‘শুধু একটা ব্যাপার… ভারেঙ্কার আগেকার প্রেমটা’, কিটি বলল, চিন্তার স্বাভাবিক যোগসম্পর্কে ব্যাপারটা মনে পড়েছিল তার; ‘সের্গেই ইভানোভিচকে ঘটনাটার কথা বলতে চেয়েছিলাম আমি, তাঁকে তৈরি করে রাখতে। ওরা, সমস্ত পুরুষই’, যোগ দিল কিটি, ‘আমাদের অতীত নিয়ে সাঙ্ঘাতিক ঈর্ষাপরায়ণ।’
‘সবাই নয়’, ডল্লি বললেন, ‘তুই তোর স্বামীকে দিয়ে বিচার করছিস। আজও পর্যন্ত ভ্রন্স্কির কথা ভেবে ওর যন্ত্রণা হয়। তাই না? সত্যি?’
‘সত্যি’, চোখে হাসি নিয়ে চিন্তাচ্ছন্নভাবে বলল কিটি।
কন্যার জন্য নিজের জননীসুলভ উদ্বেগ নিয়ে প্রিন্স-মহিষী বললেন, ‘শুধু আমি জানি না তোর কোন অতীতটায় ওর দুশ্চিন্তা হতে পারে। ভ্রন্স্কি তোকে প্রেম নিবেদন করেছিল বলে? সমস্ত মেয়ের ক্ষেত্রেই সেটা ঘটে থাকে।’
‘কিন্তু সে নিয়ে আমরা কথা কইছি না’, কিটি বলল লাল হয়ে।
‘না, দাঁড়া’, বলে গেলেন মা, ‘ভ্রন্স্কির সাথে আমি কথা বলি, সেটা তুই-ই পরে চাসনি। মনে আছে?’
‘আহ, মা!’ কিটি বলল মুখভাবে যন্ত্রণা নিয়ে।
‘এখন তোদের আর বেঁধে রাখা যায় না…তবে তোর সম্পর্কটা উচিত সীমার বাইরে যেতেই পারেনি; আমি নিজেই ওকে ডেকে পাঠাতাম। কিন্তু তোর বাছা অস্থির হওয়া উচিত নয়। সেটা মনে রেখে শান্ত হ’ তো।’
‘আমি একেবারে শান্ত, মা।’
‘কিটির পক্ষে কি সৌভাগ্যের ব্যাপার হয়েছে যে আন্না এসেছিলেন’, ডল্লি বললেন, ‘আর আন্নার পক্ষে কি দুর্ভাগ্য। একেবারে উল্টোটা’, নিজের ভাবনায় নিজেই বিস্মিত হয়ে যোগ দিলেন ডল্লি, তখন আন্না ছিলেন ভারি সুখী আর কিটি নিজেকে দুর্ভাগা মনে করত। কেমন একেবারে উল্টো! আমি প্রায়ই ভাবি আন্নার কথা।’
‘ভাবনার লেক পেলি বটে! ইতর, জঘন্য, হৃদয়হীন নারী’, বললেন মা, কিটির যে ভ্রন্স্কির সাথে বিয়ে হল না, হয়েছে লেভিনের সাথে এটা তিনি ভুলতে পারছিলেন না।
‘এসব কথা বলার কি যে এত সাধ’, বিরক্তিতে বলল কিটি, ‘আমি ও নিয়ে ভাবি না, ভাবতে চাই না … ভাবতে চাই না’, বারান্দার সিঁড়িতে স্বামীর পরিচিত পদশব্দে কান পেতে থেকে পুনরাবৃত্তি করলে সে।
বারান্দায় উঠে লেভিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি নিয়ে ঐ ভাবতে চাওয়া হচ্ছে না?’
কেউ জবাব দিলেন না, উনিও প্রশ্নটা করলেন না দ্বিতীয়বার।
‘আপনাদের নারী রাজ্যে অশান্তি ঘটালাম বলে দুঃখ হচ্ছে’, লেভিন বললেন সকলের দিকে অপ্রসন্ন দৃষ্টিপাত করে। তিনি বুঝেছিলেন যে এমন কিছু নিয়ে কথা হচ্ছিল যা তাঁরা বলতে চান না তাঁর সামনে।
র্যাম্পবেরি জ্যাম বানানো হচ্ছে বিনা পানিতে, এ নিয়ে, এবং সাধারণভাবে শ্যেরবাৎস্কিদের প্রভাবে আগাফিয়া মিখাইলোভনার অসন্তুষ্টি তিনিও বোধ করলেন মুহূর্তের জন্য। তাহলেও হেসে গেলেন কিটির কাছে।
‘কিছু না। ভালোই, আর তোমার ব্যাপার-স্যাপার?’ জিজ্ঞেস করলে কিটি।
‘সাধারণ গাড়ির চেয়ে তিনগুণ মাল নিচ্ছে ওয়াগনগুলো। তাহলে ছেলেমেয়েদের জন্য যাওয়া হবে নাকি? আমি ঘোড়া জুততে বলেছি।’
‘সে কি, তুমি কিটিকে নিয়ে যেতে চাও বগি-গাড়িতে?’ প্রিন্স-মহিষী বললেন তিরস্কারের সুরে।
‘ঘোড়াগুলোকে যে হাঁটিয়ে নিয়ে যাব, প্রিন্সেস।’
প্রিন্স-মহিষীকে লেভিন কখনো ‘মা’ সম্বোধন করেননি, যা করে থাকে জামাতারা, এটা প্রিন্স-মহিষীর ভালো লাগত না। কিন্তু প্রিন্স-মহিষীর প্রতি তাঁর বেশ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থাকলেও নিজের প্রয়াতা জননীর প্রতি তাঁর হৃদয়াবেগকে কলুষিত না করে তাঁকে মা বলা সম্ভব ছিল না।
‘মা, আপনিও চলুন আমাদের সাথে’, বলল কিটি
‘এসব অবিবেচনার সাথে সম্পর্ক রাখতে চাই না।’
‘বেশ, তাহলে আমি পায়ে হেটে যাব, সেটা তো আমার পক্ষে ভালো’—এই বলে উঠে দাঁড়িয়ে স্বামীর কাছে গিয়ে কিটি তাঁর হাত ধরলে।
‘ভালো, কিন্তু সবকিছুরই মাত্রা আছে’, বললেন প্রিন্স-মহিষী।
‘কি আগাফিয়া মিখাইলোভনা, জ্যাম তৈরি?’ আগাফিয়া মিখাইলোভনার দিকে চেয়ে হেসে তাঁকে খুশি করার চেষ্টায় লেভিন বললেন, ‘নতুন পদ্ধতিটা ভালো?’
‘ভালো হওয়াই উচিত। তবে আমাদের কাছে কড়া পাক।’
‘সেটাই তো ভালো আগাফিয়া মিখাইলোভনা, টকে যাবে না। আমাদের ঠাণ্ডী ঘরের বরফ গলে গেছে, কোথাও ওগুলো রাখবার জায়গা নেই’, স্বামীর ইচ্ছাটা কি তৎক্ষণাৎ বুঝতে পেরে এবং নিজেও সেই একই ইচ্ছাবশে বৃদ্ধাকে বলল কিটি, ‘তবে আপনার নোনা শবজিগুলো যা, মা বলেন তেমন তিনি খাননি কোথাও’, হেসে বৃদ্ধার মাথার রুমাল ঠিক করে দিয়ে যোগ দিল সে।
আগাফিয়া মিখাইলোভনা কিটির দিকে চাইলেন রাগত দৃষ্টিতে।
‘আমাকে সান্ত্বনা দিতে হবে না গো। আপনাদিগে দুজনাকে একবার দেখলেই আমার আনন্দ’, বললেন উনি আর এই অমার্জিত গ্রাম্য ভাষায় মন গলে গেল কিটির।
সে বলল, ‘চলুন আমাদের সাথে ব্যাঙের ছাতা তুলতে, জায়গাগুলো দেখিয়ে দেবেন।’
আগাফিয়া মিখাইলোভনা হেসে মাথা নাড়লেন, যেন বলতে চান, ‘আপনাদের ওপর রাগ করে সুখ আছে, কিন্তু ওটি হবে না।’
‘আমি যা বলছি তাই করে দেখুন’, বললেন প্রৌঢ়া প্রিন্স-মহিষী। ‘জ্যামের ওপর কাগজ রেখে রাম দিয়ে ভেজান, বরফ না থাকলেও ছাতা পড়বে না।’
তিন
স্বামীর সাথে একা হতে পারার সুযোগ পেয়ে ভারি খুশি হয়েছিল কিটি, কেননা বারান্দায় গিয়ে যখন তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন কি নিয়ে কথা হচ্ছে এবং কেউ জবাব দিলেন না, তখন তাঁর অতি সংবেদনশীল মুখখানায় ক্ষোভের যে একটা ছায়া খেলে গিয়েছিল, সেটা কিটির চোখে পড়েছিল।
