পায়ে হেঁটে যখন তাঁরা অন্যদের চেয়ে এগিয়ে গিয়ে ধুলোভরা, রাইয়ের মঞ্জরি আর শস্যদানা ছড়ানো সমতল রাস্তায় উঠলেন, কিটি স্বামীর হাতে ওপর রীতিমত ভর দিয়ে তাঁকে টানলেন নিজের দিকে। মুহূর্তের বিরূপতা লেভিন ভুলে গিয়েছিলেন অনেক আগেই, আর কিটিকে একা পেয়ে এখন, তার অন্তঃসত্ত্বা অবস্থা নিয়ে ভাবনা মুহূর্তের জন্যও যাচ্ছিল না মন যখন তখন তিনি অনুভব করলেন প্রিয়তমা নারীর সাথে সান্নিধ্যের একেবারে কামগন্ধহীন, তাঁর পক্ষে নতুন, আনন্দময় একটা উপভোগ। বলবার কিছু ছিল না, কিন্তু তিনি শুনতে চাইছিলেন কিটির কণ্ঠস্বর, গর্ভবতী অবস্থায় যা এখন তার দৃষ্টির মতই বদলে গিয়েছে। যেমন তার চাউনিতে, তেমনি তার গলার স্বরে ছিল এমন একটা কোমলতা আর গভীরতা যা অনেকটা শুধু নিজের প্রিয় বিষয়ে মগ্ন লোকদের মধ্যে দেখা যায়।
‘হয়রান হয়ে পড়বে না তো? আমার ওপর আরো বেশি ভর দাও’, কিটিকে বললেন লেভিন।
‘না, তোমার সাথে শুধু একা থাকতে পেয়ে কি যে আনন্দ হচ্ছে; ওঁদের সঙ্গ আমার যতই ভালো লাগুক, বলতে
বাধা নেই যে আমাদের দুজনকার একসাথে শীতের সন্ধ্যাগুলোর কথা ভেবে মন কেমন করে।’
‘সেটাও ভালো ছিল, এটাও আরো ভালো। দুই-ই ভালো’, লেভিন বললেন তার হাতে চাপ দিয়ে।
‘তুমি যখন এলে তখন কি নিয়ে কথা বলছিলাম জানো?’
‘জ্যাম নিয়ে?’
‘হ্যাঁ, জ্যাম নিয়েও; কিন্তু তারপর লোকে পাণিপ্রার্থনা করে কিভাবে তাই নিয়ে।’
‘অ’, লেভিন বললেন বটে, তবে কিটির কথাগুলো শোনার চেয়ে বেশি শুনছিলেন তার কণ্ঠস্বর, যে পথটা এখন বনের দিকে গেছে, অনবরত ভাবছিলেন সেটা নিয়ে, যেসব জায়গায় কিটির বেঠিক পা ফেলা সম্ভব, এড়িয়ে যাচ্ছিলেন সেগুলো।
‘তা ছাড়া সের্গেই ইভানিচ আর ভারেঙ্কা সম্পর্কেও। তুমি খেয়াল করেছ?… আমি এটা খুবই চাই’, বলে চলল কিটি, ‘কি তুমি ভাবছ এ ব্যাপারে?’ লেভিনের মুখের দিকে চাইলে সে।
‘কি ভাবা যায় জানি না’, হেসে জবাব দিলেন লেভিন, ‘এদিক থেকে সের্গেইকে আমার ভারি অদ্ভূত লাগে। আমি তো তোমাকে বলেছি যে…’
‘হ্যাঁ, একটি মেয়েকে তিনি ভালোবাসতেন যে মারা গেছে…’
‘ঘটনাটা ঘটে যখন আমি বাচ্চা। ব্যাপারটা শুনেছি লোকের মুখে। ওঁকে তখন যা দেখেছি মনে আছে। আশ্চর্য সুন্দর লোক ছিলেন তিনি তখন। সেই থেকে নারী সাহচর্যে আমি তাঁকে লক্ষ করে দেখেছি; তাদের প্রতি তিনি ছিলেন সৌজন্যশীল, কাউকে কাউকে তাঁর ভালোও লাগত, কিন্তু আমি টের পেতাম, ওঁর কাছে ওরা নারী নয়, স্রেফ লোক।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু এখন ভারেঙ্কার বেলায়… মনে হয় কিছু-একটা আছে…’
‘হয়ত আছে… কিন্তু ওঁকে জানা দরকার… উনি আলাদা ধরনের এক আশ্চর্য মানুষ। উনি বাস করেন শুধু মননের জগতে। বড় বেশি উনি নির্মল আর উন্নত প্রাণের লোক।’
‘তার মানে? এতে ওঁর মানহানি হবে?’
‘তা নয়, কিন্তু মননের জগৎ নিয়ে থাকতে তিনি এত অভ্যস্ত যে সাংসারিক ব্যাপার মেনে নিতে তিনি পারবেন না, আর ভারেঙ্কা যতই হোক, সাংসারিক জীব।’
যথাযথ ভাষায় মুড়ে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করার কষ্ট না নিয়ে লেভিন এখন তা স্পষ্টাস্পষ্টি বলে দিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন, তিনি জানতেন যে এখনকার মত ভালোবাসায় নিবিড় এই মুহূর্তে কি তিনি বলতে ছাইছিলেন কিটি সেটা বুঝবে ইঙ্গিতেই, এবং সে বুঝলও
‘হ্যাঁ, কিন্তু আমার মত এই সাংসারিকতাটা ভারেঙ্কার মধ্যে নেই; আমি বুঝি যে আমাকে উনি ভালোবাসতে পারতেন না কখনো। কিন্তু ভারেঙ্কার সবটাই ঊর্ধ্ব জগতের…’
‘আরে না, তোমার উনি ভালোবাসেন আর আমার আত্মীয়স্বজনেরা যে তোমাকে ভালোবাসেন সেটা ভারি ভালো লাগে আমার…’
‘আমার প্রতি তিনি প্রসন্ন, কিন্তু…’
‘কিন্তু প্রয়াত নিকোলাইয়ের মত নন, তোমাদের দুজন দুজনকে ভালো লেগেছিল’, বাক্যটা শেষ করলেন লেভিন, ‘সেটা না বলবার কি আছে?’ যোগ করলেন তিনি, ‘মাঝে মাঝে নিজেকে আমি ভর্ৎসনা করি : পরিণামে ভুলে যাব। কি সাংঘাতিক অথচ চমৎকার মানুষ ছিলেন… ও, হ্যাঁ, কি নিয়ে কথা কইছিলাম আমরা?’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লেভিন বললেন।
তুমি ভাবছ যে উনি প্রেমে পড়তে পারেন না’, নিজের মত করে ব্যাপারটাকে রাখল কিটি 1
‘প্রেমে পড়তে পারেন না এমন নয়’, হেসে লেভিন বললেন, ‘কিন্তু এর জন্য যে দুর্বলতাটুকু প্রয়োজন, সেটা ওঁর নেই…সব সময় আমি হিংসে করেছি ওঁকে, আর এখন আমি সুখী হলেও হিংসে করি।’
‘হিংসে করো উনি ভালোবাসতো পারেন না বলে?‘
‘হিংসে হয় কেননা আমার চেয়ে উনি ভালো’, হেসে বললেন লেভিন, ‘উনি বেঁচে থাকেন নিজের জন্য নয়। জীবন তাঁর কর্তব্য পালনের নিবেদিত। তাই তিনি সৌম্য আর সন্তুষ্ট থাকতে পারেন।’
‘আর তুমি?’ উপহাস আর ভালোবাসার হাসি নিয়ে কিটি বলল।
চিন্তার যে ধারাটা কিটির মুখে হাসি ফুটিয়েছিল, সেটা সে প্রকাশ করে বলতে পারত না কিছুতেই; কিন্তু তার শেষ কথাটা হল এই যে স্বামী তাঁর ভাইয়ের কথায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ও নিজেকে হীন করে কপটতা করছেন। সে জানতো যে এই কপটতাটা আসছে বড় ভাইয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা থেকে, নিজের বড় বেশি সুখের জন্য বিবেক দংশন আর নিজে ক্রমাগত ভালো হয়ে ওঠার অবিরত বাসনা থেকে। ওঁর ভেতরকার এই জিনিসটা কিটির ভালো লাগত তাই সে হাসলে।
