময় তিনি তার চোখের দিকেই চাইলেন আর তার মুখ ছেয়ে দেওয়া পুলকিত ও ত্রস্ত উত্তেজনার লালিমা লক্ষ করে নিজেই তিনি হকচকিত হয়ে নীরবে হাসলেন বড় বেশি মুখর হাসিতে।
‘তাই যদি হয়, তাহলে আমাকে ভেবে দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে’, নিজেকে বললেন তিনি, ‘বালকের মত ক্ষণিকের মোহে গা ভাসালে চলবে না।’
‘এবার কারও অপেক্ষা না রেখে চলে যাচ্ছি ব্যাঙের ছাতা তুলতে, নইলে আমার জোগান হয়ে থাকছে অকিঞ্চিৎকর’, এই বলে বনের যে কিনারায় বুড়ো বুড়ো বিরল বার্চ গাছগুলোর মাঝে রেসম-চিকন ছোট ছোট ঘাসের ওপর তাঁরা হাঁটছিলেন, সেখান থেকে তিনি চলে গেলেন বনের গভীরে, যেখানে বার্চ গাছের সাদা সাদা গুঁড়ির মাঝে মাঝে অ্যাম্পেন গাছের ধূসর গুঁড়ি আর হ্যাজেলের কালো ঝোঁপ দেখা যাচ্ছিল। চিল্ল পা সরে গিয়ে গোলাপি-লাল মঞ্জরি ঝোলানো স্পিণ্ডল-বুশ ঝেপের পেছনে কজ্নিশেভ থামলেন। জানতেন সেখানে তাঁকে কেউ দেখতে পাবে না। চারিদিক একেবারে স্তব্ধ। শুধু যে বার্চ গাছগুলোর তলে তিনি ছিলেন তাদের ডগায় একঝাঁক মৌমাছির মত ভন ভন করছিল মাছি আর মাঝে মাঝে ভেসে আসছিল ছেলেমেয়েদের কণ্ঠস্বর। হঠাৎ বনপ্রান্তের অদূরে শোনা গেল ভারেঙ্কার খাদের গলা, গ্রিশাকে ডাকছিল সে। কজ্রনিশেভর মুখে ফুটে উঠর আনন্দের হাসি। হাসিটা সম্পর্কে সচেতন হয়ে তিনি মাথা নাড়লেন নিজের এ অবস্থা পছন্দ না করে, চুরুট বার করে ধরাবার চেষ্টা করলেন। বার্চ গাছের কাণ্ডে দেশালাইয়ের কাঠি ঘষে অনেকক্ষণ তিনি তা ধরাতে পারছিলেন না। বার্চের সাদা বাকলের ওপরকার নরম ঝিল্লি ফসফোরে জড়িত গিয়ে আগুন নিবিয়ে দিচ্ছিল। অবশেষে একটা কাটি জ্বলল আর বার্চের ঝুলন্ত ডালের তলেকার ঝোপটার ওপরে ও সামনে দোলায়মান চাদরের মত বিছিয়ে গেল চুরুটের গন্ধী ধোঁয়া। ধোঁয়াটা লক্ষ করে নিজের অবস্থা সম্পর্কে ভাবতে ভাবতে তিনি চুপচাপ হাঁটতে লাগলেন।
